Home » পুরুলিয়া : মোদি ও রাম কি শান্তিরামের বিরুদ্ধে বাঁচাতে পারবে জ্যোতির্ময়কে?

পুরুলিয়া : মোদি ও রাম কি শান্তিরামের বিরুদ্ধে বাঁচাতে পারবে জ্যোতির্ময়কে?

দূর্বাদল চন্দ্র ও পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা,২৪ মে:  শহর পুরুলিয়া। প্রায় মোড়ের মাথায় রাস্তার চায়ের দোকান। সন্ধ্যে নামছে। সারাদিনের গরমের পরে একটু স্বস্তি।ভোটের দেরি নেই।এরমধ্যে দুই মধ্যবয়সী গল্পচ্ছলে রাজনৈতিক তর্ক শুরু করেছেন। কে জিতবে তা এই আলোচনার বিষয় নয়। বিষয় হল ব্যবধান কত হবে! একজন বলছেন পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লাখের মধ্যেই জয় আসবে , অন্য জন বলছেন দেড় লক্ষের নিচে কথাই হবে না। কার জেতার কথা বলছেন তাঁরা? কিছুক্ষন পরে মালুম হল, দুজনেই বন্ধু এবং তাঁরা একই রাজনৈতিক দলের সমর্থক। তাঁরা যে দলের জয়ের সম্ভাবনাকে নিশ্চিত ধরে নিয়ে তাঁদের দলীয় প্রার্থীর জয়ের ব্যবধান নিয়ে আলোচনা করছেন তা জানলে কিছুটা অবাক হতেই হয়! তাঁরা দুজনেই তৃণমূলের সমর্থক। অবাক হতেই হয়, বিশেষ করে যার বাড়ি পুরুলিয়ায় নয় এবং তবুও রাজনীতির খবরাখবর রাখে সে তো আরও অবাক হবেই। বিস্ময় এইজন্যই যে, ২০১৯ সাল থেকে পাঁচ বছরে কি এতটা হল যে ২০১৯ সালে যেখানে বিজেপির জ্যোতির্ময় সিংহ মাহাতো ২ লক্ষ চার হাজারের বেশি ভোটে জিতেছিলেন, সেখানে জয় শুধু নয়, জয়ের মার্জিন নিয়ে আগাম তর্ক! গত লোকসভা ভোটে বিপুল মার্জিনে পরাজিত তৃণমূল সমর্থকরা কোন ভরসায় এবার জয়ের মার্জিন নিয়ে কাটাছেঁড়া করছেন! তারা মনে করছেন গতবার বিজেপির জয়ী সাংসদ জ্যোতির্ময় সিংহ মাহাতো কে এবার নিশ্চিতভাবে বড় ব্যবধানে হারাতে পারেন শান্তিরাম মাহাতো। তবে দলীয় সমর্থকদের কথা বেদবাক্য হতে পারে না , তৃণমূলের সমর্থকরা তৃণমূলের জয় নিয়ে আশান্বিত হবেন এতে আশ্চর্য কি আছে! তবে পুরুলিয়ার রাজনীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল মহল বলছেন, পুরুলিয়ায় তৃণমূলের জয়ের যে প্রবল সম্ভাবনা তা নিয়ে আশ্চর্য হওয়ার কিসস্যু নেই। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল কী মনে করছে ?

রাজনৈতিক মহল মনে করছে, তৃণমূল ২০১৯ সালের হার থেকে শিক্ষা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। বিধানসভা নির্বাচনে কিছুটা ঘুরেও দাঁড়িয়ে ছিল তৃণমূল। লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত সাতটি বিধানসভা অঞ্চলের বলরামপুর, জয়পুর, কাশিপুর,পারা ও পুরুলিয়া বিধানসভা কেন্দ্রে হেরে গেলেও জোর লড়াই দিয়েছিল তৃণমূল আর মানবাজার, বাঘমুন্ডিতে তারা জিতেও যায়। তবুও বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল পুরোপুরি পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পায়নি। তবে ২০২১ সালের পর থেকে একেবারেই কোমর বেঁধে নামে তৃণমূল। লক্ষ্য ছিল ২০২৪ সালের ভোট। আসন্ন লোকসভা ভোটকে সামনে রাখলেও তাদের মাথায় ২০১৯ সালের পাশাপাশি ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটের চিত্রও পরিষ্কার ছিল। কি ছিল সেই অঙ্ক? কী স্ট্র্যাটেজি নিয়েছে তৃণমূল এবারের ভোটে? অঙ্ক বলছে, ২০১৪ সালে ৪ লক্ষ ৬৮ হাজার ভোট পেয়েছিল তৃণমূল। যা ভোটদান হয়েছিল সেবার, তার ৩৮ শতাংশই দখল করে তৃণমূল। তাদের প্রার্থী মৃগাঙ্ক মাহাতোর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন পূর্বতন সাংসদ ফরওয়ার্ড ব্লকের নরহরি মাহাতো। পুরুলিয়া ফরওয়ার্ড ব্লকের মৌরসি পাট্টা ছিল দীর্ঘদিন ধরেই। অথচ বামেদের সেবার ভোট কমে ১৮ শতাংশ। কিন্তু ২০১৯ সালে আরও করুণ পরিণতি হয় বামেদের। এবার আরও ২১ শতাংশের চেয়েও বেশি ভোট কমে তাদের ভোট নেমে আসে পাঁচ শতাংশে। একদা ফরওয়ার্ড ব্লকের গড়ে এরকম দুর্দিন যে বামেদের দেখতে হবে তা কেউ ভাবেন নি। বাম কংগ্রেস জোটের হয়ে এবারের কংগ্রেস প্রার্থী নেপাল দেব মাহাতো। তিনি এতটাই সম্মানিত পুরুলিয়ায় যে পুরুলিয়ার মানুষ যে রাজনৈতিক মতাদর্শের হোক না কেন তাঁরা নেপাল দেব মাহাতোর বিরুদ্ধে কোনও কুমন্তব্য করে না, শোনেও না। পুরুলিয়ার অধিকাংশ মানুষ একবাক্যে স্বীকার করেন, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর অনেক অবদান রয়েছে। ২০১৯ সালেও তিনি ভোটের ময়দানে ছিলেন কংগ্রেসের হয়ে। তবে কংগ্রেসের হয়ে তিনি ভোট পেয়েছিলেন মাত্র ছয় শতাংশ। ঝুলিতে এসেছিল ৮৪ হাজার ভোট। অর্থাৎ ২০১৯ সালে বাম কংগ্রেস মিলে ১১ শতাংশ ভোট পেয়েছিল ।এবার এই ভোট বাড়াতে বাম -কংগ্রেস জোর কদমে চেষ্টা করে চলেছে । বাম কংগ্রেসের ভোট ২০১৯ সালে প্রবল বিজেপি হাওয়ায় প্রায় ৩৭ শতাংশ কমে গিয়েছিল। বিজেপির ভোট বেড়ে যায় ৪২ শতাংশ। এই ভোটের যতটা সম্ভব পুনরুদ্ধার বাম -কংগ্রেসের লক্ষ্য।

আর এখানেই রয়েছে তৃণমূলের ট্যাকটিকাল লড়াই। তারা আগবাড়িয়ে মোটেই অগ্রসর হচ্ছে না বাম কংগ্রেসের ভোটে থাবা বসাতে। তারা ধরে নিয়েছে, তাদের মূল লড়াই বিজেপির বিরুদ্ধে। ২০১৯ সালে বিশেষ ভোট কমেনি তৃণমূলের। তবুও বিরাট ব্যবধানে তাদের হারতে হয় এর একমাত্র কারণ অন্য দলগুলির ভোট বিভাজন ও বাম ভোট রামে যাওয়া। বাম কংগ্রেসের কিছুটা উত্থানই দেখতে চাইছে তৃণমূল। তাহলে অনেকটাই লাভ। তৃণমূলের এবারের লক্ষ্য নিজেদের ভোটবাক্স অটুট রেখে বিজেপির ভোট- বিভাজনের সুবিধা নেওয়া।

কংগ্রেস ও বামেরা হয়তো তাদের সুবিধা করে দেবে,তবুও আচমকা প্রবল শক্তিবৃদ্ধি পাওয়া বিজেপির ক্ষয় হবে শুধু সেই মন্ত্রেই তা ধরে নেয় নি তৃণমূল। বিজেপির পতনের জন্য তৃণমূলের চোখ কুড়মি ভোটের দিকেও । তথ্যগতভাবে, পুরুলিয়ায় মোট ভোটারের ৩৫ শতাংশ কুড়মি ভোটার। তাদের প্রতিনিধি হয়ে অজিত প্রসাদ মাহাতো এবার ভোটের প্রার্থী। তৃণমূল একথা কখনই বলছে না, সিংহভাগ কুড়মি ভোট তাদের দিকে আসবে। তবে তৃণমূল প্রার্থী শান্তিরাম মাহাতো বলছেন, কুড়মিদের মধ্যেও অনেক ভাগ রয়েছে, কিছু ভোট তৃণমূল নাকি পাবেই। তবে তৃণমূল মনে করছে, কুড়মি প্রার্থীর ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আখেরে তাদের সুবিধা করে দেবে। কুড়মিরা কিছুটা হলেও নিজের মানুষকে ভোট দেবে। তৃণমূল মনে করছে, বিজেপির ভোটে ভাঙ্গনের একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ করবে কুড়মি সমাজ । তৃণমূলের ধারণা নিজেদের ভোট না বাড়লেও চতুর্মুখী সাঁড়াশি আক্রমণে এমনিতেই নিস্তেজ হয়ে পড়বে বিজেপি।

আরও পড়ুন বারাসাত লোকসভা কেন্দ্রে জিতবে কে?

২০২৪ সালে পুরুলিয়ার ভোটে ইস্যু উন্নয়ন, অধিকাংশ বিধায়ক বিজেপির হওয়ায় উন্নয়ন না হওয়ায় ক্ষোভ যেন বিজেপির বিরুদ্ধেই বেশি। এর কারণ পুরুলিয়া বাসী মনে করে বিজেপির অধুনা সময়ে বঙ্গে সার্বিক ভাবে উত্থান শুরু হয়েছিল যে সব জায়গায় তারমধ্যে পুরুলিয়া অন্যতম প্রধান । অথচ বিজেপির বারবাড়ন্ত হলেও পুরুলিয়া চিরকাল বঞ্চিতই থেকে গেছে। পদ্মফুলে ভরসা করে লাভ যে পুরুলিয়ার হয় নি,তাও অনেকটাই বোঝাতে সক্ষম হয়েছে তৃণমূল। প্রাক্তন বিধায়ক শান্তিরাম মাহাতোর রাজনৈতিক জীবন কিছুদিন আগে প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়েছিল । ২০১১ এবং ২০১৬ সালে বলরামপুর থেকে জিতলেও ২০২১ সালে মাত্র ৪২৩ ভোটে হেরে যাওয়া , একদা মমতা মন্ত্রিসভার পূর্ণ মন্ত্রী শান্তিরাম মাহাতোর উপরে ভরসা রেখেছে তৃণমূল। তাঁর বিরুদ্ধে বিজেপি তাঁর মন্ত্রিত্ব কালের উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন তুললেও শান্তিরাম মাহাতো বলছেন পুরুলিয়ার যেটুকু উন্নতি হয়েছে তার “সবই তো করলেন মমতা “। এসব ছিল তৃণমূলের ভোটের প্রচার, তত্ত্ব এবং স্ট্র্যাটেজি। বিজেপি কি চুপ করে বসে আছে?

কোন অঙ্কে তৃণমূল দাবি করছে তাদের পুরুলিয়ায় জেতা সময়ের অপেক্ষা মাত্র যেখানে গতবারের দুই লক্ষাধিক ভোটে জেতা সাংসদ এবারও বিজেপি প্রার্থী। আর এখানেও একটা ফ্যাক্টর কাজ করছে। পুরুলিয়ার মানুষ অনেকেই বলছেন, এমনকি বিজেপির একটি অংশ বলছে, জ্যোতির্ময় সিংহ মাহাতোকে বিজেপি প্রার্থী করা সম্পূর্ণ ভুল সিদ্ধান্ত। কোভিড কালে দিল্লিতে বসেছিলেন, অতিমারীর সময় তাঁকে চোখে দেখা যায়নি বলে ক্ষোভ রয়েছে পুরুলিয়ার মানুষের। অবশ্য আরও অভিযোগ মানুষের তার বিরুদ্ধে। তিনি সাধারণ মানুষের কথা শোনেন না। অভিযোগএও যে সাধারণ মানুষের সঙ্গে দেখা করা তো দূরের কথা- তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাঁর নিরাপত্তা বলয় টপকে অধিকাংশ সময়ই তার সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হয় না বিজেপির রাজনৈতিক কর্মীদেরই । চৌত্রিশ বছর বয়সে সংসদ হয়েছিলেন জ্যোতির্ময়। গত পাঁচ বছরে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এমপিল্যাডের বা সাংসদ তহবিলের টাকা তিনি মানুষের জন্য আদৌ খরচ করেননি। বিরোধীদল বা সাধারণ মানুষ এমনকি নিজের দলের কর্মীরাও যেন তাকে প্রত্যাখ্যান করতে চাইছেন। জাতীয়তাবাদের টানে যে হাওয়া ২০১৯ সালে ছিল তা এবার বিজেপির পালে নেই। হিন্দুত্ব ও রাম মন্দিরের প্রভাব তবুও আছে। সিংহ মাহাতো নিজেও যেন বুঝে গিয়েছেন তাঁকে মানুষ প্রত্যাখ্যান করছে। তিনি বলছেন, পুরুলিয়ায় আমি জিতি না জিতি – জিতবেন নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু নরেন্দ্র দামোদর মোদি কি করে বাঁচাবেন জ্যোতির্ময়কে যখন শুভেন্দুর ভাষণে ইঙ্গিত পরিষ্কার হয়ে ওঠে কুড়মি সমাজ বিজেপির ভোট কাটতে পারে, যখন তৃণমূল কর্মী সমর্থকরা দলীয় আলাপচারিতায় বলে ওঠেন,৬ লক্ষ ২৪ হাজার মহিলা ভোটার পুরুলিয়া লোকসভা কেন্দ্রে লক্ষীর ভান্ডার প্রকল্পের সুবিধাভোগী।তাঁরা বলেন,তাঁদের অর্ধেকও যদি আমাদের সঙ্গে থাকেন তৃণমূলকে কে ঠেকায়! বাম কংগ্রেস কতটা বিজেপি ভোট নিজেদের দিকে আবার টেনে আনবে, লক্ষীর ভান্ডারের প্রভাব কতটা পড়বে তাও নিশ্চিত নয়, তবে তৃণমূল ধীরে ধীরে পুরুলিয়ার রাজনৈতিক ক্ষেত্র দখল করছে তা সুস্পষ্ট, গেরুয়া ঝড় নেই, বিজেপির হাওয়াই নেই। বিজেপির হাওয়া পুরুলিয়ায় যেন অদৃশ্য । পুরুলিয়া কেন্দ্রে লোকসভা ভোটে বেশ কয়েক কদম এগিয়ে তৃণমূল, নরেন্দ্র মোদির নাম জপছে বিজেপি, বাঁচালে তিনি যদি বাঁচান!

About Post Author