সময় কলকাতা ডেস্ক,৬ মে: “সমগ্র বিশ্ব যখন করোনা অতিমারির বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তখনও সন্ত্রাসবাদের বিপদ আমাদের পিছু ছাড়েনি। আমাদের জাতীয় স্বার্থকে বিপদের মুখে ফেলছে সন্ত্রাসবাদ। সন্ত্রাসবাদকে রুখতে সব দেশের একজোট হওয়া উচিত।” বক্তা ভারতের বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। সম্প্রতি এসসিও বৈঠকে এমনটাই বলেছেন তিনি। ইতিমধ্যেই ভারতে বসেছে এসসিও বৈঠক। আর এবারের বৈঠকে সন্ত্রাসবাদ হয়ে উঠেছে প্রধান আলোচ্য বিষয়। পাক বিদেশ মন্ত্রীর সামনেই সুর চড়িয়েছেন ভারতের বিদেশ মন্ত্রী। পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রী বিলাবল ভুট্টোর উপস্থিতিতেই ভারতীয় বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেন, “কূটনৈতিক ক্ষেত্রে নিজেদের দর বাড়ানোর জন্য সন্ত্রাসবাদকে অস্ত্র করবেন না।” এসসিও বৈঠকের প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করার আগে প্রথমেই উল্লেখ করা প্রয়োজন এসসিও কী? এসসিও বা সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশনের গুরুত্ব বোঝার আগে বলে নেওয়া ভালো এসসিও হল সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা বা সাংহাই চুক্তি অনুযায়ী গঠিত যার মূল লক্ষ্য। ৯টি এশীয় রাষ্ট্রের সম্মিলিত জোট, যা মূলত আঞ্চলিক উন্নয়ন ও সহযোগিতাকে উদ্দেশ্য করে গঠিত। বৈঠকে কি কি বিষয় উঠে এসেছে তার গভীরে ঢোকার আগে আরও সম্যক ভাবে জানা দরকার এসসিও সম্বন্ধে। কারণ এসসিও বৈঠকে সন্ত্রাসবাদ ও আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গে একজোট হওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার কথা বলা ভারতের বিদেশ মন্ত্রীর এই অবস্থান নতুন নয়।

এর আগেও একাধিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গে মুখর হওয়া জয় শংকর পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্র হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এসসিও বৈঠকের তাৎপর্য। চীন, কাজাখস্তান, কিরগিস্তান, রাশিয়া এবং তাজিকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধানগণের দ্বারা সীমান্ত অঞ্চলগুলিতে গভীর সামরিক বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে তুলতে ১৯৯৬ সালের ২ এপ্রিল চীনের সাংহাইয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে সাংহাই ফাইভ গ্রুপিং তৈরি করা হয়েছিল। ১৯৯৭-এর ২৪ এপ্রিল একই দেশগুলি রাশিয়ার মস্কোয় একটি বৈঠকে সীমান্ত অঞ্চলগুলিতে সামরিক বাহিনী হ্রাস সংক্রান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। ২০০১ সালে, সাংহাইতে বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনটিতে পাঁচটি সদস্য দেশ প্রথমে উজবেকিস্তানকে সাংহাই ফাইভ মেকানিজমের অন্তর্ভুক্তি করায় (এভাবে এটি সাংহাই সিক্সে রূপান্তরিত করে)। তারপরে উল্লেখিত রাষ্ট্রগুলি ২০০১ সালের ১৫ ই জুন সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করে এবং সাংহাই ফাইভ প্রক্রিয়াটির এতদূর পর্যন্ত গৃহীত ভূমিকার প্রশংসা করে। এরপরই এটিকে উচ্চ স্তরের সহযোগিতায় রূপান্তর করার লক্ষ্য নেয়। ২০০৫ সালের জুলাইয়ে কাজাখস্তানের আস্তানায় শীর্ষ সম্মেলনে ভারত, ইরান, মঙ্গোলিয়া এবং পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা প্রথমবারের মতো এর শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। রাশিয়ার উফায় ২০১৫ সালের জুলাই-এ সংস্থাটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ভারত ও পাকিস্তানকে পূর্ণ সদস্য হিসাবে অন্তর্ভুক্তি করার। এরপর উভয়ই ২০১৬ সালে জুন মাসে তাজখন্দ, উজবেকিস্তানে বাধ্যবাধকতার স্মারক স্বাক্ষর করেছিলেন। যার ফলে সংস্থায় পূর্ণ সদস্য হিসাবে যোগদানের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়।

২০১৭ সালের ৯ জুন আস্তানায় একটি শীর্ষ সম্মেলনে, ভারত এবং পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে সংস্থায় পূর্ণ সদস্য হিসাবে যোগদান করেছিল। বর্তমানে এর সদস্য ৯ এবং এখানে উল্লেখ করা দরকার এই সংস্থার সদস্য কিন্তু আমেরিকা নয়। অন্যদিকে, বরাবরই ভারতের মিত্র দেশ হিসেবে পরিচিত রাশিয়া এই সংস্থার অঙ্গ হলেও পাকিস্তানের মিত্র দেশ হিসেবে পরিচিত চিনও কিন্তু এই সংস্থার অঙ্গ। ভারতের গোয়ায় অনুষ্ঠিত এহেন সম্মেলনে এক যুগ পরে এসেছেন পাকিস্তানের দুই নেতা-মন্ত্রী। যে বৈঠকে উপস্থিত রয়েছেন চিন ও রাশিয়ার কূটনৈতিক স্তরের নেতা ও নেতৃত্ববর্গ তথা মন্ত্রীরা। স্বাভাবিকভাবে অন্য যেকোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনের চেয়ে এসসিও বৈঠকের রয়েছে আলাদা গুরুত্ব। উল্লেখ্য, প্রথমবারের সাক্ষাতের দু-মাস পর, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং চিনা স্টেট কাউন্সিলর এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিন গ্যাং বৃহস্পতিবার গোয়ায় এক প্রস্থ আলোচনা সেরেছিলেন। জয়শঙ্কর বলেছিলেন যে,বৈঠকের ফোকাস ছিল “অসামান্য সমস্যাগুলি সমাধান করা” এবং “সীমান্ত অঞ্চলে শান্তি ও প্রশান্তি নিশ্চিত করা”। জয়শঙ্কর রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সাথেও দেখা করেছিলেন এবং তারা “দ্বিপাক্ষিক, বৈশ্বিক এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার” “বিস্তৃত পর্যালোচনা” করতে গিয়েছিলেন। সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের শুক্রবারের বৈঠকের আগেই এসব বৈঠক হয়। টুইটারে জয়শঙ্কর জানিয়েছিলেন, “আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়ে চিনের স্টেট কাউন্সিলর এফএম কিন গ্যাংয়ের সঙ্গে একটি বিশদ আলোচনা প্রয়োজন। অসামান্য সমস্যার সমাধান এবং সীমান্ত এলাকায় শান্তি নিশ্চিত করার উপর ফোকাস রয়ে গেছে। এছাড়াও এসসিও,জি ২০ এবং বিআরআইসিএস নিয়ে আলোচনা হয়েছে।”

২ মার্চ নয়াদিল্লিতে বিদেশ মন্ত্রীদের জি ২০ বৈঠকের পরে জয়শঙ্কর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বর্তমান অবস্থাকে “অস্বাভাবিক” বলে বর্ণনা করেছিলেন। কারণ,তাদের আলোচনা ছিল সীমান্তর ” অচলাবস্থা” নিয়ে। যেখানে সীমান্তের প্রকৃত চিত্র বারবার তুলে ধরতে উদ্যোগী হয়েছে ভারত। পাশাপাশি লাভরভের সঙ্গে দেখা করার পর জয়শঙ্কর বলেন,“রাশিয়ার এফএম সের্গেই ল্যাভরভের সঙ্গে আমাদের দ্বিপাক্ষিক, বিশ্ব এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ব্যাপক পর্যালোচনা” প্রয়োজন ছিল। ইতিমধ্যেই ভারতের এসসিও সভাপতিত্বের জন্য রাশিয়ার সমর্থনের প্রশংসা করেছেন। এছাড়াও জি ২০ এবং বিআরসিআইএস সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।” রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, “আসন্ন যোগাযোগের সময়সূচী সহ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রধান ইস্যুতে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক এজেন্ডায় প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলির উপর একটি আস্থা-ভিত্তিক মতামত বিনিময় হয়েছে। মন্ত্রীরা আমাদের দেশের মধ্যে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত কৌশলগত অংশীদারিত্বের মূল ক্ষেত্রগুলিতে সহযোগিতার গতিশীলতার প্রশংসা করেছেন।”
আরও পড়ুন গরু পাচার মামলায় বড় ভূমিকা ছিল বিএসএফ কর্তাদের,দাবি ইডি-র

এদিকে,পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো গোয়া পৌঁছলেও চিনের বিদেশমন্ত্রী কিন গ্যাং উপস্থিত ছিলেন ওই বৈঠকে। সেখানে ভারতের বিদেশমন্ত্রী সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে রক্ষা করার জন্য সমস্ত এসসিও দেশকে অনুরোধ করেন। তবে জয়শঙ্কর এই প্রসঙ্গে সুনির্দিষ্ট ভাবে কিছুই উল্লেখ করেননি। তবে, চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই আপত্তি জানিয়ে আসছে। এটি পাকিস্তান অধিগৃহীত কাশ্মীরের উপর দিয়ে গিয়েছে। সমুদ্রের ধারে তাজ এক্সোটিকাতে হওয়া বৈঠকে প্রায় এক যুগ পরে ভারতে আসা পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রীকে নমস্তে বলে সম্বোধন করেছিলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী। যদিও বিলাওয়ালের সঙ্গে কোনও করমর্দন হয়নি। কিন্তু,বারবার উঠে এসেছে সার্বভৌমত্ব, কাশ্মীর ও সন্ত্রাসবাদ এবং রাশিয়া- চিন সহ নিকট প্রতিবেশী দেশ গুলির অবস্থান। এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠবে,সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গে ভারত নিজের অবস্থান সদস্যভুক্ত দেশগুলির সামনে তুলে ধরে কী কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করল পাকিস্তানের ওপর।


More Stories
নাবালক ছাত্রের সঙ্গে যৌ*ন মিলন , গ্রেফতার হাইস্কুল শিক্ষিকা
পুলওয়ামা হামলার মাস্টারমাইন্ড হামজা বুরহান খ*তম , কে এই হামজা?
সীমান্তে চ্যাংড়াবান্ধায় জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্তের পরই শুরু মাপজোক