Home » পুরাকালের বাদ্যযন্ত্র আজ বিস্মৃতির অতলে, কেন এমন হল?

পুরাকালের বাদ্যযন্ত্র আজ বিস্মৃতির অতলে, কেন এমন হল?

সময় কলকাতা ডেস্ক:পুরাতন কালে বহু বাদ্য যন্ত্র ব্যবহৃত হতো বিভিন্ন গানের সঙ্গে। পুরাকালের বাদ্যযন্ত্রের কিছুটা অস্তিত্ব আজও থাকলেও, অধিকাংশ বাদ্যযন্ত্র চলে গিয়েছে বিস্মৃতির অতলে। কেন এমন হলো? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এক সময় কোমর বেঁধে নেমে পড়েছিলেন নদীয়ার বিখ্যাত ঐতিহাসিক প্রয়াত মোহিত রায়। তার নিজস্ব সংগ্রহ ছিল বাঁকুড়া সহ বিভিন্ন মন্দিরের টেরাকোটার শিল্পকর্ম। শিল্পকর্মে একাধিক পুরাকালের বাদ্যযন্ত্রের নিদর্শন ছিল পরিষ্কার। এছাড়াও বিভিন্ন মঙ্গলকাব্য অন্নদামঙ্গল ,পল্লী মঙ্গল ,চন্ডী মঙ্গল ,মনসামঙ্গল, বারো কবির উপাখ্যান সহ একাধিক কাব্যে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ। সেই সকল বাদ্যযন্ত্রের বর্তমান যুগে অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।

বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ বিশেষ শ্রেণীর ধর্মবিষয়ক আখ্যান হলো মঙ্গলকাব্য। মঙ্গলকাব্যের দুটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয় পৌরাণিক ও অলৌকিক। মূলত মঙ্গল কাব্যের উপজীব্য বিষয় দেবদেবীর গুনোগান করা এরমধ্যে আদি মঙ্গলকাব্য হিসেবে পরিচিত মনসামঙ্গল। একটি সম্পূর্ণ মঙ্গলকাব্যের সাধারণত পাঁচটি অংশ থাকে। সেইসব মঙ্গলকাব্যের প্রতিটি ছত্রে রয়েছে সেই সময় সমাজের পরিস্থিতি, সমাজের লোক সংস্কৃতি, দেবদেবীর গুনগান পাশাপাশি সমাজের বর্ণ ,শ্রেণীর বিভাজন ও। মঙ্গল কাব্যের আদি কবি হলেন হরিদত্ত।একাধিক কবি সেই সময় মঙ্গল কাব্য রচনা করেছেন, কেউ  বর্ণনাও করেছেন নিজের মতো করে। আরো বহু কবির নাম পাওয়া যায় সেই সময়কার সাহিত্য এবং রচনা থেকে।

বিশিষ্ট কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বিজয় গুপ্ত, নারায়ন দেব ,বিপ্রদাস পিপলাই, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ। সমস্ত মঙ্গলকাব্য থেকে যে সমস্ত বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। তার মধ্যে সর্বপ্রথম এই উঠে আসে সিন্ধু সভ্যতার নাম। যদিও সিন্ধু সভ্যতা মঙ্গল কাব্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও একাধিক খননকার্যের সময় বেনু ,বীনা, মৃদঙ্গর উল্লেখ পাওয়া যায়। বৈদিক যুগে ও একাধিক বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ রয়েছে দুন্দুভি ,ভূমি- দুন্দুভি , বেণু ও বীণার। পুরা কাল থেকে যেসকল বাদ্যযন্ত্রর অস্তিত্ব পাওয়া যায় সেই সকল বাদ্যযন্ত্রকে মূলত চারটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়। বাদ্যযন্ত্র গঠনশৈলী এবং তাদের তৈরীর উপাদান দিয়েই এই শ্রেণীবিভাজন। তত ,শুষির, ঘন ও আনদ্ধ। তত অর্থাৎ তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্র। শুষির যে বাদ্যযন্ত্র শ্বাস দিয়ে অর্থাৎ ফু দিয়ে বাজানো হয় সেগুলি। যে কোন প্রকার ধাতু দিয়ে নির্মিত বাদ্যযন্ত্রকে বলা হত ঘন। চামড়ার আচ্ছাদন যুক্ত বাদ্যযন্ত্রকে বলা হত  আনদ্ধ। সাধারণত যে সকল বাদ্যযন্ত্র ধাতু দ্বারা নির্মিত এবং চামড়ার আচ্ছাদন যুক্ত, সেই সকল বাদ্যযন্ত্র কোন সংগীতে একক ভাবে ব্যবহৃত হয় না তাই এই বাদ্যযন্ত্র গুলোর নাম অনুগত সিদ্ধ। অপর বাদ্যযন্ত্র গুলি যা তার যুক্ত। এবং ফু দিয়ে বাজানো হয় সেই সকল বাদ্যযন্ত্র একক ভাবে ব্যবহার করা যায় সংগীতের সঙ্গে ফলে এই বাদ্যযন্ত্র গুলোর নাম স্বয়ংসিদ্ধ যার মধ্যে সেতার, সরোদ, তানপুরা।

পুরাকাল ও বর্তমান সময়ে বাদ্যযন্ত্রকে সাধারণত চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। লোক ,উপজাতীয় ,উচ্চাঙ্গ ও আধুনিক। ধর্মীয় সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হতো ঢোল, কাসর ,শঙ্খ। শুধু পূজা-পার্বণ নয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো সানাই ,মৃদঙ্গ কাড়া-নাকাড়া, শিঙ্গা ,দামামা যদিও অধিকাংশ যুদ্ধের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো।
Start investing with a low minimum deposit requirement https://calvenridgetrustai.com/
এছাড়াও বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থাৎ সার্কাস ,সাপের খেলা দেখানো ,এই সমস্ত ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো তুবড়ি, ডুগডুগি, ঘুঙ্গুর ,জুরি খঞ্জনি। বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যে এবং বিভিন্ন মন্দিরের দেওয়ালে শিল্পকর্মে যেসকল বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া গেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সপ্তস্বরা, স্বর মন্ডল, রুদ্রবীণা , মধুস্রবা, খমক ,দোতারা, পিনাক, পিনাকী, মুহুরী ,উপাঙ্গ , শঙ্খ, মন্দিরা , ঝাঝর, কাঁসর, করতাল, মন্দিরা, ঘন্টা, ডিন্ডিম,বিষান, দুন্দুভি, ঢাক, বীর ঢাক,কাড়া,নাকাড়া, জগঝম্প, ঢোল ,সারিন্দা তানপুরা, এসরাজ, একতারা, ডমরু, খঞ্জনি ,সেতার, সুরমন্ডল সুরবাহার ,বাঁশি হরতাল, করতাল, কাঠ করতাল ,তবলা বাঁয়া ,কলিজা খাউরি, ঢোলক ,শ্রী খোল, হারমোনিয়াম ,বেহালা , ব্যাঞ্জো। এদের মধ্যে খমক যন্ত্রটি আনন্দ লহরীর অপর নাম। শূন্যপুরাণ ও মঙ্গলকাব্যে একাধিকবার খমকের উল্লেখ রয়েছে। হেটো, সারি,ভাওয়াইয়া ,যাত্রা ,ঘাটু বিভিন্ন গানের সঙ্গে ব্যবহৃত হতো একাধিক বাদ্যযন্ত্র। বাঁশির মধ্যে আড়বাঁশি কদবাঁশি, টিপরাবাঁশি, হরিণ বাঁশি, মোহন বাঁশি ছিল বিখ্যাত।

পুরাকালে হিন্দু সাধু-সন্ন্যাসীরা শিঙ্গা ব্যবহার করতেন। শিঙ্গা মধ্যেও রকম ভেদ ছিল। যেমন রণ  শিঙ্গা ,রাম শিঙ্গা ইত্যাদি। বর্তমান যুগে সকলের অস্তিত্ব নেই তার কারণ একাধিক বাদ্যযন্ত্রের একটি মিলিত রূপ নতুন আধুনিক যন্ত্র তৈরি হয়েছে। সিন্থেসাইজার যার মধ্যে প্রচুর পুরাকালের বাদ্যযন্ত্রের সংমিশ্রণ রয়েছে। এক একটি কোড ধরে প্রত্যেকটি বাদ্যযন্ত্র কে আলাদা আলাদা ভাবে নির্ধারণ করা যায়। রয়েছে অক্টোপ্যাড যার মধ্যে ঢাক, ঢোল, করতাল, ঢোলক, ডমরু তবলা ,খঞ্জনি, একাধিক বাদ্যযন্ত্র পৃথকভাবে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে।

এছাড়াও হারমোনিকা সহ আরো অত্যাধুনিক বাদ্যযন্ত্র বেরিয়েছে যার মধ্যে পুরাকালের সমস্ত বাদ্যযন্ত্র সম্মিলিতভাবে রয়েছে। আগের বাদ্যযন্ত্রগুলো পৃথকভাবে ব্যবহার করলে জায়গা লাগতো প্রচুর সেই সঙ্গে, সেইসঙ্গে বাজানোর জন্য বাদ্যকারের প্রয়োজন হতো অনেক। কিন্তু এখন এক একটি যন্ত্রে,বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত রূপ হওয়ায় একজন বাদ্যকার নিজেই বাজাতে পারছেন  এতগুলো যন্ত্র। ফলে অতীতের বহু বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার কালের নিয়মে লোপ পেয়েছে।

About Post Author