সময় কলকাতা ডেস্ক:গরু পাচার কাণ্ডে সিবিআই হেফাজতে গরু পাচারের বেতাজ বাদশা কুখ্যাত গরু মাফিয়া এনামুল হক, এনামুল হকের সূত্র ধরেই সিবিআই জালে জড়িয়েছেন বীরভূমের বেতাজ বাদশা অনুব্রত মণ্ডল। এই দুই বেতাজ বাদশার গরু পাচার এবং গরু পাচার থেকে মুনাফা অর্জনের কাহিনী এখন বঙ্গের মানুষের মুখে মুখে।
এই গরু পাচার কবে শুরু হয়েছিল?
কিন্তু এই গরু পাচার কি সম্প্রতি শুরু হয়েছিল? না, গরু পাচারের ইতিহাস সুদূর প্রসারী। আবহমান কাল ধরে চলে আসছে এই গরু পাচার। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ৭ই মে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত নির্ধারণ হয়। ৪১৫৬ কিলোমিটার ব্যাপী এই সুদূর সীমান্তে তখনো কাঁটাতারের বেড়া লাগেনি। তখন থেকে শুরু হয়েছিল এই গরু চোরাচালান। ইউপিএ সরকারের পতনের পর এনডিএ সরকার ক্ষমতায় এসে সীমান্ত সুরক্ষার দিকে নজর দেয়। লাগানো হয় সীমান্ত জুড়ে কাঁটাতারের বেড়া। তা সত্ত্বেও কি বন্ধ হয়েছে এই গরুর চোরাচালান? চোরা-চালানকারীরা সীমান্তে নিযুক্ত বিএসএফের কড়া নজর এড়িয়ে কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁক দিয়ে প্রতিনিয়ত অভিনব পদ্ধতিতে শুরু করেছে চোরাচালান।
গরু পাচারের পদ্ধতি
প্রথমে দেখে নেওয়া যাক গরু পাচারের একাধিক পদ্ধতি। কখনো সীমান্তে বিএসএফের সঙ্গে যোগসাজসে সীমান্তের গেট দিয়ে বিএসএফের সামনে দিয়েই হয় গরু পাচার। সেক্ষেত্রে প্রতি গরু পিছু বিএসএফকে দিতে হয় মোটা অংকের টাকা ।কখনো প্রতি গরু কিছু ২০০ আবার কখনো ৩০০ টাকার অধিক। বিএসএফের নজর এড়িয়ে কপিকলের সাহায্যে কাঁটাতারের এপার থেকে ওপারে চলে গরু চোরা চালান। আবার কখনো কাঁটা তার কেটে তার উপর টিন বসিয়ে অবলীলায় জলে গরু পাচার। আবার কোথাও সীমান্তে যেখানে নদী-নালা রয়েছে সেখানে কচুরিপানার মধ্যে দিয়ে লোক চক্ষুর অন্তরালে চলে গরু পাচার। কলার ভেলা বানিয়ে সেই ভেলায় গরুকে বেঁধে নদী দিয়ে চলে পাচার।
এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিএসএফের সহযোগিতা থাকে আর থাকে আঞ্চলিক শাসক দল অথবা বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীদের পরোক্ষ মদত। এতো গেল সীমান্ত দিয়ে গরু চোরা চালানের পদ্ধতি।
সীমান্ত পর্যন্ত গরু আনা হয় কিভাবে?
কিন্তু রাজ্যের অভ্যন্তরের গরুর হাট থেকে গরু কিনে কিভাবে আনা হয় সীমান্তে?। গরু সীমান্তে নিয়ে আসার জন্য কখনো ব্যবহার করা হয় লরি বা ছোট মাঝারি গাড়ি অথবা সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে ভ্যানের মাধ্যমেও আনা হয় গরু। সেক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা শুধু একটাই প্রশাসনের কড়া নজরদারি। আর এখানেই গরু পাচারকারীদের সঙ্গে প্রশাসনের রসায়ন।
প্রতিটি থানা এলাকা পার হতে গেলে সেই থানার আধিকারিককে দিতে হয় মোটা অংকের টাকা। আর সেই সঙ্গে গরু পাচারকারীদের করতে হয় এলাকার নেতাদের উদর পূর্তি। অর্থাৎ কোনোমতে প্রশাসনকে ফাঁকি দিলেও নেতাদের ভাগের টাকায় ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব। আর এই গরু পাচারের ভাগের টাকাতেই নেতাদের এখন রমরমা।

গরু পাচারের নতুন পদ্ধতি
এদিকে প্রশাসনের নজরে এড়াতে গরু পাচারকারীরা নিচ্ছে অভিনব পদ্ধতি। সোমবার রাতে ঝাড়খণ্ড সীমান্তে ধানবাদের বারওয়াদা থানা এলাকায় কিছু যুবক একটি ডাক পার্সেল কন্টেইনার সহ গাড়ি আটক করে। দেখা যায় সেই গাড়ির ভিতর রয়েছে শতাধিক গরু। বিহারের ঔরঙ্গাবাদ ও চৌসার হাট থেকে এই গরু আনা হচ্ছিল পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে বাংলাদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে। ভারত সরকারের ডাক পার্সেল কন্টেনারে গরু? অবাক করা বিষয়। বিষ্ময়ের এখানেই শেষ নয়। বলিউডের পুষ্পা সিনেমার ফিল্মি কায়দায় দুধের গাড়িতে গরু পাচারের ঘটনাও মঙ্গলবার প্রকাশ্যে এলো।
পুরুলিয়ার হুড়া ব্লকের বিসপুড়িয়া এলাকায় একটি বেসরকারি দুধের গাড়ি আচমকায় দুর্ঘটনায় পড়ে উল্টে যায়। সেই দুধের কনটেইনার গাড়িতে ছিল গরু বোঝাই। দুর্ঘটনায় পাঁচটি গরুর মৃত্যু হয়েছে উদ্ধার হয়েছে প্রায় ২৫ টি গরু। অর্থাৎ চোরাচালানকারীরা এখন প্রশাসনের বিষ চক্ষুকে উপেক্ষা করার জন্য বেছে নিয়েছে সব অসাধারণ পদ্ধতি। শুধু এদেশেই নয়, গরু পাচারের রমরমাতে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ।

গরু পাচারে বাংলাদেশের অবস্থা
বাংলাদেশের জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী কামালপুর ইউনিয়নের প্রায় দুই কিলোমিটার সীমান্তপথ, লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম-আঙ্গোরপোতা সীমান্ত এলাকা, সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর সীমান্ত এলাকা, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল সীমান্তের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও কুড়িগ্রাম জেলায় মূলত বিস্তীর্ন এলাকা দিয়ে বেশী গরু চোরাচালান হয় ৷
এছাড়া বেনাপোল, সাতক্ষীরা, যশোর ও চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে এর আগে ব্যাপক হারে গরু পাচার হলেও বর্তমানে এইপথে গরু পাচার কমে গিয়েছে।সীমান্তবর্তী এলাকায় গরু পাচারে স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতা, ইউপি চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর ও স্থানীয় প্রশাসন মিলে তৈরি করেছে একটি চোরাচালান সিন্ডিকেট। ওই সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন থেকে চোরাই পথে আসা গরু, স্লিপের মাধ্যমে সীমান্তে চোরাচালান করে আসছে।
দহগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা বছরের পর বছর গরু পাচার করে হয়েছেন কোটিপতি। ওই সিন্ডিকেটের সদস্যদের রয়েছে ভারত-বাংলাদেশ দুই দেশেরই ভোটার এনআইডি কার্ড। কোরবানি ঈদের আগেই এই চক্র বেশী সক্রিয় হয়ে ওঠে ৷ এসব গরু বাংলাদেশে আসার পর সেগুলি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশী গরুর চালানের সাথে পরিবহন করে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করে দেয়া হয় ৷ পরে সেখানকার স্থানীয় হাটে এগুলি বিক্রয় করা হয় ৷ গরু চোরাচালান বন্ধ করতে হলে দু দেশকেই হতে হবে সক্রিয়। সীমান্ত কে করতে হবে আরো সুরক্ষিত।


More Stories
হরমুজ প্রণালী, রান্নার গ্যাস ও তেল এবং ভারত -ইরানের সম্পর্ক
যুদ্ধের জাঁতাকলে ভারত
ইতিহাস গড়তে পারল না নেপাল, ইংল্যান্ডের কাছে হার মাত্র ৪ রানে