পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা,১ জুন : রসনাপ্ৰিয় বাঙালি যে মিষ্টান্ন প্ৰিয় সে আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না – আর মিষ্টির ইতিহাস ক’জন-ই বা আর জানতে চায়? তবুও কোনও কোনও ক্ষেত্রে দু-একটি মিষ্টির ইতিহাস ঘিরে কৌতূহল আজও রয়েছে। যেমনটি ১৬৭ বছর আগে জন্মলাভ করে দ্রুত জনপ্রিয় হওয়া লেডিকেনি নামক মিষ্টিটির পরতে পরতে ইতিহাস।উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি কলকাতায় লেডিকেনি নামক যে মিষ্টির উৎপত্তি, তাকে ঘিরে একাধিক তথ্য।কোনটি সত্যি, কোনটি শুধুই জনশ্রুতি -বলা দুস্কর। তবুও যতদূর জানা যায় প্রথমদিকে এই মিষ্টির উপকরণ এত বিভিন্ন ধরণের ছিল না তথাপি ছিল জনপ্রিয়তা। লেডিকেনির উৎপত্তি ও জনপ্রিয়তা নিয়ে যে বিভিন্ন জনশ্রুতি ছড়িয়ে আছে তার প্রাণকেন্দ্রে জড়িয়ে রয়েছে ভারতের শেষ গভর্নর জেনারেল এবং প্রথম ভাইসরয় লর্ড চার্লস ক্যানিংয়ের সহধর্মিনী লেডি শার্লট ক্যানিংয়ের নাম।

আরও পড়ুন : খনামিহিরের ঢিপির মাটিচাপা ইতিহাস
একটি মিষ্টি এবং মিষ্টির জন্ম ঘিরে এত জনশ্রুতি বিরল।সবচেয়ে প্রচলিত কিংবদন্তি অনুসারে, ১৮৫৬ থেকে ১৮৬১ সালে মৃত্যু পর্যন্ত ভারতে থাকার সময় লেডি ক্যানিংয়ের সম্মানে ভীম চন্দ্র নাগ কোনও এক বিশেষ সময় একটি বিশেষ মিষ্টি তৈরি করেছিলেন। সে সময় দুধের ছানা, চিনি,এলাচ ও ময়দা দিয়ে মিষ্টিটি তৈরি করা হত তা জানা যায়।কিন্তু সেই বিশেষ সময়টি কী – যা মিষ্টির প্রস্তুতকারকদের অনুপ্রাণিত করেছিল? যে মতটি অধিক প্রচলিত- সেই মতবাদ মেনে বলা যায় , ১৮৫৬ সালে তার ভারত সফরকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য মিষ্টি তৈরি করা হয়েছিল । আবার এও বলা হয়, এই বিশেষ মিষ্টিটি ১৮৫৮ সালে লেডি ক্যানিংএর পত্নীর জন্মদিন উপলক্ষে তৈরি করা হয়েছিল। এমন সম্ভাবনাও রয়েছে,১৮৫৬ সালে মিষ্টিটি তৈরি হলেও দু বছর পরে লেডি ক্যানিংয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে এই মিষ্টিতে ছিল অন্যতম পদ। কারণ এ নিয়ে বহু গল্পকথা ও চালু প্রবাদ চালু থাকলেও বলা হয় মিষ্টিটি লেডি ক্যানিংয়ের অত্যন্ত প্রিয় ডেজার্টে পরিণত হয়েছিল, যা তিনি তাঁদের আয়োজিত প্রতিটি অনুষ্ঠানে যেন থাকে তেমনটাই চাইতেন । আরেকটি কিংবদন্তি অনুসারে, ক্যানিং এবং তার স্ত্রীর সফরকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৮৫৭ সালে বহরমপুরের মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারীরা সিপাহী বিদ্রোহ অবসানের পরে পরে মিষ্টি তৈরি করেছিলেন।

আরও পড়ুন :rরবীন্দ্রনাথের ঈশ্বরচেতনা
যাই হোক না কেন লেডিকেনির আলোচনা করা হলে শার্লট ক্যানিং সম্পর্কে জানা দরকার। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় প্রচুর সংখ্যায় মেমসাহেব ভারতে ছিলেন বা তাঁর আগেও বহু শ্বেতাঙ্গিনী ভারতে এসেছেন। ভারতে আসা বিদেশিনীর সংখ্যা যত বেশি হোক না কেন,সেই শ্বেতাঙ্গিনীদের মধ্যে লেডি ক্যানিংয়ের মত জনপ্রিয় বা সাধারণ মানুষের কাছের মানুষ খুব কম ছিলেন।১৮১৭ সালের ৩১ মার্চ শার্লট এলিজাবেথের জন্ম প্যারিসে। তিনি ছিলেন লর্ড স্টুয়ার্ট ডি রথসের জ্যেষ্ঠ কন্যা। ৩৯ বছর বয়সে তিনি ভারতে আসেন এবং ইতিহাস সাক্ষী যে প্রথম দিন থেকেই ভারতকে আপন করে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন ভাইসরয় পত্নী । এবং বাস্তবে তিনি তাই করেছিলেন তাই ভারতের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল তাঁর আত্মিক যোগ ।তিনি স্বামীর সঙ্গে যাবতীয় বিপদ ঝঞ্ঝা উপেক্ষা করে ভারতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে টহল দিতেন, মানুষের খোঁজ খবর নিতেন । মনে রাখতে হবে যে সময় লেডি ক্যানিং ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহ দানা বাঁধছে। সিপাহী বিদ্রোহে বহু ইংরেজ প্রাণ হারান। তবুও লর্ড ক্যানিংয়ের সঙ্গে প্রায় সর্বত্র যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অকুতোভয় ছিলেন।১৮৬১ সালে এরকম এক ভ্রমণকালে জনপ্রিয় লেডি ক্যানিং দার্জিলিং গিয়ে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন এবং এই মারণ ব্যাধিতেই কলকাতার রাজভবনে তার প্রয়াণ ঘটে । দিনটি ছিল ১৮৬১ সালের ১৮ নভেম্বর। তাঁর তখন সবেমাত্র ৪৪ বছর বয়স। বলা হয় ভারত অত্যন্ত পছন্দের জায়গা, ভারত ছেড়ে কখনই তিনি যেতে চাননি আর ভারতেই তিনি থেকে যান।তাঁর অত্যন্ত পছন্দের জায়গা ছিল ব্যারাকপুর, সেখানেই গঙ্গার ঘাটে সমাধিস্থ করা হয় তাকে। পরবর্তীতে তাঁর দেহ ব্যারাকপুরে রেখে, তাঁর সমাধিসৌধ ডালহৌসির সেন্ট জনস চার্চে নিয়ে আসা হয়। ভারতে আসা এই বিদেশিনী ভারতের সাধারণ মানুষকে পাশে পেয়েছেন পাঁচ থেকে ছ বছর তবুও বাংলার মাটিতেই তিনি রয়ে গিয়েছেন। তবুও তাঁর কথা, তাঁর বঙ্গ প্রীতি ও ভারতের প্রতি অনুরাগ বাঙালি ও ভারতীয়রা ভোলে নি। তারপর থেকে মিষ্টিটি বাংলায় তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। কথিত আছে, উনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কোনও বড় মাপের অনুষ্ঠানে বা ঘরোয়া জাকজমকপূর্ণ খাওয়াদাওয়ার আসরে অভ্যাগত ও অতিথিকে লেডিকেনি নামক মিষ্টি খাওয়ানো না হলে কোন জমকালো ভোজ সম্পূর্ণ বলে বিবেচিত হত না।যদিও বলা হয় যে এই মিষ্টির প্রস্তুতকারক মিষ্টি বিক্রি করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছেন যদিও কেউ কেউ দাবি করেছেন যে এর জনপ্রিয়তা স্বাদের তুলনায় নামের কারণে বেড়ে যায় । আর সেই নামটি বলাইবাহুল্য লেডি ক্যানিংয়ের।

এই মিষ্টি বহুল প্রচলিত হয় ও জনপ্রিয়তা অর্জন করে।প্রচলিত ব্যাখ্যা,মিষ্টিটি তাঁর প্রতি স্মরণে “লেডি ক্যানিং ” নামে পরিচিতি লাভ করে। এ যেন এক শ্রদ্ধার্ঘ্য।লেডি ক্যানিং নামে পরিচিত মিষ্টি ধীরে ধীরে ‘লেডিকেনি’নামে মানুষের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে স্বাদে অসাধারণত্ব আনতে লেডিকেনির উপকরণ পাল্টেছে।ছানা, ক্ষীর, ময়দা, সুজি,এলাচ গুঁড়ো ও চিনি দিয়েও প্রস্তুত করা হয় লেডিকেনি।আধুনিক পান্তুয়া ও লেডিকেনি প্রায় একই ধরনের মিষ্টি যে মিষ্টি তৈরির কথা দ্বাদশ শতকের সংস্কৃত মানসোল্লোসা বা অভিলাষীতর্থ চিন্তামনি তে উল্লিখিত। কল্যাণী চালুক্য রচিত এই গ্রন্থে রাজনীতি, শাসন, অর্থনীতি, জ্যোতিষ, চিকিৎসারশাস্ত্রর পাশাপাশি রন্ধনশাস্ত্রর উল্লেখ রয়েছে। লেডি ক্যানিং সেই আদি ঐতিহ্যময় ভারতের হেঁশেলের একটি খাদ্যের স্বাদ পেয়েছিলেন যা যুগোত্তীর্ন হয়ে রয়েছে এক বিদেশিনীর ছোঁয়ায় । যুগের সাথে সাথে অনেক কিছু মুছে গেছে,অক্ষয় হয়ে রয়ে গিয়েছেন লেডি শার্লট ক্যানিং।
আরও পড়ুন : itমুদ্রা কথা বলে : ভারতীয় মুদ্রার ইতিহাস (পর্ব-৩)


More Stories
জামাইষষ্ঠীর নতুন অতিথি,গাছ থেকে আম পেড়ে খেল হাতি
বিয়ের গাড়ি সাজিয়ে গরুপাচারের ধুরন্ধর কায়দা ব্যর্থ
আপনার ভুলে যাওয়া টাকা কি পড়ে আছে কোথাও? এখনই খুঁজে নিন — সরকারি পোর্টালে বিনামূল্যে!