Home » মুদ্রা কথা বলে: ভারতীয় মুদ্রার ইতিহাস (পর্ব-২)

মুদ্রা কথা বলে: ভারতীয় মুদ্রার ইতিহাস (পর্ব-২)

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ২৮ মে: মুদ্রার গোড়ার কথা বলতে গেলে প্রাচীন ভারতে স্বর্ণমুদ্রা প্রচলিত ছিল না বলেই মনে করা হয়। কারণ, বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন ও যোগাযোগের কথাই উল্লেখ করেন ঐতিহাসিকরা। প্রাচীন ভারতে সোনা দুর্লভ ছিল না বরং বহির্বিশ্বে সোনার চাহিদা ছিল খুব বেশি। প্রাচীন ভারত থেকে সোনা রপ্তানি করা হত ও আমদানি করা হত রুপো। ফলে মুদ্রার রুপোই সেই সময় ব্যবহার করা হত বলে মনে করেন ঐতিহাসিকরা। ইন্দু ব্যাকট্রিয় গ্রিক রাজাদের আবির্ভাবের পর থেকেই ভারতে স্বর্ণমুদ্রা প্রচলন করা হয়। প্রাচীন ভারতে মুদ্রা কিভাবে তৈরি করা হত, তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে। প্রথমে ধাতু গলিয়ে তা ক্ষার দিয়ে শোধন করা হত। তাকে নেহাই-এর উপর রেখে হাতুড়ি জাতীয় ভারী বস্তু দিয়ে পিটিয়ে পাতলা পাতে পরিণত করে, টুকরো টুকরো করে কাটা হত এবং এরপরে ছাচে ফেলে ছিন্নযুক্ত মোহর দিয়ে ছাপ দেওয়া হত।

আরও পড়ুন  মুদ্রা কথা বলে : ভারতীয় মুদ্রার ইতিহাস (পর্ব-১)

বর্তমানে যান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হলেও আজও মুদ্রা নির্মাণে এই আদি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। আদিতে মুদ্রা বিভিন্ন জ্যামিতিক আকারের হত, যেমন বৃত্তাকার, উপবৃত্তাকার বা ডিম্বাকৃতি। তবে এখনকার মত একবার ছাপ দিয়ে প্রাচীন সময়ে মুদ্রা প্রস্তুত হত না, একাধিকবার অথবা সর্বোচ্চ পাঁচবার ছাপ দিয়ে মুদ্রা প্রস্তুত করা হত। তাই এক থেকে পাঁচবার পর্যন্ত সুস্পষ্ট চিহ্ন অঙ্কিত সিলমোহর দিয়ে ছাপ দিয়ে প্রস্তুত মুদ্রাকে তাই ঐতিহাসিকরা পাঞ্চ মার্কড কয়েন বলে উল্লেখ করেন। প্রথমদিকের মুদ্রায় একদিকে কেবলমাত্র ছাপ দিয়ে মুদ্রা প্রস্তুত করা হত, অন্য দিকটি খালি থাকত। ক্রমশ মুদ্রার বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে খালি দিকেও সূক্ষ্ম ছাপ দেওয়ার কাজ করা শুরু হয়। সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় পাঞ্চ মার্ক যুক্ত মুদ্রা পাওয়া গেলেও প্রাচীন মুদ্রা মূলত মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত শুরসেনা, উত্তর পাঞ্চাল, দক্ষিণ পাঞ্চাল, বৎস বা উজ্জয়িনী, কাশী, কোশল, বঙ্গ, কলিঙ্গ, গান্ধার প্রভৃতি স্থানেই পাওয়া গিয়েছে। প্রতিটি স্থানের মুদ্রার নির্মাণ পদ্ধতি ও গঠনশৈলী ভিন্ন ভিন্ন। মোহরাঙ্কিত চিহ্নযুক্ত রজত মুদ্রার ব্যবহার খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর কোনও সময় বন্ধ হয়ে যায়।

গুপ্ত যুগের অভ্যুদয়ের পরে আবার রৌপ্যমুদ্রার কথা জানা যায়। পরবর্তীতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের ফলে মুদ্রা বানানোর ছাঁচ পাওয়া গিয়েছে মথুরা, এলাহাবাদ, ওড়িশা বা অন্ধ্রপ্রদেশের বিভিন্ন জায়গায়। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকে জানা যায়, মৌর্য সাম্রাজ্যের বিভিন্ন টাকশাল থেকে পণ, অর্ধপণ, পড়, অর্ধপড়িক নামক চারটি বিভিন্ন মূল্যের রৌপ্যমূদ্রা চালু করা হয়েছিল। ভারতে বিদেশি মুদ্রার প্রচলন হয় মহারাজা আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের পরবর্তী সময়ে। অনুমান করা হয়, সেনাপতি সেলুকাসের নির্দেশে সে সময় ডেকাড্রাকমাস নামে এক রজত মুদ্রার প্রচলন করা হয়। বলা হয়, এই মুদ্রাটিতে পুরু ও আলেকজান্ডারের যুদ্ধ খোদিত ছিল। পরবর্তীতে আলেকজান্ডারের সাম্রাজ্য গ্রিক সেনাপতিদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন ইন্দো-ব্যাকট্রিয় রাজা ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত শাসন করেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী রাজা ছিলেন রাজা মিনান্দার বা মিলিন্দার। এই ব্যাকট্রিয় রাজাদের প্রথমবার স্বর্ণ মুদ্রা ভারতে প্রচলিত হয়।

আরও পড়ুন   নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধন অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে থাকছে তথ্যচিত্র প্রদর্শন

ডিওডটাস ব্যাকট্রিয়ায় যে অঞ্চলে বর্তমানে রয়েছে আফগানিস্তান, উজবেকিস্তান বা তাজাকিস্তান প্রভৃতি দেশ, সেখানে স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন ঘটালেও ঐতিহাসিকরা মনে করেন, রাজা মিলিন্দারের সময় ভারতের একটি বিরাট অংশজুড়ে চালু হয় ভারতে প্রথমবারের মত প্রস্তুত স্বর্ণ মুদ্রা। কুষানদের সময়ে তাম্রমুদ্রা পাওয়া যায় ব্যাকট্রিয় অঞ্চল থেকেই। প্রথম কুষাণ রাজ কুজুল কদফিসিসের পূর্বপুরুষের নামাঙ্কিত তাম্র মুদ্রা এ যুগে উল্লেখযোগ্য। কনিষ্ক সোনা ও তামা উভয়প্রকার মুদ্রার প্রচলন করেন। গুপ্ত সম্রাটগণ আবার সোনা দিয়েই মুদ্রা উৎপাদন করিয়েছেন। এ যুগে এত বেশি স্বর্ণমুদ্রা উৎপাদন করা হয় যে, সত্য যুগের মুদ্রা উৎপাদনকে স্বর্ণবৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি যে গুপ্তযুগের মুদ্রা পাওয়া গেছে, সেখানে রাজাকে বাঁ হাতে ধনুক ধরে থাকতে দেখা গেছে। সমুদ্রগুপ্ত বা কুমারগুপ্তের মুদ্রায় নরপতিকে বিনাবাদ্যরত অবস্থায় দেখা গিয়েছে। অশ্বমেধ যজ্ঞের চিত্র উৎকীর্ণ হয়েছে গুপ্তযুগের মুদ্রায়। আবার হুম রাজ মিহির কুলের তাম্রমুদ্রায় দেবীলক্ষ্মীর ছবি চিত্রিত থাকতে দেখা গিয়েছে।

আরও পড়ুন    ৬০ বছরে দ্বিতীয়বার গাঁটছড়া বাঁধলেন অভিনেতা আশিষ বিদ্যার্থী

প্রাচীন বঙ্গ ও অসমের সপ্তম অষ্টম শতকের এমন কিছু মুদ্রা মিলেছে, যা গুপ্ত যুগের মুদ্রার অপটু অনুকরণ। ভারতবর্ষের সর্বপ্রথম মুসলমান সাম্রাজ্য স্থাপন করেছিলেন ইমদ উদ্দিন ইবান কাশিম। ৭১২ খ্রিস্টাব্দে তিনি সিন্ধু প্রদেশ দখল করেন। তিনি কিছু ক্ষুদ্র রৌপ্য মুদ্রা প্রচলন করেন। সুলতান মামুদের সময় থেকে মুদ্রায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। সুলতান তার মুদ্রায় ধীরে ধীরে দিনার থেকে দিরহাম মুদ্রা প্রবর্তন করেন এবং এই দুই যুগ সময়ের মধ্যে তার জিহাদী মনোভাবের পরিবর্তন ক্লান্তভাবে লক্ষ্যনীয় হয়েছিল মুদ্রার মধ্যে দিয়ে। পরবর্তীর মুসলমান শাসকদের মুদ্রার কথা বলতে হলে মহম্মদ তুঘলকের উল্লেখ না করলেই নয়। মোহাম্মদ বিন তুঘলক রূপো ও মিশ্র ধাতুর মুদ্রার পরিবর্তে ১৩২৯ সালে মুদ্রা প্রচলনের বিক্ষিপ্ত প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। কিন্তু এই মুদ্রা তিনি এমনভাবে প্রস্তুত করিয়েছিলেন, যার ফলে জাল মুদ্রা প্রস্তুত করা অতি সহজ হয়ে ওঠে। সে সময় ঘরে ঘরে জালমুদ্রা প্রস্তুতির কারখানা তৈরি হয়ে যায় এবং সুলতানকে এই মুদ্রা প্রত্যাহার করে নিতে হয় এবং মিশ্র ধাতুর একটি নতুন মুদ্রার প্রচলন করেন। মধ্যযুগের মুদ্রার ইতিহাসকে সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হলেও মুদ্রার ইতিহাসের দলিলের পরবর্তী উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ইউরোপীয় যুগের মুদ্রা থেকে বর্তমান যুগের মুদ্রা যা ক্রমশ তুলে ধরা হচ্ছে।

About Post Author