সময় কলকাতা, পুরন্দর চক্রবর্তী, চুমকি সূত্রধর, কোয়েলি বনিক, সানী রায়, ১৩ এপ্রিলঃ কিস্যা কুর্সিকা।কুর্সির লড়াই। দুয়ারে যে লোকসভা ভোট। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক উৎসব হিসাবে যাকে দেখা হয় সেই লোকসভা ভোট চলে এসেছে । ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার চার বছর পরে ১৯৫১ সালে ভারতে প্রথমবার সাধারণ নির্বাচন ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়।লোকসভা ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রায় চারমাস ধরে চলেছিল এই ভোট দান। ১৯৫২ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম লোকসভা গঠিত হয়েছিল। এবার অষ্টাদশ লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। ৫৪৩ টি আসনে চলবে বহুদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বঙ্গে রয়েছে ৪২ টি আসন। সারা ভারতের সাত দফায় ভোট অনুষ্ঠিত হবে, বঙ্গেও সাত দফাতেই রয়েছে ভোট। প্রথম দফার ভোট ১৯ এপ্রিল। ১০২ টি লোকসভা কেন্দ্রে সেদিন ভোট রয়েছে যারমধ্যে একক রাজ্য হিসেবে সর্বাধিক কেন্দ্রে ভোট হবে তামিলনাড়ুতে। তামিলনাড়ুর ৩৯ টি কেন্দ্রে ভোট হয়ে যাবে ১৯ তারিখেই। বঙ্গে সেদিন তিনটি কেন্দ্রে ভোটদান হবে। বঙ্গের ৪২ টি লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে উত্তরবঙ্গের তিনটি লোকসভা কেন্দ্রে লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ১৯ এপ্রিল। আর এই তিনটি কেন্দ্রের অন্যতম জলপাইগুড়ি লোকসভা কেন্দ্র।কয়েকদিন আগেই কয়েক মিনিটের ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছে জলপাইগুড়ি। ঝড়ের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে নেমে অনেক বিষয় উঠে এসেছে।এবার ভোটে কোন ঝড় সেটাও দেখার।
আরও পড়ুন ভোট মিটলেই ‘নবজোয়ার ২’ কর্মসূচির ঘোষণা অভিষেকের
জলপাইগুড়ি কেন্দ্রে গত লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হয়েছিল ভারতীয় জনতা পার্টি। এবারের নির্বাচনে এই কেন্দ্রে আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বিদায়ী সাংসদ ডক্টর জয়ন্ত কুমার রায়। তার সঙ্গে সম্মুখ সমরে তৃণমূলের বাজি নির্মল চন্দ্র রায়। এই কেন্দ্রে রয়েছেন সিপিআইএম প্রার্থী দেবরাজ বর্মন। প্রার্থীরা জয়ের জন্য প্রাথমিকভাবে কি ভাবছেন প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক। গতবারের বিজয়ী প্রার্থী ডক্টর জয়ন্ত রায় জেতার বিষয়ে রীতিমত আশাবাদী। আত্মবিশ্বাস ঝরে ঝরে পড়ছে। তাঁর এই বিশ্বাস ভারত জুড়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির সরকারের উন্নয়নমুখী কার্যকলাপ। তৃণমূলের প্রার্থী নির্মল রায় ধূপগুড়ির বিধায়ক। তিনি অবশ্যই মানেন না ভারতীয় জনতা পার্টির উন্নয়নের তত্ত্ব ও তথ্য। তিনি এও বলেছেন, বিগত সাংসদের আমলে উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন হয়নি। বাম ভোট কমে এলেও বাম প্রার্থী দেবরাজ বর্মন বামপন্থী আদর্শ এবং মজদুর-খেটে খাওয়া মানুষের উন্নয়নের কথাই বলছেন। তাঁর মতে, মানুষের বেকারত্ব বেড়েছে। আর এজন্য কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়েই দায়ী।
আমরা এবার চোখ রাখব জলপাইগুড়ি কেন্দ্রের গঠনগত দিকে ও ভোটের বিগত দিনের পরিসংখ্যানে এবং দেখে নেব কোন কোন বিষয় প্রভাব ফেলতে চলেছে এবারের লোকসভা ভোটে
প্রথমে চোখ রাখা যাক জলপাইগুড়ি লোকসভা কেন্দ্রের অধীনে রয়েছে যে সাতটি বিধানসভা তারমধ্যে জলপাইগুড়ি জেলায়, একটি কোচবিহার জেলায়। বিধানসভা কেন্দ্রগুলি হল মেখলিগঞ্জ, ধুপগুড়ি , ময়নাগুড়ি, জলপাইগুড়ি, রাজগঞ্জ, মাল,দেবগ্রাম ফুলবাড়ি।এরমধ্যে৫ টি বিধানসভা ক্ষেত্রের বিধায়ক তৃণমূলের এবং ২টি বিধানসভা বিজেপির। কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বা ২০২৩ সালের ধুপগুড়ি কেন্দ্রের বিধানসভা উপনির্বাচনে তৃণমূলের পাল্লা ভারী থাকলেও ২০১৯ সালের এই কেন্দ্রে লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হন বিজেপির প্রার্থী ডক্টর জয়ন্ত কুমার রায়। তিনি তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূলের বিজয় চন্দ্র বর্মনকে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪ ভোটে হারিয়ে দেন। বিজয় চন্দ্র বর্মন ২০১৪ সালের সাংসদ ছিলেন। তার আগে ১৯৮০ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বামেদের দুর্গ ছিল জলপাইগুড়ি লোকসভা কেন্দ্রটি।এবার কি হবে? অঙ্ক দেখে মনে হতেই পারে,বিজেপির ভোট ব্যাংকে ভাটা পড়েছে। তথাপি মনে রাখা দরকার পরিসংখ্যান কোনও দিন শেষ কথা বলে নি। হালকা আভাস দেওয়া ছাড়া পরিসংখ্যান কার্যত অচল। মানুষের কথা, মানুষের সিদ্ধান্ত, ফেলেছে সুদূরপ্রসারী প্রভাব। এমন কিছু ইস্যু ভোটে কাজ করতে থাকে যা ভোটারকে প্রভাবিত করে। দেখে নেওয়া যাক জলপাইগুড়ি কেন্দ্রের নির্বাচনে প্রভাব ফেলে এমন সমীকরণ গুলিকে।
তৃণমূল এবারের ভোটে প্রার্থী করেছে ২০২৩ সালে ধুপগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে তৃণমূলের হয়ে বাজিমাত করা নির্মল রায়কে প্রার্থী করেছে শাসক দল। আর ধূপগুড়িতেই মোদির নির্বাচনেই জনসভা করার পেছনে রাজনৈতিক কারণ বহুবিধ। প্রথমত, ধূপগুড়ি বেহাত হয়েছে কয়েকমাস আগেই। ধাক্কা একটা লেগেছে গেরুয়া শিবিরে।লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী ধূপগুড়ি থেকেই জিতে এসেছেন। তাই ধূপগুড়ি থেকেই তৃণমূল প্রার্থীকে আক্রমণ একটি কারণ, অন্যদিকে ভোটের আগে ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়েছে ধূপগুড়ি সন্নিহিত এলাকা। তাই উত্তরের বিজেপি তথা মোদির নির্বাচনী প্রচার শুরু ঝড়- বিধ্বস্ত এলাকা থেকে। আর এখানেই উঠে আসছে নির্বাচনী প্রচারে কোন বিষয়গুলি জায়গা পেতে চলেছে।
একদিকে যখন কেউ কেউ বলছেন , লোকসভা ভোটে স্থানীয় ইস্যু কাজ করবে না কারণ লোকসভা নাকি দেশের রাজা নির্বাচনের মঞ্চ। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে ভোটে রাজনৈতিক দলগুলির চোখে মনে হওয়া সামান্য ইস্যুগুলি অসামান্য হয়ে ওঠার রসদ রাখে। ভোটের ঠিক আগে, মানুষের তোলা দাবি অন্তত তাই প্রমাণ করে। যোগাযোগ পরিষেবা সচল রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত ট্রেন মাধ্যমে স্থানীয় মানুষরা কতটুকু উপকৃত তাও ভোটের শর্ত হয়ে উঠেছে। তাই,বিদায়ী সাংসদ জয়ন্ত রায়ের ভোটের আগে তাঁর অবদানের কথা বলতে গিয়ে ট্রেনের কথা টেনে আনেন। আর এখানেই হিসেব কষে প্রচার করছেন বিরোধীরা। তৃণমূল প্রার্থী ও বাম প্রার্থী মাথায় রাখছেন কেন্দ্রীয় ইস্যু, তবুও তার মধ্যেই সংমিশ্রণ ঘটাচ্ছেন স্থানীয় ইস্যুর। বামেদের প্রচারে দিল্লিবাড়ির কথা উঠে আসছে।নির্মল রায় আবার সরাসরি বিজেপি নীতিকে আদর্শহীনবলছেন। বলছেন মানুষকে প্রতারণা করছে বিজেপি। তবুও বিরোধীরা কেন্দ্রীয় ক্ষেত্রে বিজেপির ব্যর্থতা গুলি তুলে ধরার পাশাপাশি স্থানীয় ইস্যুকে পাখির চোখ করেছেন ভোটের বৈতরণী পার হতে। হট ইস্যু জলপাইগুড়িতে ভোটের তিন সপ্তাহ আগে বিধ্বংসী ঝড় হয়ে গিয়েছে। পাঁচজন মানুষ মারা গিয়েছেন। নিরাশ্রয় হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ।ঝড়ের প্রভাব ভোটে কতটা পড়বে? ইতিমধ্যেই জলপাইগুড়ি উপস্থিত হয়ে ঝড় নিয়ে ঝড় তুলেছেন তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মতে, আবাস যোজনার দশটি পয়সাও জলপাইগুড়ির প্রান্তিক মানুষদের কপালে বরাদ্দ হলে, মাথার উপরে পাকা ছাদ থাকলে ঝড়ে শিশু সহ সাধারণ মানুষ হতাহত হত না। ক্ষয়ক্ষতির পরিমান পাহাড় প্রমাণ হত না। তিনি লোকসভা ভোটের আগে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় বিজেপির ঘাড়ে দায় চাপিয়েছেন। আবাস যোজনায় বঞ্চনা, জলপাইগুড়িতে ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসভা ভোটকে অভিষেক মিশিয়ে দিয়েছেন কৌশলী বচনে।
ঝড়ের পরে কি ভাবছেন সাধারণ মানুষ?
কিন্তু এসব তো বছর ভরের জনগণের প্রাপ্তি- অপ্রাপ্তির উপাদান হতে পারে না। জলপাইগুড়ি লোকসভা কেন্দ্রে বিরোধীদের হাতিয়ার সাংসদ জয়ন্ত রায় কে নাকি পাঁচ বছর ধরে দেখাই যায়নি এলাকায়। উন্নয়ন হয় নি এলাকার। যেকোনো ঘটনা – দুর্ঘটনার ফাঁকে বিরোধীরা সরব হয়েছেন তাঁর অনুপস্থিতি ঘিরে। দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে গিয়ে বিদায়ী সাংসদকে ঘেরাও হতেও দেখা গিয়েছে। অন্যদিকে, জয়ন্ত রায় এই প্রচার তাঁর সুবিধে করে দেবে বলেই মনে করছেন। কারণ হয়তো,বিরুদ্ধ প্রচারও তাঁর চোখে প্রচার।
তথাপি বিষয়ভিত্তিকভাবে কি কি ইস্যু রয়েছে জলপাইগুড়ি কেন্দ্রের?
ইস্যু চাবাগান
জলপাইগুড়ি চা বাগানের উল্লেখ করা বাহুল্য। স্বাভাবিকভাবেই, জলপাইগুড়ি লোকসভা ভোটে বন্ধ চা বাগান এবং চা বাগান কেন্দ্রিক মানুষদের অপ্রাপ্তির প্রশ্ন সামনে চলে আসে। বিরোধীরা পৌঁছে যান চা বাগানে। জয়ন্ত রায় চা বাগান বন্ধ থাকার কারণকে সরলীকরণ করেছেন। যাবতীয় দায় তিনি চাপিয়েছেন তৃণমূলের কাঁধে।
ইস্যু নদীবাঁধ
অতি সম্প্রতি জলপাইগুড়ি লোকসভা কেন্দ্রের একাধিক জায়গায় ভোট বয়কটের ডাক দিয়েছেন বাসিন্দারা। তাঁদের চাই নদী বাঁধ। গাদং বা ঝাড় আলতায় নদী বাঁধ ঘিরে মানুষ বুঝিয়ে দিয়েছেন মুখের কথায় চিড়ে আর ভিজবে না। ভোটের প্রাক্কালে নদী বাঁধ ঘিরে অদ্ভুদ চাপানউতোর দেখা গেছে ভারতীয় জনতা পার্টি এবং তাদের প্রধান বিরোধী শক্তি তৃণমূল কে ঘিরে। আশ্চর্যজনক ভাবে নদী বাঁধ চাইছেন যারা তারা কোন দলের সমর্থক সেই বিষয় দাবি যুক্তিযুক্ত কিনা তার নিরিখে ভাবা হচ্ছে। তৃণমূলের তরফে বলা হয়েছে বিদায়ী সাংসদকে হারিয়ে ভোট দিন, বাঁধ পেয়ে যাবেন। অর্থাৎ ভোটের আগে পরিযায়ী ভোট পাখিরা হাজির হলেও মানুষের সমস্যা অতল, অবসানহীন মনে হয়েছে বিভিন্ন ইস্যুতে। এরকম আবহে ১৯ তারিখের ভোট। ৭ তারিখ আসছেন প্রধানমন্ত্রী। ধূপগুড়িতে রয়েছে সভা।ঝড়ের পরে বিজেপি ঝড় কি উঠবে জলপাইগুড়িতে ? পাশাপাশি, ইতিমধ্যেই কোমর বেঁধে জলপাইগুড়ি কেন্দ্র জুড়ে প্রচারে নেমেছে বাম ও তৃণমূল।
প্রচার এখন শেষ পর্বে। আর এই প্রচারে সর্বসাধারণের ইস্যুর পাশাপাশি সব রাজনৈতিক দল মূলধন করছে স্থানীয় ইস্যুকে। লক্ষাধিক ভোটে গত লোকসভা নির্বাচনে জয়ী জয়ন্ত রায়ের সামনে প্রশ্ন উঠছে তাঁর প্রতিশ্রুতি রূপায়িত না হওয়ার বিষয়গুলি। তৃণমূলের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের। তবুও এখনও সার্বিকভাবে বামেদের পুরোনো ভোট ব্যাঙ্ক ফিরে পাওয়া কষ্টকল্পিত। লড়াই মূলত যেন তৃণমূল – বিজেপির। নির্মল রায়ের পক্ষে কিস্তিমাত করা সহজ না হলেও তিনি আশায় বুক বাঁধছেন। কারণ জয়ন্ত রায়কে অনেক অভাব অভিযোগ সত্বেও সামান্য হলেও এগিয়ে রাখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আগামী কয়েকদিনে বিভিন্ন বিষয়ের আবর্তে কার দিকে চাকা ঘোরে,কি হয় এখন দেখার। জয়ন্ত রায়ের জয়রথকে রুখে উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি কেন্দ্রে তৃণমূলকে আসন এনে দিতে পারেন কিনা নির্মল রায় তা সময়ই বলবে। জলপাইগুড়ি কেন্দ্রে ইস্যু একাধিক। এই ইস্যুগুলি লোকসভা ভোটে কতটা কাজ করছে তা দেখার। এও দেখার জলপাইগুড়ি কেন্দ্রের ভোটাররা বিজয়মাল্য কার গলায় পরান।।
#জলপাইগুড়িলোকসভাকেন্দ্র
#LokSabhaElection
#Latestbengalinews


More Stories
মমতা -অভিষেককে ৩০ হাজার করে ভোটে হারাতে না পারলে নাকখত দেবেন হুমায়ুন কবীর
ভাষা-সন্ত্রাস : মুখ্যমন্ত্রী বনাম বিজেপি
আইনশৃঙ্খলার পাঠ : বিহারের কাছে কি পশ্চিমবঙ্গকে শিখতে হবে ?