সময় কলকাতা ডেস্ক, ২৯ ফেব্রুয়ারি: অবশেষে সন্দেশখালির একদা বাঘ ধরা পড়ল পুলিশের জালে। ইডি আধিকারিকরা আক্রান্ত হওয়ার ৫৪ দিন সন্দেশখালি তোলপাড় হওয়ার পর, ৫৫ দিনের মাথায় পুলিশের জালে ধরা পরল সন্দেশখালির বাঘ শাহজাহান। বৃহস্পতিবার ভোর ৩টের সময় পুলিশ গ্রেফতার করে শাহাজাহান কে। সূত্রের খবর সন্দেশখালির বেড়মজুর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাঁকে। যদিও অন্য একটি সূত্রের খবর মিনাখাঁ থেকেই গ্রেফতার হয়েছে একদা সন্দেশখালিকে জঙ্গল বানিয়ে রাজত্ব করা সন্দেশখালির বাঘকে। ভোর বেলায় তাকে নিয়ে আসা হয়েছে ন্যাজাটে। বৃহস্পতিবারই তাঁকে বসিরহাট মহকুম আদালতে পেশ করা হবে। শাহজাহানকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার জন্য আবেদন করতে পারে পুলিশ। এখনও পর্যন্ত সরকারি মতে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের মৎস্য কর্মাধ্যক্ষ শাহজাহান। রেশন দুর্নীতি মামলায় তাঁর বাড়িতে গত ৫ জানুয়ারি তদন্তে গিয়েছিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডির আধিকারিকরা। শাহজাহান অনুগামীদের হাতে আক্রান্ত হয় ইডির ৩ তদন্তকারী আধিকারি। ভাঙচুর হয়েছিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার গাড়ি। পরে সেই গ্রামেই যায় বিশাল নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনী নিয়ে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। কার্যত তখন থেকেই নিজের সাম্রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যায় সন্দেশখালির বাঘ শাহজাহান। সন্দেশখালির রাজা এলাকা ছাড়ার পর তাঁর এবং তাঁর অনুগামীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় এলাকার সাধারণ মানুষ। কার্যত তারপর থেকেই সন্দেশখালি হয়ে ওঠে রাজনীতির তীর্থক্ষেত্র। রাজ্যের বিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারী থেকে শুরু করে সিপিআইএম নেতা মীনাক্ষী মুখার্জি সহ কংগ্রেসের অধীর রঞ্জন চৌধুরী, বারবার যেতে চেষ্টা করেন সন্দেশখালি। ১৪৪ ধারার অজুহাতে বিরোধীদের সন্দেশখালি গমন রোধ করে জেলা প্রশাসন।
আরও পড়ুন ধূপগুড়িতে তৃণমূল কংগ্রেসের এসসি ওবিসি সেলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত
ঘটনাপ্রবাহ ৫৫ দিনের মধ্যে বিভিন্ন খাতে বয়েছে। শুভেন্দু অধিকারীদের সন্দেশখালি থেকে ৬২ কিলোমিটার দূরে সায়েন্স সিটির কাছে আটকে দেওয়া হয়। আরও পরে,আদালতের নির্দেশ বলে সন্দেশখালি ঢুকতে পেরেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। আইএসএফ নেতা নওশাদ সিদ্দিকীকে সন্দেশখালি অভিমুখে যাওয়ার অপরাধে গ্রেফতার করে পুলিশ। যদিও ৭ ঘন্টা পরে মুক্তি দেওয়া হয় নওশাদ সিদ্দিকীকে। ৫৪ দিন বারংবার অশান্ত হয়ে ওঠে সন্দেশখালি। কখনও বাম নেতা নিরাপদ সরদারের গ্রেফতারি নিয়ে আবার কখনও উত্তম সর্দার, শিবু হাজরাদের গ্রেফতারের দাবিতে উত্তাল হয় সন্দেশখালি। সন্দেশখালি থানায় জমা পড়তে থাকে একের পর এক অভিযোগ। পাহাড় প্রমাণ অভিযোগের চাপ আর সাধারণ মানুষের বিক্ষোভের চাপে অবশেষে গ্রেপ্তার হয় উত্তম সর্দার ,শিবু মন্ডল। সাধারণ মানুষের অভিযোগ ছিল শাহজাহান ও তাঁর অনুগামীরা এবং শাহজানের দুই ভাই দিনের পর দিন বিঘার পর বিঘা জমি ও ভেড়ি দখল করে নিয়েছে, এছাড়াও নারী নির্যাতনের অভিযোগ উঠতে থাকে। রাজ্য মহিলা কমিশন ও কেন্দ্রীয় মহিলা কমিশন এলাকায় আসে সাধারণ মহিলাদের বক্তব্য এবং অভিযোগ শোনার জন্য। তফশিলি কমিশনের চেয়ারম্যান অরুণ হালদার দাবি তোলেন রাষ্ট্রপতি শাসনের। কেন্দ্রীয় মহিলা কমিশনের চেয়ারপারসন্ রেখা শর্মাও দাবি তোলেন রাষ্ট্রপতি শাসন জারির। ফলে শুধুমাত্র রাজ্য নয় দেশের নজরও ছিল সন্দেশখালির উপর। প্রবল চাপের মুখে রাজ্য পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল রাজীব কুমার সহ একাধিক উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিক ঘাঁটি গেড়ে বসেন সন্দেশখালি। তাঁরা কথা বলেন সন্দেশখালি সাধারণ মানুষের সঙ্গে, শোনেন অভাব -অভিযোগ পাশাপাশি আশ্বাস দেন উপযুক্ত পদক্ষেপের। ৪৯ তিন পার হয়ে যাওয়ার পরেও শাহজাহান অধরা থাকায় প্রশ্ন উঠতে শুরু করে পুলিশ ও রাজ্য সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রশ্ন উঠতে থাকে কেন শাহজাহান গ্রেফতার হচ্ছে না? এমতাবস্থায় তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, শাহজাহানকে রক্ষা করছে বিচারব্যবস্থা। আদালত অভিষেকের যুক্তি মানতে চায় নি।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবির পর কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মামলার শুনানি চলাকালীন জানান শাহজাহানকে গ্রেফতার না করার জন্য আদালতের কোন নির্দেশ নেই। ইডির আবেদন অনুযায়ী রাজ্য সরকারের সিট গঠনে স্থগিতাদেশ দিয়েছিল আদালত। সেক্ষেত্রে রাজ্য পুলিশ ,ইডি এবং সিবিআই ও গ্রেফতার করতে পারে শাহজাহানকে। অতঃপর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যকে কার্যত সমর্থন করে কুণাল ঘোষ জানান, সাতদিনের মধ্যে এবার গ্রেফতার হবে শাহজাহান।অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবিকেই মান্যতা দিল রাজ্য পুলিশ। বৃহস্পতিবার ভোর ৩টের সময় শাহজাহানকে গ্রেফতার করা হয়। যদিও কোন জায়গা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে তার সঠিক তথ্য এখনো পর্যন্ত পুলিশ দেয়নি। তবে সূত্রের মতে ন্যাজাট থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে সন্দেশখালির বাঘ শাহজাহানকে। বৃহস্পতিবার আদালতে তোলা হলে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানাবে জেলা পুলিশ এমনটাই সূত্রের খবর। শাহজাহানের গ্রেফতারিতে সন্দেশখালির আগুন কতটা নিভবে সেটা সময় বলবে। তবে আসন্ন লোকসভা নির্বাচন ২০২৪ এর আগে সন্দেশখালি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিকে অনেকটাই মাইলেজ দিয়েছে বলে মত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের। আবার অন্যদিকে দেখার যে সমস্ত সাধারণ মানুষ তাদের অভিযোগ এতদিনের ভয় কাটিয়ে পুলিশ প্রশাসনের সামনে এনেছে, সেই অভাব অভিযোগের কতটা সুবিচার হয়।


More Stories
স্বাস্থ্যকর খাদ্য পরিবেশনের পাঠশালা, পড়ুয়া ব্যবসায়ীরা শিখবেন তো?
জিডিপি বিতর্কের খেই ধরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বিশ্বগুরু তকমা দিলীপ ঘোষের
‘দিল্লি কা লাড্ডু’ খেয়ে গাছের মগডালে : আহমেদ আনসারীর আশ্চর্য কাহিনী