সময় কলকাতা ডেস্ক:আসানসোল মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত কুলটি থানার অন্তর্গত রানি তালাব এলাকায় নেতাদের দাদাগিরি আর সামাজিক নিপীড়নের এক লজ্জাজনক ঘটনা ঘটেছে। যে ঘটনা আধুনিক সভ্যতা আর উন্নত সামাজিক পরিকাঠামোর আড়ালে সমাজ ব্যবস্থার ঘুন ধরা কঙ্কাল সার চেহারা প্রকাশ্যে এনেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি চিত্রে দেখা গিয়েছে রানী তালাব এলাকার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলর এবং তৃণমূল নেত্রী নাজনীন বেগম ও তার স্বামী খুরশিদ আনোয়ার এবং তাদের কয়েকজন অনুগামী তৃণমূল নেতাকর্মীদের একটি সালিশি সভার চিত্র। তৃণমূল নেতাকর্মীদের এই খাপ পঞ্চায়েতের ভিডিও সামাজিক প্রচার মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বহু মানুষ তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
ভাইরাল হওয়া ভিডিও
কি রয়েছে এই ভাইরাল ভিডিওতে?
ওই ভিডিওতে দেখা গিয়েছে সবুজ পোশাক পরা এক যুবক, একটি রঙিন হাফ টিশার্ট এবং একটি নীল রঙের জীনস্ পরে মাটিতে বসে রয়েছে। ওই যুবকের নাম সমীর রাজা। রাণী তালাব এলাকারই বাসিন্দা। আচমকাই ওই যুবককে এক মহিলা জুতো দিয়ে মারতে শুরু করে। আর চারিদিকে বসে থাকা তৃণমূল নেতা-নেত্রীরা গালিগালাজ করতে থাকে যুবককে। যে খাপ পঞ্চায়েত বসিয়ে এই নিদান দেওয়া হয়েছে।
সেই সভার মধ্যমণি হয়ে বসে রয়েছেন এলাকার প্রাক্তন কাউন্সিলর তথা তৃণমূল নেত্রী নাজনীন বেগম ও তার স্বামী খুরশিদ আনোয়ার এবং স্থানীয় তৃণমূল নেতা,কর্মীরা। কিছুক্ষণ বাদে ওই যুবককে ওই মহিলার থুতু মাটি থেকে চেটে খেতে বাধ্য করান তৃণমূল নেতারা।
কেন এই নিদান ?
এলাকায় বহুদিন ধরে গুঞ্জন চলছিল ওই মহিলার সঙ্গে সমীর রাজার সম্পর্ক নিয়ে। এলাকার কিছু মানুষের দাবি বহুদিন ধরেই ওই মহিলার সঙ্গে সমীর রাজা প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে ছিল। স্থানীয় সূত্রের খবর বিগত কিছুদিন ধরেই সমীর রাজা ওই মহিলার সঙ্গে সম্পর্ক না রেখে দূরত্ব বজিয়ে চলছিল। স্বভাবতই ওই মহিলা তৃণমূলের প্রাক্তন কাউন্সিলর নাজনীন বেগমের কাছে অভিযোগ জানান। আর তারই ফলশ্রুতি এই খাপ পঞ্চায়েত।
খাপ পঞ্চায়েত অথবা সালিশি সভা যে নামেই অভিহিত করা হোক, এই সভা থেকেই নাজনীন বেগম ও তার স্বামী খুরশিদ আনোয়ার নিদান দিয়েছেন ওই যুবককে প্রকাশ্যে জুতো মারা হবে এবং ওই মহিলার থুতু ওই যুবককে খেতে হবে। শুক্রবার সন্ধ্যায় হওয়া সালিশি সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, প্রেমের সম্পর্ক এবং প্রেমে প্রত্যাখ্যানের ঘটনা এলাকায় যাতে আর না ঘটে, তার জন্য দেওয়া হবে কড়া শাস্তি। এর আগেও এই এলাকায় এমন ঘটনা অনেক ঘটেছে বলেই অভিযোগ স্থানীয়দের। ভাইরাল হওয়া ছবিতে সাদা সালোয়ার স্যুট পরিহিত খুরশিদ আনোয়ারকে দেখা গিয়েছে প্রকাশ্যেই গালিগালাজ করতে।
এলাকার প্রাক্তন কাউন্সিলর এবং তার স্বামী ও স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের এই সালিশি সভা থেকে দেওয়া নিদান নিয়ে ইতিমধ্যেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে আসানসোলের রানি তালাব এলাকায়। খাপ পঞ্চায়েতের কায়দায় হওয়া এই সালিশি সভার বৈধতা প্রশ্ন তুলেছেন বহু মানুষ।
এই খাপ পঞ্চায়েতের বৈধতা আছে?
২০১৮ সালে দেশের সর্বোচ্চ আদালত এই খাপ পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সাধারণত খাপ পঞ্চায়েত অথবা সালিশি সভা ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যের প্রান্তিক অঞ্চলেই প্রচলিত। মূলত উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ রাজস্থানেই বেশি খাপ পঞ্চায়েতের নিদর্শন প্রকাশ্যে আসে।
সাধারণত উচ্চ বর্ণের পুরুষেরাই এর সদস্য হন। কিন্তু প্রয়োজনে অন্য বর্ণের বা অল্প বয়সের লোককে পঞ্চায়েতের বিচারের কাজে যুক্ত করা হয়। মোট কোথায় এলাকার মুরুব্বি স্থানীয় অথবা কোন রাজনৈতিক নেতারাই এই থাপ পঞ্চায়েতের বিচারে উপস্থিত হন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে বিচারের সময় উচ্চতর বর্ণের রীতিনীতি অনুসৃত হয় এই খাপ পঞ্চায়েতে। এরে উপরে আছে সর্ব খাপ। সর্ব খাপের প্রধান দুই পক্ষের বক্তব্য শোনেন তারপর সর্বকাপের ১০-১৫ জন প্রতিনিধিকে নিয়ে একটি ছোট্ট কমিটি গঠন করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।। বিভিন্ন রাজ্যের দেখা গিয়েছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রেম ,বিবাহ ,উচ্চবর্ণ নিম্ন বর্ণের বিবাদেই পঞ্চায়েতের প্রাধান্য। বহু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে আদালতের দ্বারস্থ না হয়ে এলাকার মানুষ খাপ পঞ্চায়েতের উপরেই নির্ভর করে। তবে বিভিন্ন সময় ঝগড়া বিবাদ সম্পত্তির বাঁটোয়ারাও খাপ পঞ্চায়েতের বিচারের আওতায় আসে।


More Stories
দুশ্চিন্তার দিন শেষ! আয়ুষ্মান কার্ড এখন হাতের মুঠোয়
আমডাঙায় ফুড প্লাজা ভাঙচুর, অভিযোগের তির বিজেপির দিকে
চুরমার বারাসাতের তৃণমূল নেতা অরুণ ভৌমিকের বাড়ি ও পার্টি অফিস, মেরে ফেলা হতে পারে আশঙ্কা স্ত্রীর