সময় কলকাতা ডেস্ক :
আবার খবরের শিরোনামে টোটন বিশ্বাস :
ত্রাস-ই এবার টার্গেট এবং টোটন বিশ্বাস আবার চর্চার কেন্দ্রে।হাসপাতালে পুলিশি পাহারায় প্রিজন ভ্যান থেকে মেডিক্যাল টেস্টের জন্য নিয়ে যাওয়ার সময় হুগলির কুখ্যাত দুষ্কৃতী টোটন বিশ্বাসকে গুলি করল আরেকদল দুষ্কৃতী । শনিবার ইমামবাড়া হাসপাতালের মধ্যে চুঁচুড়ার ত্রাস টোটনকে গুলি চালানোর ঘটনা ঘিরে সরগরম হাসপাতাল চত্বর।আরেকবার খবরের শিরোনামে উঠে এল টোটন বিশ্বাস। কে এই টোটন বিশ্বাস, কেন তার ওপরে এই প্রাণঘাতী হামলার প্রচেষ্টা? সবকিছু জানতে হলে চলে যেতে হবে বেশ কয়েকবছর পেছনে।
ফ্ল্যাশব্যাক ও টোটন বিশ্বাস :
উত্তপ্ত পুলিশ জোরদার তল্লাশি চালাচ্ছিল, শাসক দলও চাপ বাড়িয়ে চলেছিল।২০১৫ সালে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে অবশেষে চুঁচুড়ার আতঙ্ক বছর ছত্রিশের টোটন বিশ্বাস চুঁচুড়া আদালতে আত্মসমর্পন করে। চুঁচুড়ার রবীন্দ্রনগরের টোটন ছিল প্রতিভাবান ফুটবলার, কালে কালে হয়ে উঠল এলাকার ত্রাস। বাম আমল থেকে শুরু করে তৃণমূল শাসন – সময়ের সাথে সাথে ডাকসাইটে অপরাধী হয়ে ওঠা টোটন বিশ্বাসের দক্ষতা থ্রি নট থ্রি রিভলবারে যেখানে সে হয়ে ওঠে অসামান্য পারদৰ্শী। চোখ কান বুজে নির্ভুল লক্ষ্যে গুলি চালাতে পারত টোটন।কি ভাবে অপরাধ জগতে তার উত্থান? কিভাবে হুগলির এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আতঙ্কের রাজত্ব কায়েম করে তার শীর্ষে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করল টোটন?
হিমশীতল মানসিকতার অপরাধী টোটন :
একাধিক রাজনৈতিক এবং অরাজনৈতিক মত বলছে, অপরাধ জগতে ঢুকে তার ঠান্ডা মানসিকতায় অপরাধ করা ও অপরাধ সংগঠনে পারদর্শিতার জোরে সে নিজেকে দ্রুত অন্ধকার জগতে নামডাক করে ফেলে । তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের কাজেও তাকে লাগায়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা উঠেছে । রূপচাঁদ পাল থেকে তপন দাসগুপ্ত সকলেই হয়ে উঠেছেন টোটন প্রসঙ্গে আলোচিত। বাম আমলেই টোটনের বিরুদ্ধে খুন, অপহরণ,তোলাবাজি , রাহাজানি সহ একাধিক অভিযোগ দায়ের হয়। সম্প্রতি পুলিশ তাকে মাদক আইনের ধারায় অভিযুক্ত করেছে । তবে শতকের প্রথম দশকে যখন তার উত্থান,পুলিশ সেসময় তরুণ টোটনের টিকি ছুঁয়ে দেখছিল না। অভিযোগ,তৃণমূল ক্ষমতায় এলে জার্সি বদল করে সেখানেও ভিড়ে যায় সে।তৃণমূল নেতা তপন দাশগুপ্ত পরবর্তীতে অভিযোগের পাল্টা বলেন , পেশায় শিক্ষক,প্রাক্তন এক বাম সাংসদের হাত ধরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় লালিত পালিত হয়েছিল টোটন। একথা অনস্বীকার্য যে, তৃণমূল আমলেই পুলিশ তাকে একাধিকবার গ্রেফতার করেছে।তথাপি রাজনৈতিক সংস্পর্শে ওতপ্রোতভাবে জড়ানোর আগে নিজের একটি আলাদা পরিচিতি গড়ে তোলে সে, নিজের নেটওয়ার্ক চালাতে থাকে নিজের কায়দায়। টোটন নিজেই ব্লু প্রিন্ট করত, নিজেই অপারেশন চালাত। থ্রি নট থ্রিকে হাতিয়ার করে শিকারের কপালের মাঝবরাবর নিশানা করা ছিল তার দস্তুর। তার অ্যাকশন প্ল্যান এবং তাকে কার্যকর করার জন্য তার হিমশীতল মানসিকতার পাশাপাশি তার জীবন শৈলীও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। টোটনের ব্যক্তিগত জীবনে একই পরিবারের দুই বোনকে বিয়ে করার ঘটনা একসময় মানুষের চর্চার বিষয় ছিল। গ্রেফতার হওয়ার পরে জেল থেকেই সে নিজের নেটওয়ার্ক চালাত বলেই শোনা যায়। পরবর্তী সময় ছাড়া পায় সে। বেশ কিছু মামলা চললেও জামিন পেয়ে যায় সে। আবার শুরু হয় ত্রাসের শাসন।তার খ্যাতি- কুখ্যাতি আরও বাড়ে।শুক্রবার মাদক রাখার অভিযোগে মাদক আইনে পুলিশ গ্রেফতার করে তাকে।

ইমামবাড়া হাসপাতাল গুলি কাণ্ড :
শনিবার তাকে মেডিক্যাল টেস্টের জন্য প্রিজন ভ্যান থেকে নামিয়ে নিয়ে যাওয়ার আগেই হামলা হয় টোটনের ওপরে। তিনজন বা ততোধিক দুষ্কৃতী ওঁৎ পেতে বসেছিল টোটনের জন্য। এক রাউন্ড গুলি এসে লাগে টোটনের বুক ও পেটের মাঝামাঝি জায়গায়। গুলি করে চম্পট দেয় দুষ্কৃতীরা।একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র ও অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে হাসপাতাল এলাকা থেকে।মেডিক্যাল টেস্ট না করে তার সার্জারি শুরু হয়। সময়মত চিকিৎসার জেরে অবস্থা স্থিতিশীল তার।তবে চিকিৎসা চলাকালীন বা তার আগে ও পরে টোটন নিজের স্নায়ুর ওপরে নিয়ন্ত্রণ হারায় নি। তারমধ্যেই সে একাধিক বার বলে উঠেছে, “দেখে নেব,”,”ছাড়ব না,” ইত্যাদি । টোটন কি জানে কে তার ওপরে হামলা চালিয়েছে? কে তাহ’লে এবারের হামলার পেছনে?
টোটন ও গ্যাং-ওয়ার :
সম্ভাব্য আততায়ীদের তালিকায় উঠে আসছে একাধিক নাম ও শিবিরের কথা। এলাকার অপরাধ জগতের ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ের কথা উঠলে উঠে আসছে বিশাল দাসের নাম।বিশাল টোটনের বরাবরের প্রতিদ্বন্দী। বিশাল বাহিনী একসময় টোটনের দাদা তারককেও খুন করেছিল। কার্যত গ্যাং ওয়ারের পরিস্থিতি মাঝেমাঝেই তৈরি হয়েছে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে।তবে বিশালের চেয়েও যে নাম বেশি এই মুহূর্তে এই ঘটনার ক্ষেত্রে উঠে আসছে তা হল বাবু পাল। বাবু পাল ছিল টোটনের একসময়ের নিত্যসাথী এবং তারা যাবতীয় দুস্কর্ম একযোগেই করত। উল্লেখ্য একসময় হোয়াইট কলার হওয়ার চেষ্টা করে ব্যবসায় যুক্ত হতে চাইলেও অপরাধ জগতের রন্ধ্রেরন্ধ্রে জড়িয়ে যাওয়া টোটনের মুক্তি মেলে নি আন্ডার ওয়ার্ল্ড থেকে। একসময়ের নিত্যসঙ্গী বাবু পালের সঙ্গেও তার দোস্তি নেই বহুকাল। আজকাল দোস্তি দুশমণির চেহারা নিয়েছে। বাবু পাল পৃথক দল গড়েছে। এক জঙ্গলে দুই শের থাকে না -এই নীতিতে দুই গ্যাং লিডার বিশ্বাস রাখে এবং দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই ঠান্ডা লড়াই চলার পরে পারদ ইদানীং উর্দ্ধমুখী ছিল বলেই সূত্রের খবর।পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, যেই হামলা চালাক -শনিবারের গুলি দুই অপরাধ গ্যাংয়ের লড়াইয়ের ফল । নিজেদের মধ্যে গোলযোগের রেশ পড়েছে ইমামবাড়া হাসপাতালে যার অঙ্গ হিসেবে গুলি করা হয়েছে টোটনকে। প্রাণে বেঁচে যাওয়া টোটনের আস্ফালন ও তার পূর্বের ক্রিমিনাল রেকর্ডস আশঙ্কা তৈরি করছে যে এখানেই থেমে থাকবে না ঠান্ডা মাথার অপরাধী টোটন। পুলিশি ঘেরাটোপের মধ্যে থেকেও প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা করেছে চুঁচুড়ার ত্রাস টোটন।


More Stories
সাষ্টাঙ্গে নত হয়ে ক্ষমাস্বীকার, মুখ্যমন্ত্রীর নামে কুরুচিকর পোস্ট করার জন্য শাস্তিবিধান!
রূপের মধ্যে অরূপের ছোঁয়া : গাজলডোবা এক ব্রাত্য মুগ্ধতা
ডিমথেরাপি অশোকনগরের গ্রেফতার চেয়ারম্যান প্রবোধ সরকারকে