পুরন্দর চক্রবর্তী, চুমকী সুত্রধর,সময় কলকাতা , ১৯ মে : 2024 Lok Sabha Elections বিপদের গন্ধ ছিল ২০১৪ সালেই । রত্না দে নাগ সেবার ১ লাখ ৮৯ হাজার ভোটে সিপিএমের প্রার্থী প্রদীপ সাহাকে হারালেও তাঁর ভোট প্রায় সাত শতাংশ কমে যায়। ভয় সিপিএমকে নিয়ে ছিল না, ভয় ছিল তৃণমূলের জনপ্রিয়তায় ফাটল নিয়ে, ভয় ছিল সিপিএমের ভোট ব্যাঙ্ক নিয়ে। সিপিএম ততদিনে হুগলিতে ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। ছ বারের বাম সাংসদ রূপচাঁদ পালের মৌরসী পাট্টায় সিপিএমের ভোট তখন কমেই চলেছে। তবুও বাম ভোট ছিল কিছুটা বেঁচে বর্তে। ২০১৯ সালে অধিকাংশ তৃণমূল কংগ্রেসের আসনের ভরাডুবির পেছনে যে বাম ভোটের পতন, তা সংখ্যাতত্ব বারবার জানান দিয়েছে বঙ্গের বিভিন্ন লোকসভা কেন্দ্রে। বামেদের যতটা ভোট কমেছে বিজেপির ততটাই ভোট বেড়েছে। ২০০৯ সালের লোকসভা ভোটে ১৯৮৪ সালের পরে রূপচাঁদ পাল প্রথমবার হেরে গেলেও তিনি সেবার বিয়াল্লিশ শতাংশের উপরে ভোট পান। প্রদীপ সাহা ২০১৯ সালে সেই ভোট কমিয়ে নিয়ে আসেন ৮ শতাংশতে। ৩৪ শতাংশ ভোট বামেদের ভোট বাক্স থেকে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। এরকম প্রেক্ষাপটে উত্থান ঘটে বিজেপির তারকা প্রার্থী লকেট চট্টোপাধ্যায়ের। বিজেপির ২৯ শতাংশের বেশি ভোট বৃদ্ধিতে হুগলি লোকসভা কেন্দ্রে তিনি রত্না দে নাগকে হারিয়ে দেন ৭৩ হাজার ভোটে। আরেক ফিল্মি তারকা রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার তৃণমূলের প্রার্থী। তিনি বলছেন হুগলি আসন পুনরুদ্ধার হবেই। লকেটকে হারিয়ে ইতিহাস রচনা কি সম্ভব?
রচনার প্রতিদ্বন্দ্বী গতবারের বিজয়ী লকেট চট্টোপাধ্যায় বলছেন, রচনা ভোটের কিছুই বোঝে না। মেক আপ দিয়ে মেক ওভার হয় না। হেরে আবার দিদি নাম্বার ওয়ান করতে চলে যাবেন রচনা। আর এই দিদি নাম্বার ওয়ান নামক টিভির অনুষ্ঠান যে রচনার জনপ্রিয়তার অন্যতম মাপকাঠি তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। নইলে কি আর বিজেপি অভিযোগ করে, দিদি নাম্বার ওয়ানে সুযোগ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ভোট আদায় করা।টাকা পয়সা নয়, অডিশনে সুযোগ! অর্থাৎ, হিন্দি বাংলা,ওড়িয়া এমনকি অমিতাভ বচ্চনের বিপরীতে নায়িকা হওয়া রচনার এখন জনপ্রিয়তার মূল চাবিকাঠি টেলিভিশন প্রোগ্রাম। মানুষের কাছে প্রবল ভাবে পৌঁছে গিয়েছেন তিনি। শুধু তা দিয়ে সিট পুনরুদ্ধারের কথা তিনি বলছেন না। বলছেন, ২০২১ এবং পঞ্চায়েত ভোটে তৃণমূলের সাফল্য দেখে।
হুগলি লোকসভার অন্তর্গত সাতটি বিধানসভা অঞ্চল চন্দননগর, চুঁচুড়া, সিঙ্গুর, সপ্তগ্রাম, বলাগড়, পাণ্ডুয়া, ধনেখালি – সর্বত্র ২০২১ সালে তৃণমূলের বিজয় রথ উড়েছে। একমাত্র বলাগড়ে মনোরঞ্জন ব্যাপারী ছাড়া সর্বত্র বড় মার্জিনেই জয় এসছে। এই লোকসভা কেন্দ্রে সিঙ্গুরের বেচারাম মান্না, সপ্তগ্রামের তপন দাশগুপ্ত থেকে শুরু করে চুঁচুড়ার অসিত মজুমদার মতন রথী মহারথীরা তাঁর পাশে আছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বরাভয় পেয়ে বলছেন, কারণ তৃণমূল সুপ্রিমো তাকে জোর করে নিয়ে এসেছেন রাজনীতির ময়দানে। আর এখানেই খোঁচা দিতে ছাড়ছেন না লকেট। তিনি রচনার সঙ্গে মিমি – নুসরাতের তুলনা টানছেন। সংসদে পারফরমেন্সের কথা বলছেন।

সংসদে পারফরমেন্সই যদি যুদ্ধ জয়ের মূল শর্ত হত তাহলে কাকলি ঘোষ দস্তিদার বা মহুয়া মৈত্রকে নিজের কেন্দ্রে কি কাজ করেছেন, তার ফিরিস্তি দিতে হত না। জনশ্রুতি, নিজের কেন্দ্র থেকে গায়েব হয়ে গিয়েছিলেন লকেট। নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তিতে ছেয়ে গিয়েছিল হুগলি লোকসভা কেন্দ্র। বিজেপি বলে, এই কাজ তৃণমূলের দুর্জনদের। কিন্তু সাধারণ মানুষ যে ভোট প্রচারের মধ্যেই লকেটকে ধরে ক্ষোভ দেখাচ্ছেন। মানুষ জীবনানন্দের বনলতা সেন হয়ে উঠে লকেটকে জিজ্ঞেস করতে ছাড়ে নি, এতদিন কোথায় ছিলেন? তবে সব অভিযোগ ঠিক নয়। লকেট মাঝেমধ্যেই এলাকায় আসছেন। পোলবার বৃদ্ধা খুনের ঘটনায় শাসক দলের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বেশ গতি এনে দেন তিনি। অতঃপর পাণ্ডুয়া। বোমায় দশ বছরের নাবালকের মৃত্যু ঘটে। লকেট যথারীতি শাসকদলকে কাঠগড়ায় দাঁড় করান। রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় এনিয়ে পাল্টা মুখ খোলেন। তাঁর সরাসরি অভিযোগ ছিল, নিজের সংসদীয় ক্ষেত্রে পাঁচ বছর সময়কাল এলাকার মানুষকে না দিতে পারার ব্যর্থতা লকেট মৃত্যু নিয়ে অহেতুক রাজনীতি করে মুছতে চাইছেন । তিনি লকেট চট্টোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে বলেছেন, কিছু ভোট পাওয়ার জন্য লকেট তাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে ছাড়ছেন না। এও এক স্ট্র্যাটেজি।
আরও পড়ুনপার্থ – অর্জুনের যুদ্ধে কোথায় কে এগিয়ে, কোথায় কে পিছিয়ে?
প্রচার, রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যেই চলে এসেছে পঞ্চম দফার ভোট মুখোমুখি দুই অভিনেত্রী প্রার্থী লকেট-রচনা। রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয়তায় লকেটের চেয়ে এগিয়ে থাকতেই পারেন রচনা কিন্তু ভোট জেতার মত জায়গায় কি তিনি আছেন? এক কথায় উত্তর, কাঁটার টক্কর। বিজেপির সংগঠন যে খুব মজবুত হুগলিতে তাও নয়। ভোটের আগে মনে করা হচ্ছিল লকেটকে এই কেন্দ্রে প্রার্থী করার নাও হতে পারে কারণ লকেট হারার মত জায়গায় আছেন নিজের কেন্দ্রের সময় না দিয়ে। ভোটের আগে লকেট প্রার্থী হচ্ছেন না এরকম ধরেই একাধিক নেতা ও অনুগামীরা যে যার মত ভাবতে শুরু করেন যে তিনিই প্রার্থী হবেন। জেলার জগন্নাথবাটি, পোলবা, চুঁচুড়া, সিঙ্গুর এলাকার বিভিন্ন দেওয়ালে তিন জনের নামে দেওয়াল লিখন চোখে পড়েছিল লকেটের নাম ঘোষিত হওয়ার আগে। বেশ কিছু দেওয়ালে দেওয়ালে হুগলি সাংগঠনিক জেলার প্রাক্তন সভাপতি সুবীর নাগের নাম লোকসভার প্রার্থী হিসাবে লেখা হয়েছিল। তাঁর অনুগামীরা বেশ নিশ্চিত ছিলেন সুবীর প্রার্থী হচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে গত লোকসভার পর থেকে লকেট চট্টোপাধ্যায়ের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। প্রচারে অবশ্য তাকে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু বিজেপির ছোট ছোট গোষ্ঠী এবং কলহ হাতাহাতি লেগেই আছে। হুগলি লোকসভা কেন্দ্রে লকেটের সামনেই প্রায় হাতাহাতি বেধে যায় বিবাদমান দুই গোষ্ঠীর। এতোসব থামিয়ে জেতা লকেটের পক্ষে কঠিন। এবং রয়েছেন মনোদীপ ঘোষ। তিনি প্রচারে সাড়া ফেলছেন। বেশ কিছু বিধানসভা ক্ষেত্রে বামেদের লুপ্ত ভোট তিনি অনেকটাই পুনরুদ্ধার করবেন বলাই যায়। তবে তিনি জেতার জায়গায় মোটেই নেই আর হুগলি লোকসভা কেন্দ্রে সঙ্গী দল কংগ্রেসের সমর্থন তাঁকে বাড়তি কোনও সহায়তা দেবেনা। হুগলিতে কংগ্রেস কার্যত অদৃশ্য। তবে ফিকে হওয়া লালের রঙ ফিরিয়ে আনতে আবেগ চোখে পড়েছে বেশ কিছু এলাকায়। আর এবার বামের ভোট বাড়লে তৃণমূলের চেয়ে বিজেপির ক্ষতি বেশি- একথা সাধারণ ভাবে বঙ্গের বেশিরভাগ কেন্দ্রে প্রচলিত থিওরি হয়ে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবে মনে হতেই পারে রচনা এগিয়ে রয়েছেন। কিন্তু তৃণমূলের বিরুদ্ধে হুগলিতেও বেশ কিছু বিষয় স্বাভাবিকভাবেই বিপক্ষে যাবে এবং লকেট বিগত দু তিন মাসে পায়ের তলায় হারিয়ে যাওয়া মাটি উদ্ধার করছেন। নরেন্দ্র মোদি সরকারের উন্নয়ন ও স্থায়িত্বের গ্যারান্টি নাকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সহ বিভিন্ন প্রকল্প কোনটা সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে তার ওপরেও ভোটের সমীকরণ বঙ্গের বাঁকিয়ে একচল্লিশটি কেন্দ্রের মত প্রভাব ফেলবে হুগলি লোকসভা কেন্দ্রেও। তবে বেশ কিছু বিষয় যা এলাকার উল্লেখযোগ্য সমস্যা সেগুলি প্রচারে উঠে আসছে না। বলাগড়ের ২০০০ সালের বন্যার পর থেকে মুমূর্ষু নৌকা শিল্প, বা ধনেখালির তাঁত শিল্পীদের কথা ভোটে চাপা পড়ে থাকছে। লকেটকে হারিয়ে ইতিহাস রচনা কি সম্ভব? কাঁটার টক্করে তুল্য মূল্য বিচারে গাণিতিক হিসাবে রচনা এগিয়ে রয়েছেন, কিন্তু লকেটও খুব পিছিয়ে নেই। যে কেউ বাজিমাত করতে পারেন অন্তত হুগলি লোকসভা কেন্দ্রের ভোটের আগের ছবি তাই বলছে।।
# লকেটকে হারিয়ে ইতিহাস রচনা কি সম্ভব?
আরও পড়ুন বনগাঁ কেন্দ্রে শান্তনুর গলার কাঁটা সুমিতা পোদ্দার, বিশ্বজিত কি বাজিমাত করবেন?


More Stories
ব্রাজিলের জনবহুল এলাকায় আচমকাই ভেঙে পড়ল যাত্রীবাহী বিমান, পাইলট-সহ বিমানের ৬২ জন যাত্রীর মৃত্যু
বারাসাতে মেট্রো রেল নিয়ে সংসদে মুখর কাকলি ঘোষ দস্তিদার ঠিক কী বললেন?
অধীর চৌধুরী নিজে ডুবলেন, ইন্ডিয়া জোটকে ডোবালেন, বাঁচালেন এনডিএ ও বঙ্গ বিজেপিকে