পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা : মঙ্গলকাব্য মেনে বলা যায় দেব দেবী ধর্মে পরমারাধ্য। শ্রদ্ধা , ভক্তির সঙ্গে মিশে থাকে ভীতিজনিত সম্ভ্রম -:যেমনটি মনসা মঙ্গলে সর্প তথা মনসার বরাভয় চায় মানুষ ।তেমন করেই একটি অঞ্চলের মানুষ আজকের দিনটি কে বেছে নেয় ট্রেনকে বন্দনা করে অকাল বিশ্বকর্মা আবাহনের মধ্যে দিয়ে । কার্যত এ এক রেলমঙ্গল যে পূজোতে মানুষের কামনা ও লক্ষ্য পরিবার পরিজনকে দুধে ভাতে রাখা নয় , পরিবার পরিজনকে ট্রেনের রোষদৃষ্টি থেকে বাঁচিয়ে রাখা ও অঙ্গহানি রোধ করা । এখানে ভক্তবৃন্দ রেল লাইনের খুব কাছেই বাস করেন । রেল মাতৃকাকে তুষ্ট রাখতেই তাদের পুজো । শ্রাবন মাসে তিথি মেনে শনিবার উত্তরচব্বিশ পরগণার কদম্বগাছিতে ফি বছরের মত পালিত হল অকাল বিশ্বকর্মা পুজো ।

পুজো মানেই উৎসব । আর তা বিশেষ রূপ পায় ভক্তের আন্তরিক বন্দনা , আত্মনিবেদন ও আকুতিতে । তারই সঙ্গে মিশে যায় জৌলুস । তখন পুজোর গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে আকাশে বাতাসে । তেমনটাই আজকের দিন ।আজ ২৭ শ্রাবন, শ্রাবনের শেষ শনিবার ছড়িয়েছে পুজোর সৌরভ এক ব্যতিক্রমী পুজোয়। অকাল বিশ্বকর্মা – কদম্বগাছি রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকাবাসীর কাছে এর পরিচিতি ট্রেন পুজো নামে আর আয়োজকবৃন্দ একে বলে থাকেন অকাল বিশ্বকর্মা । নামমাহাত্ম্য মূল নয় এখানে পুজোর মাহাত্ম্য মঙ্গলকামনা ।

উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বারাসত – হাসনাবাদ শাখার কদম্বগাছিতে প্রতি বছরের মত এবারও গ্রাম বাসিরা আয়োজন করেছে রেল লাইন ও ট্রেন পুজোর। এবারে দ্বাদশ বর্ষে পড়ল এই অভিনব ট্রেন ও রেল লাইনের বিশেষ পূজো। সকাল ১০ টা নাগাদ কদম্বগাছি রেল স্টেশন লাগোয়া প্রায় ৫/৬ টি গ্রামের মানুষ জড়ো হন কদম্বগাছি রেল স্টেশন চত্বরে । লাল শালু কাপড় দেখিয়ে গ্রামের মহিলারা ট্রেন দাড় করিয়ে শুরু করেন পূজা পার্বনের কাজ। রীতিমত দুধ গঙ্গার জল দিয়ে রেল লাইন ও ট্রেনের প্রথম ও শেষ কামড়ার কাউ ক্যাচার ধুয়ে মুছে তাতে চন্দন ও সিঁদুরের টিপ পরিয়ে দেওয়া হয়। তারপর ফুলের মালা ও কলাগাছ লাগিয়ে ধূপ দ্বীপ জ্বেলে, ফল প্রসাদ সহকারে ফুলবেলপাতা দিয়ে পূজো করে নারকেল ফাটিয়ে তার জল দিয়ে ট্রেনের চাকায় ছিটানো হয়। এরপর শঙ্খধ্বনি দিয়ে ফের যাত্রা শুরু করা হয় ট্রেনের। পূজোর শেষে ট্রেনের চালক থেকে শুরু করে যাত্রীদের মধ্যে গ্রামবাসীরা ফল প্রসাদ বিতরণ করেন। বহু বছর ধরে কদম্বগাছি রেল স্টেশন ও রেল লাইন লাগোয়া পাঁচটি গ্রামের অনেক মানুষের রেললাইন পারাপার করতে গিয়ে মৃত্যু হয় ট্রেনের ধাক্কায়। সর্বশেষে বছর বারো আগে কদম্বগাছি রেল স্টেশন চত্বরে রেল লাইন পারাপার করার সময় এক যুবক ট্রেনের ধাক্কায় গুরুতর জখম হন। সেই থেকেই শুরু হয় ট্রেনের পূজো। প্রথম অবস্থায় ঐ যুবকের মা ট্রেন পূজোর সূচনা করলেও আজ তা গ্রামীণ উৎসবে পরিণত হয়েছে। ট্রেনের ধাক্কায় তার পরিবারের বা গ্রামের কেউ যাতে আর কেউ প্রাণ না হারায় তার জন্য গ্রামের মহিলারা এই ট্রেন পূজোর আয়োজন করে থাকে।

প্রতিবছর শ্রাবনের শেষ শনিবার সকলের মঙ্গল কামনায় মেতে ওঠেন কদম্বগাছির বাসিন্দারা। তাঁরা মনে করেন তাদের আয়োজনে তুষ্ট আরাধ্য রেল । মঙ্গল হচ্ছে ॥ ॥ ॥


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
চিকিৎসকের বঙ্গসংস্কৃতির উদযাপন নববর্ষে
মোথাবাড়ি কাণ্ডের অশান্তির নেপথ্য “খলনায়ক” মোফাক্কেরুল ইসলাম গ্রেফতার কিসের ইঙ্গিত?