Home » পুরুষশূন্য গ্রাম, গর্ভবতী হয়ে যান মহিলারা

পুরুষশূন্য গ্রাম, গর্ভবতী হয়ে যান মহিলারা

সময় কলকাতা ডেস্ক : অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে এই পৃথিবীতে এমন এক গ্রাম আছে যে গ্রামে যাঁরা থাকেন তাঁরা সবাই মহিলা। পুরুষ নেই সেই গ্রামে আর সে গ্রামে নারীরা জন্ম দেন সন্তানের। আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আলোচনা করা যাক সেই রূপকথার গ্রামের। পাশাপাশি চৰ্চা হোক বিস্ময় রমণী রেবেকা লোলোসোলির জীবনসংগ্রামের ।

নারীদের যোগ্য সমাদর ও স্বীকৃতি পাওয়ার সংগ্রামে রেবেকা লোলোসোলি একজন এমন মহিলা যার নাম বিশ্বে মহিলাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকতে বাধ্য। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাতৃতান্ত্রিক গ্রামের নাম উমোজা। কুঁড়ে ঘরের সারি এই গ্রামে। রয়েছে মহিলা ও শিশুরা।এখানে প্রবেশাধিকার নেই পুরুষদের। ধর্ষিতা হওয়া মহিলাদের এখানে সমাদরে স্থান দেওয়া হয়। তাঁরা জন্ম দেন সন্তানের। এখানে স্থান মেলে হিংসার শিকার হওয়া নারীদের। রেবেকা লোলোসোলি অত্যাচারিতা নারীদের এক আশ্চর্য রক্ষাকবচ।পুরুষ প্রবেশ নৈব নৈব চ এই গ্রামে।

কলকাতা থেকে ছয়হাজার কিলোমিটার দূরের নারীদের জন্য সংরক্ষিত একটি গ্রাম এবং গ্রামের মহিলার আলোচনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।উমোজা উয়াসো কেনিয়ার একটি গ্রাম। আজ থেকে তিন দশকের বেশি আগে প্রতিষ্ঠিত গ্রামটি কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবি থেকে দূরে সাম্বুরু কাউন্টির আর্চার্স পোস্ট শহরের কাছে অবস্থিত একটি সর্ব-মহিলা মাতৃতান্ত্রিক গ্রাম। সাম্বরু রমণী রেবেকা লোলোসোলি এই গ্রামের পত্তন করেছিলেন যা হিংসা ও অত্যাচারের শিকার গৃহহীন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আর জোরপূর্বক বিয়ে থেকে পালিয়ে আসা অল্পবয়সী মেয়েদের জন্য কার্যত অভয়াশ্রম।  জন্ম হওয়া পুত্র সন্তানদেরও প্রাপ্তবয়সে পৌছানোর আগে এই গ্রাম ছাড়তে হয় বলেই কথিত আছে।

 

রেবেকা লোলোসোলির জীবন সংঘর্ষ থেকে উত্তরণের এক আশ্চর্য কাহিনী। ১৯৬২ সালে কেনিয়ার  ওয়াম্বা গ্রামে তিনি জন্মেছিলেন এবং তিনি ছিলেন ছয় ভাই ও বোনের পরিবারের একজন । ১৯৭১ সালে তিনি ওয়াম্বা গার্লস প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হন। পরে তিনি ক্যাথলিক নার্সিং ট্রেনিং সেন্টারে যোগ দেন, কিন্তু মাইনে না দিতে পেরে ছমাসের মধ্যে পাঠ্যক্রম থেকে ছিটকে যান। সে সময় তিনি গ্রামে পণ্য বিক্রির নিজস্ব ব্যবসা তৈরি করেছিলেন এবং তখন থেকেই অন্যান্য মহিলাদের অধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।

রেবেকা লোলোসোলি যখন অষ্টাদশী তখন কেনিয়ার এক ব্যবসায়ীর সাথে জোরকরেই বিয়ে দেওয়া হয়।রেবেকা আর্চার পোস্ট সামরিক ঘাঁটিতে ব্রিটিশ সৈন্যদের দ্বারা ধর্ষণ থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছিলেন যা এই অঞ্চলে কার্যত বারবার ঘটে চলা অপরাধ। বলা হয়ে থাকে যে বিগত শতাব্দীর শেষ দশকে ব্রিটিশ সৈন্যদের দ্বারা অন্তত ১৪০০ টি ধর্ষণ সংঘটিত হয়েছিল।

প্রকৃতপক্ষে, রেবেকা লোলোসোলি স্বয়ং ছিলেন এক নবজাগরণ আর বিপ্লবের চলমান নিদর্শন ।তিনি উৎপাদিত পণ্য বিক্রির মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করেছিলেন এবং এইভাবে এই অঞ্চলের পুরুষতান্ত্রিক ঐতিহ্যের বিরোধিতা করেছিলেন। পরবর্তীসময়ে রেবেকা স্থানীয় সরকারী সভাগুলিতে ধর্ষণের সমস্যাটি উত্থাপন করতে শুরু করেন , যার ফলে তাকে সাম্বুরাস পুরুষদের দ্বারা মারাত্মকভাবে নিগৃহীত হতে হয়েছিল।তাঁর জীবন হয়ে ওঠে বিপন্ন। স্বামীর অনাগ্রহ এবং নিষ্ক্রিয়তার সামনে পড়ে রেবেকা বুঝতে পেরেছিলেন এভাবে তাঁর বাঁচা দায় । তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং ১৯৯০ সালে উমোজা গ্রাম পত্তন করেছিলেন। অন্য ১৫ জন নির্যাতিত মহিলাকে নিয়ে গড়ে ওঠা এই গ্রাম মাতৃতান্ত্রিক গ্রাম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত এই গ্রাম একটি উপজাতীয় ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল যেখানে মহিলাদের জমি বা পশুসম্পদ বা শিক্ষার সুবিধা বা অধিকার থাকতে পারে না বা ছিল না । ২০১১ সালে গ্রামটির জন্যসংখ্যা হয় ৬৩।গ্রামটি তার সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কিন্তু সর্বোপরি ভবিষ্যতের জন্য সম্ভাবনার প্রস্তাব দেয়। অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কথা মাথায় রেখে রেবেকা লোলোসোলি সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হয়ে তাদের সরাসরি প্রভাবিত করে এমন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার উল্লেখ করেন।

শুরু থেকেই, রেবেকা লোলোসোলি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মাতৃপ্রধান হিসাবে গ্রামে একটি কেন্দ্রীয় স্থান ধরে রেখেছেন। রেবেকা এবং গ্রামের মহিলা সদস্যরা প্রথমে ভুট্টা, চিনি ইত্যাদির মতো কৃষিপণ্য বিক্রি করেন। তবে কম লাভের মুখে তাঁরা মুক্তোর মত গয়না বিক্রির মতো অন্যান্য পেশায় যাচ্ছেন।মুক্তোর পেশা বেছে নিচ্ছেন যে নারীরা অন্ধকার থেকে তাঁদের আলোর বৃত্তে ফেরা জীবনও মনিমানিক্যখচিত। রেবেকা লোলোসোলি জীবনের মূল স্রোতে ফেরা নারীদেরই প্রতিনিধি।।

About Post Author