Home » রায়গঞ্জ বিধানসভা উপনির্বাচন : শেষ হাসি হাসবেন কে?

রায়গঞ্জ বিধানসভা উপনির্বাচন : শেষ হাসি হাসবেন কে?

উত্তম পাল, চুমকী সুত্রধর, পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা :২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটের দুবছর আগেই আরেকবার বিধানসভা ভোট হচ্ছে রায়গঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে।১৯৫১ সাল থেকে বিধানসভা নির্বাচন হয়ে আসছে রায়গঞ্জ কেন্দ্রে। ১৯৫১ এবং ১৯৫৭ সালে রায়গঞ্জে যৌথ আসন ছিল। দুবারই কংগ্রেস থেকে দুজন করে এই কেন্দ্রে জয়ী হয়েছিলেন। সেই শুরু রায়গঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে কংগ্রেসের রমরমার। মাঝেমধ্যে কচ্চিত কদাচিত বামপ্রার্থী জয়ী হয়েছিলেন। তবুও রায়গঞ্জ বিধানসভা আসনটিতে কংগ্রেসের জোর বরাবরই থেকেছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন কংগ্রেসের ভরাডুবি ঘটে। ওই একবারই জয়ী নিকটতম তৃণমূল প্রতিদ্বন্দ্বীকে হয়েছেন বিজেপির প্রার্থী। ২০২১ সালেই কংগ্রেসের ভোট অভাবিতভাবে কমে যায়। ২০১৬ এবং ২০১১ সালে রায়গঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে বিধায়ক ছিলেন মোহিত সেনগুপ্ত। ২০২১ সালে আশ্চর্যজনকভাবে তিনি ১০. ৬৬ শতাংশ ভোট পান এবং কংগ্রেসের ভোট ২০১৬ সালের তুলনায় ৪৮ শতাংশ কমে যায়। এবারও ভোটের ময়দানে কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন মোহিত সেনগুপ্ত। কংগ্রেস কি পুরনো গৌরব ফিরে পাবে ? তার প্রতিপক্ষ বিজেপি এবং তৃণমূল। বিজেপির মানস কুমার ঘোষ একদিকে সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে কিছুটা হলেও এগিয়ে। ২০২১ সালে এই বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি যেমন জয়ী হয়েছে তেমনই ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে রায়গঞ্জ লোকসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন বিজেপির দেবশ্রী চৌধুরী। ২০২৪ সালে আবার বিজেপি বাজিমাত করেছে রায়গঞ্জ কেন্দ্রে। সারা রাজ্যে বিজেপির ফল আশানুরূপ না হলেও রায়গঞ্জ লোকসভা কেন্দ্র ধরে রেখেছে বিজেপি। এখান থেকে জয়ী হয়েছেন কার্তিক পাল। রায়গঞ্জ লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রের বিধানসভা কেন্দ্র রায়গঞ্জ। রায়গঞ্জে বিধানসভা কেন্দ্রে এবারের লোকসভা ভোটে কোন দলের কি পরিসংখ্যান তা জানার আগে একটি আশ্চর্য তথ্য তুলে ধরা যাক। বিধানসভা ভোটে রায়গঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের ইতিহাসে তৃণমূলের কোনও বিধায়ক কখনও নির্বাচিত হননি। কিন্তু এবারের তৃণমূলের প্রার্থী যিনি তিনি সদ্য লোকসভা ভোটে পরাজিত হয়েছেন। আবার তিনি ২০২১ সালে রায়গঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে তিনি তখন ছিলেন বিজেপিতে। গেরুয়া রং ছেড়ে তৃণমূলে যোগদান করলেও লোকসভায় বিজেপির হাত থেকে আসন ছিনিয়ে আনতে পারেন নি তিনি।ফলে পুনর্মূষিক ভব। আবার বিধায়ক হওয়ার লড়াই তাঁর। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রায়গঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে ইতিহাস কি তিনি গড়তে পারবেন, বিশেষ করে যে কেন্দ্রে তৃণমূল আজ পর্যন্ত কখনও জেতে নি? তাঁর সম্পর্কে, তৃণমূল সহ অন্য দলগুলির সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা সহ জানা যাক ভোটের পূর্ব মুহূর্তে প্রত্যেকের অবস্থান। কি বলছে রায়গঞ্জ কেন্দ্রের সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট ও চিত্র ?

২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে রায়গঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিজেপি প্রার্থী কৃষ্ণ কল্যাণী জয়ী হলেও দুবছর বাদেই কৃষ্ণ কল্যাণী বিজেপি ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। ২০২৪ লোকসভা বির্বাচনে কৃষ্ণবাবুকে তৃণমূল কংগ্রেস থেকে প্রার্থী করায় বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দিতে হয়েছিল। কৃষ্ণ কল্যাণী বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ায় রায়গঞ্জের মানুষকে অকাল ভোটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

আসন্ন রায়গঞ্জ বিধানসভা উপনির্বাচনে ত্রিমুখী লড়াইয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী কৃষ্ণ কল্যাণীর অস্বস্তি এবং চাপ দুই-ই প্রবল ।তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী এবং প্রতিপক্ষ দ্বয় রীতিমতো হেভিওয়েট। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন মানস ঘোষ। বিজেপি মানসবাবুকেই প্রার্থী করেছে। বাম -কংগ্রেস জোট প্রার্থী হয়েছেন রায়গঞ্জের প্রাক্তন বিধায়ক মোহিত সেনগুপ্ত।কৃষ্ণ কল্যাণীর সুবিধা বা অ্যাডভান্টেজ একেবারেই যে নেই তাও নয়। সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের ঝড় উঠেছে। সার্বিকভাবে অন্য দলগুলি কিছুটা হলেও কোণঠাসরা।বিধানসভা উপনির্বাচন শাসক দল অর্থাৎ তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে কিছুটা হলেও এডভান্টেজ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু বাদ সাধছে ইতিহাস ও অঙ্ক। তৃণমূল যেরকম রায়গঞ্জ থেকে আগে জয়ী হয়নি তেমনই গত লোকসভা নির্বাচনে রায়গঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিজেপি অনেকটাই লিড পেয়েছিল। বিজেপি প্রার্থী কার্তিক চন্দ্র পালের চাইতে প্রায় ৪৭ হাজার কম ভোট পেয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী কৃষ্ণ কল্যাণী ।

আর এরকম প্রেক্ষাপট থেকে রায়গঞ্জ বিধানসভা উপনির্বাচনে বিজেপির পক্ষে লড়ছেন প্রাক্তন তৃণমূলী মানস কুমার ঘোষ। সাম্প্রতিক লোকসভা ভোটের নিরিখে বলতেই হয় বিজেপির পাল্লাভারী । লোকসভা ভোটের পরবর্তী সময় তৃণমূলের রাজ্যজুড়ে সাফল্যের প্রভাব রায়গঞ্জ কেন্দ্রে এসে পড়ে কিনা সেটাও দেখার।

তৃণমূল বা বিজেপির পক্ষে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারেন রায়গঞ্জের প্রাক্তন বিধায়ক মোহিত সেনগুপ্ত। তিনি প্রার্থী হওয়ায় তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি প্রার্থীর চাপ বেশ খানিকটা বেড়েছে। কারন মোহিতবাবুকে রায়গঞ্জের মানুষ শহরের রূপকার হিসেবে চিহ্নিত করেন। মোহিতবাবুর স্বচ্ছ ভাবমূর্তি, দলবদলুদের খাতায় নাম না লেখানো ব্যাক্তিকে রায়গঞ্জ শহরের একাংশ মানুষ পছন্দ করেন। ফলে বাম সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী উড়িয়ে দেওয়া যায় না মোহিত সেনগুপ্তের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আর কিছু না হোক মোহিত সেনগুপ্ত রায়গঞ্জ বিধানসভা উপনির্বাচনের ফ্যাক্টর হতে চলেছেন তা নিয়েও সন্দেহ নেই। তবে তিনি ভোট টানলে লাভ কার? ক্ষতি বা কার? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন,মোহিত সেনগুপ্ত যত ভোট টানবেন তত ক্ষতি হবে বিজেপির। ঠিক যেভাবে ভিক্টর থাকায় লোকসভা নির্বাচনে লাভ হয়েছিল কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপির, এবার রাজ্যের নির্বাচনে লাভ হবে রাজ্যের শাসক দলের। এই সমীকরণে কৃষ্ণ কল্যাণীর আবার বাজিমাত করার সম্ভাবনা রায়গঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে।

বিধানসভা উপনির্বাচনের হাতে আর সময় নেই। ইতিমধ্যেই তিন প্রধান প্রতিদ্বন্দী দলের প্রচার পর্ব শেষ । এখন বিজেপি, তৃণমূল কংগ্রেস এবং বাম-কংগ্রেস জোট প্রার্থীর কাছে রায়গঞ্জ বিজয় করার লড়াই যে লড়াই প্রায় সমানে সমানে ।এক কথায় কাঁটার টক্কর। তাই শেষ হাসি কে হাসবে তা জানতে ১৩ জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হচ্ছে।।

আরও পড়ুন বাগদায় রেকর্ড গড়তে পারবেন মধুপর্ণা ?

About Post Author