Home » কারখানার মালিকদের হুমকি আর কারখানার শব্দ দূষণে দিশেহারা ১৪ টি পরিবার, সব জেনেও নিরব প্রশাসন, কেন?

কারখানার মালিকদের হুমকি আর কারখানার শব্দ দূষণে দিশেহারা ১৪ টি পরিবার, সব জেনেও নিরব প্রশাসন, কেন?

সময় কলকাতা ডেস্ক:- দীপাবলি অর্থাৎ কালীপুজো আসলে চারিদিকে বাজি ফাটে, সেই বাজির শব্দে বহু মানুষ বিরক্ত হয়ে প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযোগ পেয়ে প্রশাসন পদক্ষেপ নেয়, বা ধরুন বাড়ির পাশে ডিজে বাজিয়ে অনুষ্ঠান চলছে, বাড়িতে অসুস্থ মানুষ ডিজের শব্দে আরও অসুস্থতা বোধ করলে প্রশাসনের দ্বারস্থ হচ্ছেন বহু পরিবার, সে ক্ষেত্রেও প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু আজ এমন একটি ঘটনার কথা বলব যে ঘটনা প্রশাসনের নজরে আসার পরেও প্রশাসন কার্যত নিরব, আর এখানেই প্রশ্ন কেন? শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে একাধিকবার বিভিন্ন ঘটনায় আদালতকে পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। কখনও স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে , আবার কখনও নির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে। অর্থাৎ আইন- আদালতও এটার মান্যতা দেয় যে শব্দ দূষণ মানব জীবনে ক্ষতিকারক বিষয়। শব্দ দূষণের কোন অভিযোগ দায়ের হলে সে ক্ষেত্রে প্রশাসন কড়া পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু অশোক নগরের একটি ঘটনায় বারবার অভিযোগ হওয়া সত্ত্বেও প্রশাসন কার্যত নির্বিকার, আর এখানেই উঠছে প্রশ্ন, কেন? প্রশ্ন উঠছে তাহলে কি এর পিছনে অন্য কোন সমীকরণ কাজ করছে?

এবার আসা যাক ঘটনায়

অশোকনগর থানা এলাকার অন্তর্গত মালিকবেড়িয়ার বাগপোলের খানপাড়ায় বিগত বছর দুয়েক ধরে গজিয়ে উঠেছে একটি কারখানা। কারখানা শুরু হয়েছিল প্রথম একটি মেশিন দিয়ে, পরে আরও দুটি মেশিন বসিয়েছে কারখানার মালিক আরাবুল খান এবং ফজলু খান। কারখানায় মূলতঃ সুতো এবং কাপড়ের কাজ হয়, যেটাকে বলা হয় কম্পিউটারাইজড সুতোর কাজ করার মেশিন। কারখানা চলছে দিবারাত্র, শিফটিং এ কাজ চলে। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে এখানে সমস্যা কোথায়? সমস্যা হল এই কারখানার আইনি বৈধতা কতটা আছে?

কারণ কারখানা গড়ে উঠেছে আশেপাশের বসতির একেবারে গা ঘেঁষে। অর্থাৎ স্থানীয় যে কটি পরিবার রয়েছে তাদের প্রত্যেকেরই প্রায় বাড়ি ঘেঁষেই তৈরি হয়েছে এই কারখানা। কারখানায় শব্দ নিরোধক কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শুধুমাত্র টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি হয়েছে কারখানা। কারখানার মেশিনের শব্দ যেকোন মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলতে পারে। আশেপাশের বাড়িতে রয়েছে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ফলে প্রতিদিন এই শব্দ যন্ত্রণায় তাদের পড়াশুনো কার্যত শিঁকেয় উঠেছে। এলাকায় বসবাসকারী বিভিন্ন পরিবারের অভিযোগ শব্দ দূষণের মাত্রা এতটাই যে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে গেলেও চিৎকার করে বলতে হয় বাড়ির মধ্যে। চলতি বছরের এক মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী শব্দ দূষণের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। একে পড়াশোনা করতে অসুবিধা, তার ওপর শব্দ দূষণের কারণে অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় মাধ্যমিক পরীক্ষা প্রায় ভন্ডুল হতে বসেছিল।

এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ

এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ বারবার বলা সত্ত্বেও, না তারা শব্দ নিরোধক কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে, না তারা এলাকার মানুষের কোন কথা শুনেছে। উপরন্তু এক মহিলাকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে কারখানার মালিক আরাবুল খান ও ফজলু খানের বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যেই এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ জানিয়েছেন অশোকনগর থানা, এলাকার পঞ্চায়েত সদস্য, রাজ্যপাল এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পাশাপাশি অভিযোগ জানিয়েছেন পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ডে। পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড থেকে ইতিমধ্যে ইন্সপেকশন করার জন্য পানপুর পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ডের অফিসে চিঠিও পাঠিয়ে দিয়েছে। যদিও এখনো পর্যন্ত ইন্সপেকশন হয়নি। মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পরেই তড়িঘড়ি অশোকনগর থানা ১০ দিনের জন্য কারখানা বন্ধ রাখার জন্য নির্দেশ দিয়েছিল।।

কিন্তু আবার যে কে সেই। শুরু হয়েছে কারখানা, শুরু হয়েছে শব্দের অত্যাচার। স্থানীয় মানুষ প্রতিবাদ করলেই মালিকপক্ষ এবং তাদের অনুগত সাঙ্গো-পাঙ্গোরা বাড়ির উপর এসে অস্ত্র নিয়ে ধমকি দিয়ে যায় বলেও বারবার অভিযোগ জানিয়েছেন এলাকার বাসিন্দারা। যেহেতু শাসকদলের ঘনিষ্ঠ মালিকপক্ষ,তাই এলাকার পঞ্চায়েত সদস্য থেকে শুরু করে এলাকার বহু বাসিন্দা ভয়ে এগিয়ে আসছেন না এই পরিবার গুলির পাশে দাঁড়ানোর জন্য। এলাকার বিধায়ক নারায়ণ গোস্বামীর দ্বারস্থ হতেও ভয় পাচ্ছেন শব্দ দূষণে অত্যাচারিত পরিবারের মানুষজন।

ভয় কাটিয়ে এগিয়ে এসেছে এলাকার বাচ্চারা

এলাকার বয়স্করা ভয় পেলেও ,ভয় কাটিয়ে এগিয়ে এসেছে এলাকার বাচ্চারা, তারা শান্তিতে পড়াশুনা করার দাবিতে বারাসাত আদালতের সামনে বিক্ষোভ দেখায়। এই শব্দ দূষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে পোস্টার লিখে আদালতের সামনে বিক্ষোভে সামিল হয়েছিল এলাকার খুদেরা। এলাকার ছাত্রদের দাবি তারা চায় পড়াশুনোর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ এই শব্দ দূষণ অবিলম্বে বন্ধ হোক। এলাকার মানুষ কার্যত বিরক্ত এবং বিধ্বস্ত এই শব্দ দূষণের কারণে, এলাকা মানুষ তিতিবিরক্ত হলেও বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই স্থানীয় প্রশাসনের, হেলদোল নেই পঞ্চায়েতের ,পঞ্চায়েত সদস্যের । কিন্তু এখানেই উঠছে বারবার প্রশ্ন কেন ? প্রশ্ন উঠছে তাহলে কি কোন অবৈধ লেনদেন আছে ,নাকি অধিকাংশ জায়গায় যা হয় অর্থাৎ অর্থের খেলা। শনিবার এলাকা মানুষের বক্তব্য শোনার জন্য প্রত্যেকের বাড়ি এসেছিল অশোকনগর থানার পুলিশ, থানায় দেখা করতে বলা হয়েছে এলাকায় বসবাসকারী বাসিন্দাদের।

এখানে উঠছে প্রশ্ন?

আদৌ কি কারখানার মালিকদের দেখা করতে বলা হয়েছে থানায়? যাদের কারণে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে এলাকার প্রায় ১৪ টি পরিবারের, তাদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নিয়েছে অশোকনগর থানার পুলিশ? এ প্রশ্ন উঠছে এলাকার শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদের মনে। এখন দেখার পুলিশ হঠাৎ এলাকার বাসিন্দাদের ডেকে এবং তাদের সঙ্গে কথা বলে কি ব্যবস্থা নেয়? পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড তারাই বা কি ব্যবস্থা নেয়? রাজ্যের সর্বাধিক প্রশাসনের তরফ থেকে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়? কারণ এই শব্দ দূষণের কারণে শুধু বিপন্ন নয় এই পরিবার গুলি, বিপন্ন এই পরিবারের ছোট ছোট শিশুদের ভবিষ্যৎ।

About Post Author