Home » Lok Sabha Election: হাওড়া কেন্দ্রে গড় রক্ষা করতে মরিয়া তৃণমূল, প্রাক্তন ফুটবলারকে আদৌ বেগ দিতে পারবেন বিজেপি বা সিপিএম প্রার্থী?

Lok Sabha Election: হাওড়া কেন্দ্রে গড় রক্ষা করতে মরিয়া তৃণমূল, প্রাক্তন ফুটবলারকে আদৌ বেগ দিতে পারবেন বিজেপি বা সিপিএম প্রার্থী?

সময় কলকাতা ডেস্ক, ১৯ মে: রাজ্যের ৪২ টি লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে অন্যতম হাওড়া। হুগলি নদীর পশ্চিমে অবস্থিত এই কেন্দ্রটি ভৌগলিক এবং আর্থ সামাজিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি রাজনৈতিক দিক থেকেও উল্লেখযোগ্য। হাওড়া জেলার সাতটি বিধানসভা কেন্দ্র নিয়ে এই লোকসভা কেন্দ্রটি গঠিত হয়েছে। ডিলিমিটেশনের আগে এই লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ছিল- হাওড়া উত্তর, হাওড়া মধ্য, হাওড়া দক্ষিণ, বালি, শিবপুর, সাঁকরাইল ও পাঁচলা কেন্দ্রগুলি। তবে ২০০৬ সালে ডিলিমিটেশনের পর এই লোকসভা কেন্দ্রে কিছুটা পরিবর্তিত হয়। পাঁচলা কেন্দ্রটির পরিবর্তে ডোমজুড় কেন্দ্রটিকে এই লোকসভার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে প্রথম লোকসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রটি দখল করে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস। এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে লোকসভায় পৌঁছন সন্তোষ কুমার দত্ত। তারপর থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত এই কেন্দ্র কখনও কংগ্রেস বা কখনও বামেদের দখলে ছিল। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর এই কেন্দ্রের দখল নেয় তৃণমূল কংগ্রেস। যদিও বছর ঘুরতে না ঘুরতে আসনটি পুনরুদ্ধার করে বামেরা। তবে ২০০৯ সালে ফের হাওড়ায় ক্ষমতা দখল করে ঘাসফুল শিবির। এই কেন্দ্রে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে জয়ী হয়েছিলেন অম্বিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি প্রয়াত হন। ২০১৩ সালে এই কেন্দ্রে উপনির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনেও নিজেদের আসন ধরে রাখতে সক্ষম হয় তৃণমূল কংগ্রেস। এই আসন থেকে জয়ী হন প্রাক্তন ফুটবলার প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর পরপর দুবার রাজ্যের শাসক দলের টিকিটে তিনিই জয়লাভ করেন।
২০১৩ সালের উপনির্বাচনে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সিপিএমের শ্রীদীপ ভট্টাচার্যকে পরাস্ত করেন প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল প্রার্থীর জয়ের ব্যবধান ছিল প্রায় ২৭ হাজার। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সিপিএমের শ্রীদীপ ভট্টাচার্যকেই প্রায় ১ লক্ষ ৯৬ হাজারের বেশি ভোটে পরাস্ত করেন জাতীয় দলের প্রাক্তন ফুটবলার। তৃতীয় স্থানে শেষ করেন বিজেপি প্রার্থী জর্জ বেকার। তবে এই কেন্দ্রে পদ্মশিবিরের ভোট বাড়ে প্রায় ২২ শতাংশ। প্রায় ১৬ শতাংশ ভোট কমে সিপিএমের। গত লোকসভা নির্বাচনেও এই আসন থেকে জিতেই সংসদে পৌঁছন প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়। জয়ী তৃণমূল প্রার্থী  পান ৪ লক্ষ ৮৮ হাজার ৪৬১ ভোট। এই কেন্দ্রে সিপিএমকে পিছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে বিজেপি। পদ্মের টিকিটে লড়াই করা  প্রার্থী রন্তিদেব সেনগুপ্ত পান ৪ লক্ষ ৭৩ হাজার ১৬ ভোট। শতাংশের হিসাবে ভোট বাড়লেও প্রসূনের জয়ের ব্যবধান কমে দাঁড়ায়  ১ লক্ষ ৩ হাজার ৬৯৫ ভোটে। গতবারও ১৬ শতাংশ ভোট বাড়ায় কেন্দ্রের শাসক দল। সিপিএমের ভোট কমে প্রায় ১৭ শতাংশ।

২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই জেলায় দলে বড়সড় ভাঙন হয় তৃণমূলের। প্রাক্তন মন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে প্রাক্তন মেয়র রথীন চক্রবর্তী-সহ একাধিক নেতা ঘাসফুল ছেড়ে পদ্মফুল শিবিরে যোগ দেন। তবে এই লোকসভা নির্বাচনের অন্তর্গত বিধানসভা আসনগুলোতে আশানুরূপ ফল করতে পারেনি বিজেপি। সাতটির মধ্যে সাতটি আসনেই নিজেদের দাপট বজায় রাখে তৃণমূল। নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে ফিরে যান অনেকে। তার মধ্যে অন্যতম রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়।

অষ্টাদশ লোকসভা নির্বাচনে এই আসনে লড়াই ত্রিমুখী। এ বারও তৃণমূল প্রার্থী করেছে বিদায়ী সাংসদ প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়কেই। বিজেপি প্রার্থী করেছে রথীন চক্রবর্তীকে। সিপিএমের টিকিটে লড়ছেন আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়। তৃণমূল প্রসূনকে আবার টিকিট দেওয়ায় দলের একটা বড় অংশ ক্ষুব্ধ। জাতীয় দলের প্রাক্তন ফুটবলারের প্রার্থীপদের বিরোধীতা করেছিলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই বাবুন বন্দ্যোপাধ্যায়।

যদিও দলীয় প্রার্থীর পক্ষ নিতে দেখা যায় তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমোকে। এমনকি ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নেই বলেও জানিয়ে দেন ক্ষুব্ধ মমতা মুখ্যমন্ত্রী দলীয় প্রার্থীর পাশে থাকার বার্তা দিলেও, এ বারে এই কেন্দ্রে গত তিনবারের সাংসদের লড়াই কঠিন হতে চলেছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। কারণ,

১) জেলায় তৃণমূল নেতৃত্ব একাধিক গোষ্ঠীতে বিভক্ত। লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালেও এই কেন্দ্রে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জেরবার ঘাসফুল শিবির

২) গত ছ’বছর ধরে হাওড়ায় পুরভোট হয়নি। ফলে স্থানীয় সমস্যার জন্য সাধারণ মানুষকে বিধায়কের উপর নির্ভরশীল হতে হয়েছে। তাই পরিষেবার ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে স্থানীয়দের। তাদের মধ্যেও একটা ক্ষোভ জমা হচ্ছে। এই বিষয়টিকে হাতিয়ার করে আসরে নেমেছে বিরোধীরা। তাদের দাবি রাজ্য সরকারের বদান্যতায় নির্বাচন করা যায়নি হাওড়ার মত গুরুত্বপূর্ণ একটি পুরসভায়। যদিও পুরসভা নির্বাচন না হওয়ার জন্য বিজেপিকে দায়ী করেছে রাজ্যের শাসক শিবির।

৩) তৃণমূল প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে নিজের এলাকায় খুব বেশি দেখা যায়নি। পাশাপাশি তিনবার সাংসদ হলেও হাওড়ার জন্য কোনও উন্নয়ন করেননি বলেও দাবি হাওড়াবাসীর একাংশের।

যদিও রাজ্যে মমতা সরকারের বিভিন্ন জনমুখী প্রকল্প, যেমন- লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, যুবশ্রী, সবুজসাথী প্রভৃতির উপর নির্ভর করে চতুর্থ বারের জন্য সংসদে পৌঁছনোর ব্যাপারে অনেকটাই আশাবাদী তৃণমূল প্রার্থী। অন্যদিকে প্রথমবারের জন্য হাওড়ায় পদ্মফুল ফোটাতে মরিয়া বিজেপি। গত দুটি লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যে অভাবনীয় উত্থান হয়েছে গেরুয়া বাহিনীর। তার মধ্যে রয়েছে হাওড়াও। এই কেন্দ্রে তাদের প্রধান শক্তি হিন্দি বলয়ের ভোট ব্যাঙ্ক। মোট ভোটারদের মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ হিন্দিভাষী। যাদের মধ্যে বেশিরভাগই উত্তর প্রদেশ, বিহার ও রাজস্থানের। সেই ভোটের একটা বড় অংশ যদি বিজেপির ঝুলিতে যায়, তা হলে এই আসনে লড়াই সহজ হবে তাদের জন্য। বিজেপি এই কেন্দ্রে প্রার্থী করেছে রথীন চক্রবর্তীকে। যিনি গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। হাওড়া পুরসভার মেয়রও ছিলেন দীর্ঘকাল। ফলে শাসক দলের রাজনৈতিক দুর্বলতা সম্পর্কে তিনি অবহিত। তার স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও মেয়র থাকাকালীন প্রশাসনিক দক্ষতাকে কাজে লাগাতে মরিয়া বিজেপি। একই সঙ্গে রামমন্দির নির্মাণ থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক কাজের খতিয়ান তুলে ধরে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী হাওড়ার বিজেপি প্রার্থী।

আরও পড়ুন: Lok Sabha Election: শ্রীরামপুর কেন্দ্রে লড়াই ত্রিমুখী, প্রাক্তন শ্বশুর জামাইয়ের লড়াইয়ে কতটা প্রাসঙ্গিক বামেরা?

এই কেন্দ্রে প্রায় ২৬ শতাংশ সংখ্যা লঘু ভোট রয়েছে। সেই ভোটব্যাঙ্কে যদি কংগ্রেস সমর্থিত জোট প্রার্থী থাবা বসাতে পারেন তা হলে এই কেন্দ্রে জয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে বিজেপির। বিগত এক দশকে এই কেন্দ্রে ভোট বাক্সে ব্যাপক রক্তক্ষরণ হয়েছে সিপিএমের। প্রায় ৩৫ শতাংশ ভোট কমেছে বাম শিবিরের। প্রায় সমহারে ভোট বেডে়ছে বিজেপির। এই লোকসভা নির্বাচনে নিজেদের হারিয়ে যাওয়া ভোট ব্যাঙ্ক পুনরুদ্ধারকে পাখির চোথ করেছে সিপিএম। এই কেন্দ্রে প্রার্থী করা হয়েছে তরুণ মুখ ও আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়কে। কংগ্রেসের সমর্থনে বামপ্রার্থী নিজেদের ভোট ব্যাঙ্ক যদি কিছুটাও পুনরুদ্ধার করতে পারে, তা হলে এই কেন্দ্রে অনেকটা সুবিধা পেয়ে যাবে তৃণমূল। যদিও বিজেপি ও তৃণমূল দুই দলকে হারানোর ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী বাম প্রার্থী সব্যসাচী।

এই লোকসভা নির্বাচনে কী ফের হাওড়াবাসীর আশীর্বাদ পাবেন প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়? টানা চতুর্থ বার জিতে সংসদ ভবনে দেখা যাবে তাকে? নাকি পরিবর্তনের পথে হাঁটবে হাওড়ার জনতা? সেক্ষেত্রে বিজেপি প্রার্থী কি কিছুটা সুবিধে পাবে? নাকি রক্তক্ষরণ বন্ধ করে এই কেন্দ্রে ঘুরে দাঁড়াবে বাম-কংগ্রেস জোট? সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে ৪ জুন।

About Post Author