সময় কলকাতা ডেস্ক: কে ছিল বিশে ডাকাত?তখন ব্রিটিশ রাজত্ব ।চারিদিকে ব্রিটিশদের অত্যাচার। জোর করে কৃষকদের নীল চাষে যুক্ত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে ব্রিটিশরা। সে কারণে জোতদার, জমিদারদের লেঠেল বাহিনী কে নিযুক্ত করেছিল ব্রিটিশরা। অসহায় হত দরিদ্র কৃষকেরা ব্রিটিশ সেনাবাহিনী পাশাপাশি জমিদারদের বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গ্রাম ছাড়া নয়তো দিনের বেলা জঙ্গলে আর রাতের বেলায় গ্রামে আসছে। আর ঠিক সেই সময় কৃষ্ণনগর মাজদিয়ার সড়কপথে দুই ডাকাতের আবির্ভাব ঘটে। বিশ্বনাথ সর্দার আর বৈদ্যনাথ সর্দার। এরাই পরবর্তীকালে বিশে ডাকাত এবং বোদে ডাকাত নামে কুখ্যাত হয়ে ওঠে।
নদীয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছিল এই দুই ডাকাতের অবাধ বিচরণ ভূমি। চারিদিকে তখন জঙ্গল আর ফাঁকা মাঠ। কোন ব্যবসায়ী বা কোন পরিবার সেই সময় রাস্তা দিয়ে রাতের অন্ধকারে আসলেই আচমকাই হারে রে রে রে রে। মশাল জ্বালিয়ে বিশে- বোদের বাহিনী আক্রমন করত পথচারীদের । কখনো বল্লম অথবা তীর ধনুক আবার কখনো খেটো দিয়ে পায়ে আঘাত করে লুটে নিতে পথচারীদের সর্বস্ব। নবদ্বীপের গঙ্গার পাড়ে সেই সময়ে মৃতদেহ দাহ করার জন্য নিয়ে যাওয়া হতো তারাও রেহাই পেত না, বিশে ডাকাতের হাত থেকে। কিন্তু কথিত আছে এই দুই ডাকাত তাদের ডাকাতি করার অর্থ বহু গরিব মানুষদের মধ্যে বিলি করে দিত।আজও জনশ্রুতি ঘুরে বেড়ায় মাজদিয়া কৃষ্ণনগর অঞ্চলে।
কোন কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা কে সাহায্য করা অথবা অসুস্থ কোন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্প আজও জনশ্রুতি হয়ে রয়েছে। আর এই জনশ্রুতিই বিশে এবং বোদে এই দুই ডাকাতের কীর্তি হয়ে গেছে মিথ। ঐতিহাসিক এবং সাহিত্যিকদের মধ্যে অনেকেই মনে করেন বিশে ডাকাত আদতে ছিল স্বদেশী আন্দোলন কারী। বিশে ডাকাতের আবির্ভাব হয়েছিল নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী হিসেবে।
হাজার 1800 শতকের নীল বিদ্রোহের যেরূপ বাংলা তথা ভারত বর্ষ দেখেছিল সেই রূপের সাংগঠনিক রূপ দিয়েছিলেন বিশ্বনাথ সর্দার অর্থাৎ বিশে ডাকাত। সমগ্র নদিয়া হুগলিতে তৎকালীন সময়ে নীল চাষের দায়িত্ব ছিল স্যামুয়েল ফেডি নামক এক অত্যাচারী নীলকর সাহেবের। সেই অত্যাচারের জবাব দিতে প্রত্যন্ত গ্রামের হিন্দু মুসলমান কৃষকদের একত্রিত করেছিলেন এই বিশে ডাকাত। শান্তিপুর এলাকার তার চাষীদের উপর তখন নীলকর সাহেবরা চরম অত্যাচার চালাচ্ছে ,আর তারই প্রতিশোধ নিতে বিশে ডাকাত শান্তিপুর নীলকুঠি আক্রমণ করে লুঠ করেন। বিশে ডাকাতের আক্রমণে একের পর এক নীলকুঠি ধ্বংস হয়ে যায়। স্যামুয়েল ফেডির নিজস্ব নীলকুঠি, চিত্রশালী নীলকুঠি এবং নদীয়া ইন্ডিগো কন্সার্ন নীলকুঠি একই রাতে লুণ্ঠন ও ধ্বংস করে বিশে ডাকাত। বিশ্ব ডাকাতের রোষ থেকে রক্ষা পায়নি খালিবলিয়া, নিশ্চিন্তপুর, বাঁশবেড়িয়া, কৃষ্ণগঞ্জ নীলকুঠি।
User-friendly platform accessible on desktop and mobile site instant560-runsen.net
যে রাত্রে বিশ্বনাথ স্যামুয়েল ফেডির নীলকুঠি আক্রমণ করেছিল সে রাতেই স্যামুয়েল বন্দি হয়েছিল বিশ্বনাথের হাতে। গ্রামবাসীদের হাতে সেদিনই হত্যা হত স্যামুয়েল। বিশ্বনাথের দয়ায় রক্ষা পায় এবং প্রতিজ্ঞা করে নীল চাষ বন্ধ করে দেবে। কিন্তু কথায় আছে ইংরেজরা কখনও তাদের কথা রাখেনি। স্যামুয়েল তার ব্যতিক্রম ছিল না। ইংরেজদের তৎকালীন সেনাপতি ব্লাক ওয়ার জেলাশাসক ইলিয়াড এর সাহায্যে পরবর্তী সময়ে বিশ্বনাথ কে বন্দী করে স্যামুয়েল। বিশ্বনাথ ওরফে বিশে ডাকাত ধরা পড়ার পর বিচারের নামে প্রহসন করে দেওয়া হয় ফাঁসি।
ফাঁসির পর মৃতদেহ একটি লোহার খাঁচায় পুরে নদিয়ার কৃষ্ণনগরের কাছেই আসাননগর একটি গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয় চিল শকুন কে খাওয়ানোর জন্য। আজও আসাননগর এ সেই মাঠ রয়েছে, ফাঁসিতলার মাঠ বলে খ্যাত হয়ে। তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকরা চেয়েছিল কৃষক বিদ্রোহের এই নেতার এই ভয়ঙ্কর পরিণতি দেখে কৃষকরা তাদের আন্দোলন থেকে বিরত হোক। কিন্তু পরবর্তীতে সেই কৃষক আন্দোলনই ব্রিটিশদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল। বিশ্বনাথ সর্দার এর জীবনী কার বিমলেন্দু কয়েল তাকে রবিনহুডের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। আর এক ঐতিহাসিক সুপ্রকাশ রায় তিনি বলেছিলেন নীলকরদের বিরুদ্ধে যারা আন্দোলন করেছিলেন তাদের মধ্যে বিশ্বনাথ সর্দার প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ স্থানের অধিকারী। এক একজন ঐতিহাসিক বিশ্বনাথ সর্দার কে এক এক রকম ভাবে বর্ণনা করেছেন। অনেকে মনে করেন নীল বিদ্রোহের প্রথম শহীদ বিশ্বনাথ সর্দার। তবে এটা ঠিক নীল বিদ্রোহের প্রথম আগুন জ্বালিয়েছিলেন বিশ্বনাথ সর্দার ওরফে বিশে ডাকাত।


More Stories
ক্রেডিট কার্ডের জালিয়াতি, সাইবার অপরাধী চক্রর পর্দাফাঁস আমাডাঙ্গা পুলিশের
যাবজ্জীবন সাজার পরে হুমকি, প্রাণনাশের আতঙ্ক গ্রাস করেছে সন্তানহারা মাকে
মধ্যমগ্রামের কুখ্যাত ট্রলি হত্যাকাণ্ড : দোষী মা ও মেয়ের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ