Home » মুদ্রা কথা বলে : ভারতীয় মুদ্রার ইতিহাস (পর্ব-৩)

মুদ্রা কথা বলে : ভারতীয় মুদ্রার ইতিহাস (পর্ব-৩)

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ৩১ মেঃ ইউরোপীয়দের মধ্যে ভারতের কথা প্রথম ভেবেছিল পর্তুগিজরাই।  ভারতের কালিকট বন্দরে ১৪৯৮ সালে আসার পরে ১৫১০ সালে গোয়া আবিষ্কারের পরে তারা সোনা ও রুপো নির্মিত মুদ্রা প্রচলন করেছিল। ক্রোজাডো ও ম্যানুয়াল নামের স্বর্ণমুদ্রা সে সময়ে প্রচলিত হয়েছিল। দিনেমার বা ওলন্দাজরা ভারতে তথা বঙ্গে উপনিবেশ গড়ে তোলেন। এই সময় দিনেমার বা ডেনদের প্রবর্তিত মুদ্রা ছিল সোনা, রুপো তামা ও সিসা দিয়ে। ডাচদের সবচেয়ে প্রাচীন মুদ্রা গুলি ছিল সিসার তৈরি। ফরাসিরা ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নিজেদের রাজনৈতিক গুরুত্ব হারালেও ১৭০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ভারতে এক ফ্যানন ও আধ ফ্যানন মূল্যের রুপোর মুদ্রা প্রচলন করে। ইউরোপীয়দের মধ্যে ভারতে বেশি সময় কাটানো ইংরেজরা নিজেদের বাণিজ্যিক কার্যের প্রয়োজনে  ভারতীয় মুদ্রার  প্রস্তুত করার জন্য সচেষ্ট হয়। তারা মোগল শাসকদের মুদ্রা নকল করে মুদ্রা ব্যবহার করারই পক্ষপাতী ছিল এবং মুদ্রা জাল করেই নিজেদের কাজ চালাত।  এজন্য তারা মোগল সম্রাটদের অনুমতি লাভের জন্য সদাই সচেষ্ট ছিল।

আরও পড়ুন    মুদ্রা কথা বলে : ভারতীয় মুদ্রার ইতিহাস (পর্ব-১)

সম্রাট ফারুকশিয়ার অবশেষে ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মুম্বাই টাকশাল থেকে তাদের টাকা ছাপানোর অনুমতি দিলেন। ১৭৫৯ সালে তারা কলকাতার টাকশালে টাকা ছাপানোর অনুমতি পায়। ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত এভাবেই চলেছে। ১৮৩৫ সালে মোগল সম্রাটের নামাঙ্কিত মুদ্রার পরিবর্তে রাজার মস্তক চিত্রিত এক ধরনের মুদ্রার প্রচলন হয় সমগ্র ভারতের জন্য। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এভাবেই কেটেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত নতুন কোন মুদ্রা প্রচলন করা হয়নি। স্বাধীনতার তৃতীয় বর্ষপূর্তিতে ব্রিটিশ ভারতের মুদ্রার মূল্যমান, ওজন, নির্মাণশৈলী ও গড়ন বজায় রেখে ভারতের অতীত গৌরব ও ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা মুদ্রার মধ্যে ফুটিয়ে তোলা হয়।

রুপি বা টাকা থেকে পয়সা পর্যন্ত সব রকম মূল্যের মুদ্রা থেকে ব্রিটিশ সম্রাটের ছবি অপসারিত করে, সেখানে অহিংসা ও শান্তির প্রতীক হিসাবে মহামতি অশোকের সারনাথ স্তম্ভের সিংহ শীর্ষ উৎকীর্ণ করা হয়। ভারতে টাকার দশমিকীকরণ বা মেট্রিক গণণ পদ্ধতি চালু হয় ১৯৫৭ সাল থেকে। ১৮৩৫ থেকে চালু হওয়া মুদ্রাব্যবস্থায় রূপান্তর আসে ১৯৫৭ সাল থেকে। ১৮৩৫ সাল থেকে ১ টাকা যা কিনা ১৬ আনা বা ৬৪ পয়সা বা ১৯২ পাই ছিল, তা ১৯৫৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে বদলে যায়। ১ টাকাকে ১০০ নয়া পয়সা হিসেবে ধরা হয়। ১৯৬৪ সালের ১ জুন থেকে ১ টাকা ১০০ পয়সা বা সমতুল্য হিসেবে গণ্য হয়। ১৯৬৪ সালে অ্যালুমিনিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম দিয়ে মিশ্র ধাতুর মুদ্রার প্রবর্তণ করা হয়।

আরও পড়ুন   মুদ্রা কথা বলে: ভারতীয় মুদ্রার ইতিহাস (পর্ব-২)

১৯৮৮ থেকে কুড়ি পয়সা মূল্যর অন্য মিশ্র ধাতু ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন সময়ে ধাতুগত উৎকর্ষতার দিক থেকে নতুন চালু হওয়া মুদ্রাগুলি একই থেকে গেলেও উন্নয়নমুখী হিসেবেই মুদ্রাকে প্রচলন করা হচ্ছে। তবে মুদ্রা নিয়ে মানুষের মাথাব্যথা খুব বেশি নেই। মানুষের আকর্ষণ বা কৌতুহল ব্যাংক নোট বা কাগজী নোটের প্রতি। সম্প্রতি রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার বিজ্ঞপ্তির পরে মানুষের মাথাব্যথা আরও বেড়েছে নোট নিয়ে। ৫০০ বা ১০০০ টাকা নিয়ে ভোগান্তির পরে ২০০০ টাকা রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া প্রত্যাহার করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানোয় মানুষ চিন্তিত। তবে ভারতে কাগজী নোট বা ব্যাংক নোট হিসাবে যা পরিচিত, তা মোটেই কাগজ দিয়ে তৈরি নয় বরং কটন, লেনন ও তুলো দিয়ে তৈরি। ব্যাংক নোটের অর্থকরী দিক যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, নোটের আদিতে রয়েছে বিভিন্ন ধাতু নির্মিত মুদ্রা। মুদ্রার পরতে পরতে রয়েছে ইতিহাস যা কথা বলে, বলেই চলে।।

About Post Author