Home » রেল দুর্ঘটনায় নৈতিক দায়ের প্রশ্নে রেলমন্ত্রীর পদত্যাগ ও ইতিহাস (পর্ব ২)

রেল দুর্ঘটনায় নৈতিক দায়ের প্রশ্নে রেলমন্ত্রীর পদত্যাগ ও ইতিহাস (পর্ব ২)

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ৬ জুন : সম্প্রতি বালেশ্বরে ঘটে যাওয়া রেল দুর্ঘটনার পরে  দুর্ঘটনার নৈতিক দায় নিয়ে রেলমন্ত্রীর  পদত্যাগের  দাবি উঠেছে। কিন্তু পদত্যাগ?  ভারতীয় রাজনৈতিক অঙ্গণে পদত্যাগ খুব কমই দেখা যায়, বিশেষ করে যখন নৈতিক দায়ের প্রশ্ন উঠে আসে। যাইহোক, এই ঘটনার তীব্রতার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই মনে করছেন যে নৈতিক দায়ের প্রশ্নে পদত্যাগ একটি প্রতীকী কাজও হয়ে উঠতে পারত প্রাণ হারানো মানুষেদের রক্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের প্রয়োজনের জন্য প্রকৃত উদ্বেগ প্রদর্শন ও পদত্যাগ সম্ভবত একটি অনুঘটকের কাজ করত।

নৈতিক দায়ের কাঁটায় বিদ্ধ হয়ে দায়িত্বশীল অধিকারী হিসেবে  জবাবদিহি কে করেন ? কেউ তো করেন, কেউ তো করেছেন। সবাই নৈতিক দায়িত্ব কাঁধে নেন না কিন্তু কেউ কেউ তো নেন। সবাই মানবিক হন না, কেউ কেউ তো হন। আর দুর্ঘটনার পরে পদত্যাগ করার দৃষ্টান্ত কাউকে তো প্রথমে স্থাপন করতেই হয়। রেল দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ভারতে যেমনটা প্রথমবার নৈতিক দায়ের  প্রশ্নে পদত্যাগ করেছিলেন দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও  প্রাক্তন রেলমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। ১৯৫৬ সালে তৎকালীন রেলমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী তামিলনাড়ুর আরিয়ালুর ট্রেন দুর্ঘটনার জন্য নৈতিক দায়িত্ব মাথায় তুলে নিয়েছিলেন। ১৯৫৬ সালের নভেম্বরে প্রায় ১৪২ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল এই দুর্ঘটনায়। জানা যায়, প্রথমে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এই পদত্যাগ পত্র নিতে না চাইলেও অটল ছিলেন প্রাক্তন এই দেশনেতা। শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ পত্র গ্রহণ করেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। তাঁর কাছ থেকে লালবাহাদুর শাস্ত্রী প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। কিন্তু লাল বাহাদুর শাস্ত্রী কি প্রশংসার জন্য এই কাজ করেছিলেন? রাজনৈতিকভাবে আশঙ্কাই ছিল হয়তো শিক্ষার আলোকে পিছিয়ে থাকা ভারতবর্ষের অনেক মানুষ ভাববেন এই দুর্ঘটনার যাবতীয় দায় রেলমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর। মনে করা হয়, লালবাহাদুর শাস্ত্রী পদত্যাগ করেছিলেন মানবিক ও নৈতিক উভয় কারণেই, অগ্রপশ্চাৎ বিচার তিনি করেননি। হয়তো ভোটবাক্সের প্রতি তাঁর প্রলোভন ছিল না, তিনি ছিলেন প্রকৃত দেশনেতা। এমনটাও হতে পারত এই পদত্যাগ তাঁর বিরুদ্ধে বুমেরাং হিসেবে কাজ করতে পারত। তথাপি এই পদত্যাগ করার ফলস্বরূপ শাস্ত্রীর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়, যার ফলে পরবর্তীকালে তাঁকে মন্ত্রীসভায় ফিরিয়ে এনে অন্য মন্ত্রী পদে নিয়োগ করা হয় এবং অবশেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন লালবাহাদুর শাস্ত্রী। লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর পদত্যাগের ৪৩ বছর পর রেলমন্ত্রীর দ্বিতীয় পদত্যাগের দৃষ্টান্ত সামনে আসে ।

১৯৯৯ সালের আগস্টে নীতীশ কুমার  অসমের গাইসাল ট্রেন বিপর্যয়ের পরে নৈতিক দায়ের প্রশ্নে রেলমন্ত্রীর পদ থেকে  পদত্যাগ করেন । বিহারের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও তৎকালীন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী নীতীশ কুমার রেলমন্ত্রক থেকে পদত্যাগ করার পরে আরও দুটি পদত্যাগের ফলপ্রসূ হওয়া বা না হওয়া প্রচেষ্টা ও সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। বলা হয়, ২০০০ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুটি রেল দুর্ঘটনার দায় নিয়ে অটল বিহারী বাজপেয়ীর কাছে পদত্যাগ পত্র পাঠিয়েছিলেন যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহার বাজপেয়ী প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এই সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগ করার প্রবণতা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা হয়। বিজেপিতেও নৈতিকতার দায় নিয়ে পদত্যাগ করার নেতা বিরল নয়। বিজেপি একক শক্তিতে ক্ষমতায় আসার পরে সুরেশ প্রভুর মধ্যেও একই নৈতিকতার ছাপ দেখা যায়। ভারতে একের পর এক রেল দুর্ঘটনায় এক সময় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন বিজেপি আমলের রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভু। তিনি ২০১৭-এর ২৩ আগস্ট রেলমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, চার দিনের ব্যবধানে দুটি ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার নৈতিক দায়-দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। এই দুটি হল কাইফিয়াত এক্সপ্রেস এবং পুরী-উৎকল এক্সপ্রেস। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে অপেক্ষা করতে বলেছিলেন, কিন্তু প্রভু পরের মাসেই পদত্যাগ করেন। এছাড়াও ছিল কানপুরের কাছে পাটনা-ইন্দোর এক্সপ্রেসের ১৪ টি বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা, যেখানে প্রায় দেড়শো জনের মৃত্যু হয়। কোথায় যেন নৈতিকতার কাঁটা বিঁধছিল সুরেশ প্রভুর মধ্যে। লাল বাহাদুর শাস্ত্রী থেকে সুরেশ প্রভু – “মরাল গ্রাউন্ডে রিজাইন” করার দৃষ্টান্ত যে নেই তা তো নয়। এই দেশের মাটিতেই, বহু সমালোচিত রাজনৈতিক নেতা নেত্রীদের মধ্যেও তো এমন নজির রয়েছে। এতসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে ঘটে যায় বালেশ্বর ট্রেন দুর্ঘটনা। অশ্বিনী বৈষ্ণব পদত্যাগ করুন, দাবি উঠেছে দিকে দিকে। পদত্যাগের দাবি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে বৈষ্ণব শনিবার সকালে সাংবাদিকদের সম্বোধন করে বলেছিলেন, তাঁর প্রাথমিক ফোকাস চলমান উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের উপর রয়েছে।

এখানেই উঠে আসছে পরিষেবার প্রশ্ন। সাম্প্রতিক অতীত ধীরে ধীরে ইতিহাসের অঙ্গ হয়ে যায়। মানুষ সাময়িকভাবে অনেককিছুই ভুলে যায়। নেতাদের বক্তব্য ঠাঁই পায় ইতিহাসের পাতায়। ইতিহাস তার বিচার করে। গত ডিসেম্বরে রেলমন্ত্রী বৈষ্ণবের রক্ষাকবচ নিয়ে পুলকিত হয়ে ভাষণের কথা দেশবাসী হয়তো ভুলে যাবে। হয়তো দেশব্যাপী একযোগে ট্রেন এবং স্টেশনগুলির আধুনিকীকরণের সময় সংঘর্ষ-বিরোধী ডিভাইসগুলি বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও, বৈষ্ণব নৈতিক দায়ের প্রশ্নে বিব্রত হবেন না। হয়তো আলাদা দায়ভার তিনি গ্রহণ করবেন না এবং রেলমন্ত্রীর পদ থেকে সরেও যাবেন না। বর্তমানে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এমনটাই মনে করছেন। তবুও ইতিহাস অজস্র সাধারণ মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা মনে রাখে। ইতিহাস তার নোটবুকে তুলে রাখে সেইসব মেহনতি মানুষের কথা, যারা প্রাণ হারিয়েছেন। মনে রাখে দুধের শিশুর ঘটনা যে অঝোরেই হারিয়ে গেল। যে স্বামী পরিবারের দেখভালের জন্য অর্থ-উপার্জনের আশায় ভিনরাজ্যে পাড়ি দিয়েছিল এবং যাদের প্রাণ পথেই ঝরে পড়ল রেল বিভাগের কিছু মানুষের গাফিলতির ফলে। পরিষেবা পাল্টায় না, পরিকাঠামো একই থেকে যায়। নৈতিক দায়িত্ব বা পদত্যাগ এবং ভারতের আবহমান কাল ধরে চলে আসা রেল বিভাগের ত্রুটি একই থেকে যায়। ইতিহাস এই সব টুকরো টুকরো ছবি ধরে রাখে কালের আখরে।।

About Post Author