Home » মুদ্রা কথা বলে : ভারতীয় মুদ্রার ইতিহাস (পর্ব-১)

মুদ্রা কথা বলে : ভারতীয় মুদ্রার ইতিহাস (পর্ব-১)

পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা , ২৭ মে : মুদ্রা যে কথা বলে, এ বহুপ্রচলিত কথা। মুদ্রা যুগে যুগে কথা বলে এসেছে। অনুমান করা হয়, প্রাচীন ভারতে বিনিময় পদ্ধতির পরে মুদ্রা চালু হয় আজ থেকে প্রায় ২ হাজার ৭০০ বছর আগে। পাণিনি রচিত ব্যাকরণ অষ্টাধ্যয়ীতে নিস্ক, মন বা মনা, শতমন বা শতমনা, পড় প্রভৃতি মুদ্রাবোধক শব্দগুলি পাওয়া যায়। যুগে যুগে বিভিন্ন মুদ্রা চালু হয়েছে যার অধিকার বলে মানুষ ধনী বলে পরিচিত হয়েছে। যা থাকায় রাজকোষ পূর্ণ হয়েছে। সেই মুদ্রার ব্যবহারিক অস্তিত্ব কালের নিয়মে হারিয়ে গিয়েছে। হাল আমলে দেশের শীর্ষ ব্যাঙ্ক রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া ২০০০ টাকা প্রত্যাহার করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা একটি চিরাচরিত অধ্যায় মাত্র। হারিয়ে যাওয়া বা ব্যবহার অযোগ্য মুদ্রার গুরুত্ব তবুও কমেনি। যুগে যুগে ব্যবহৃত মুদ্রা আজও কথা বলে চলেছে।

আরও পড়ুন    জেনে নিন মহাবীর জয়ন্তীর তাৎপর্য ও ইতিহাস!

২ হাজার ৭০০ বছর ধরে প্রাচীন ভারত, মধ্যযুগের ভারত বা আধুনিক ভারতের বিভিন্ন আমলে ব্যবহার হওয়া মুদ্রা হয়ে উঠেছে উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক উপাদান। পাণিনির ব্যাকরণ অষ্টাধ্যয়ীতে যেভাবে মুদ্রাবোধক শব্দের ব্যবহার হয়েছে, তার থেকে অনুমান করাই যেতে পারে প্রাচীন ভারতের মুদ্রার বহুল প্রচলন ছিল এবং তা যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা হত। আধুনিক ঐতিহাসিকরা মনে করেন, ভারতে মুদ্রা প্রচলনের অনুমিত সময় যা কিনা খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দী, তা সঠিক হলে, চিন বা প্রাচীন পশ্চিম এশিয়া মাইনরের লিডিয়ার ১০০ বছর আগেই ভারতে মুদ্রার প্রচলন ঘটেছিল। মুদ্রা সাতাশশো বছর ধরে ভারতের ইতিহাস রচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বহন করে চলেছে। প্রাচীন পুস্তকের চেয়েও অনেক সময় প্রয়োজনীয় ভূমিকা নিয়েছে মুদ্রা।

উদাহরণ হিসেবে বলাই যেতে পারে, সাতবাহন রাজাদের সম্পর্কিত তথ্য তাদের প্রচলিত মুদ্রা থেকেই নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে। সে সময়ের উৎকীর্ণ লিপি বা শিলালেখ বা গ্রন্থাদিতে বর্ণিত সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তাদের সম্পর্কিত তথ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে। এরকম ভাবেই প্রচলিত দৃষ্টিকোণের সঙ্গে কোনওক্ষেত্রে সঙ্গতি, কোনওক্ষেত্রে অসঙ্গতি রেখেছে মুদ্রা। তথাপি ইতিহাস প্রচলিত ধ্যান ধারণা নয়, মুদ্রাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, বিশ্বাস রেখেছে মুদ্রার উপরে। এক্ষেত্রে প্রথমেই উল্লেখযোগ্য মুদ্রার মাধ্যমে প্রাপ্ত ধর্মীয় ইতিহাস। মুদ্রা ধর্মীয় ধ্যানধারণার কথা বলে, মুদ্রা শাসকদের ধর্মজ্ঞান, ধর্মপ্রীতি, ধর্মান্ধতা বা ধর্মে উদারতার কথাও বলে। খ্রিস্টীয় প্রথম বা দ্বিতীয় শতকে পশ্চিম ভারতের শাসক কুষান বংশীয় রাজাদের ক্ষেত্রে গ্রীক, পারসীক, বৌদ্ধ বা সনাতন ধর্মীয় দেবদেবীর চিত্র উৎকীর্ণ থাকতে দেখা গিয়েছে।

কনিষ্কের সময়কালের মুদ্রায় বুদ্ধদেবের প্রতিমূর্তি চিত্রিত ভাবতে দেখা গিয়েছে। আবার গুপ্ত সম্রাটদের সময়কালে মুদ্রার ওপরে দূর্গা, গঙ্গা এবং লক্ষ্মীর ছবি খোদাই হয়েছে। সম্রাট আকবরের কথা, যার উদার দৃষ্টিভঙ্গির কথা বহু প্রচলিত এবং তাকে মহামতি বলেই আখ্যা দেওয়া হয়েছে ইতিহাসে। তার প্রবর্তিত মুদ্রায় রাম সীতার চিত্র উৎকীর্ণ থাকায় এক নতুন ঐতিহাসিক ধারণা ব্যাপ্তিলাভ করেছে। দীন ইলাহির প্রবর্তক মহামতি আকবর যে বৈষ্ণব ভাবাপণ্য ভক্তি মতবাদের প্রতিও আগ্রহী ছিলেন, তা জানা যায় তাঁর মুদ্রা থেকেই। অন্যদিকে, অন্য মোগল সম্রাটদের সম্পর্কেও মুদ্রা বিভিন্ন তথ্য দেয়। ঔরঙ্গজেব প্রবর্তিত দিরহাম সরাই নামক মুদ্রার সঙ্গে বৈবাহিক পণ ও শাস্তিমূলক করের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল। ঔরঙ্গজেব ধর্মীয়ভাবে সংকীর্ণ মনস্ক ছিলেন এবং অতিরিক্ত গোঁড়া ছিলেন তার প্রমাণ মেলে। তার পূর্ববর্তী মোগল শাসকদের মুদ্রার অন্যতম বৈশিষ্ট্য কলমা তাঁর সময়ের মুদ্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়, কারণ হিসেবে ঐতিহাসিকরা বলেন সম্রাট চাননি পবিত্র কোরানের বাণী অমুসলমানদের হাতে অপবিত্র হয়ে উঠুক।

আরও পড়ুন   ধনকুবের রকফেলার ও স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি: অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ইতিহাস

গজনীর আক্রমণকারী সুলতান মামুদ বা ঘোরীকে সনাতন ধর্মের ঘোর বিরোধী বা দেব-দেবী তথা মন্দিরের ধ্বংসকারী হিসেবে জানা গেলেও তাদের মুদ্রার ইতিহাস পৃথক কথাও বলে। সুলতান মামুদ তাঁর প্রবর্তিত মুদ্রায় সংস্কৃতে মুসলিম ধর্মের পবিত্র কলমার অনুবাদ খোদাই করিয়েছিলেন। মোহাম্মদ ঘোরীর স্বর্ণমুদ্রায় উৎকীর্ণ হয়েছিল দেবী লক্ষ্মীর ছবি এবং ঘোরী নিজের নাম দেবনাগরী হরফে মুদ্রার উপরে খোদাই করিয়েছিলেন। মুদ্রা বলে শিল্পের কথা। ভিন্ন ভিন্ন রাজা, নবাব বা সম্রাটদের সময় প্রচলিত শিল্পের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে মুদ্রার মাধ্যমে। শিল্পীদের শিল্প নৈপুণ্য ও সৌন্দর্য্যবোধ বিভিন্ন সময়ের মানুষদের রুচিবোধ ও শিল্পপ্রীতির প্রমাণ দেয়। ভারত-ব্যাকট্রিয়, গুপ্ত সম্রাট বা সাতবাহন রাজাদের সময়ের মুদ্রার শিল্পসৌন্দর্য্য চোখে পড়ার মত ছিল। জাহাঙ্গীরের আমলে হস্তলিপিকে উৎকীর্ণ করা হয়েছে মুদ্রায়। আদিকাল থেকে আধুনিক সময়ের আগে অব্দি মুদ্রা তার বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছে তার বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যা তুলে ধরার প্রয়াস ক্রমশ প্রকাশ্য।

About Post Author