Home » চোগ্যালের দেশে : পায়ে পায়ে সিকিম

চোগ্যালের দেশে : পায়ে পায়ে সিকিম

দেবিকা চট্টোপাধ্যায় (অতিথি লেখিকা), সময় কলকাতা:

কিস্তি ১

গোড়ার কথা একটু হয়তো দীর্ঘায়িত হবে।( কেউ যদি ধান ভানতে শিবের গাজন ভাবেন তাহলে অগ্রিম দুঃখপ্রকাশ সেরেই রাখি না’হয়।) সিকিম বড্ড টানছিল। অবশেষে পর্যটকের ঝুলি নিয়ে উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস ধরে যাত্রা শুরু। আমাদের পারিবারিক যাত্রার দুটো দল মেশে রামপুরহাটে।শেয়ালদা থেকে পুত্র কন্যা ৭-৩৫ এর ট্রেন ধরে রওয়ানা হয়। ওদের বাবা ও আমি অপেক্ষা করছিলাম রামপুরহাট স্টেশনে।আমরা দুজন রামপুরহাটের প্ল্যাটফর্মে ট্রেন ঢুকতেই ওদের দেখতে পেলাম,আর তখনই আনন্দে মন নেচে উঠল,এ আনন্দ নতুনকে দেখার অচেনাকে চেনার আনন্দ।ট্রেনে ওদের সঙ্গে ছেলের দুই বন্ধুও ছিল। ওদের চার জনের জন্য ই খাবার করে নিয়ে গিয়েছিলাম। খাবার নিয়ে নলহাটি স্টেশন এলে ছেলের বন্ধুরা নিজেদের কামরায় চলে গেলে আমরা বিছানা পেতে শোওয়ার আয়োজন করলাম। এতক্ষণ আমরা নীচের বার্থে বসে জিনিস পত্র ঠিক ভাবে গুছিয়ে নিচ্ছিলাম, রামপুরহাট থেকেই এক ভদ্রলোক উঠে আমাদের সামনে বসেছিলেন।আমরা শোওয়ার জন্য বেডরোল খোলাখুলি করতেই উনি আমাকে বললেন উনি আপার বার্থে চলে যাচ্ছেন,যেটা আমাদের ছিল , এবং ওঁর নীচের সিটে যেন আমরা শুই। ভালোই হল,মেয়ে আর আমি নীচের দুটো বার্থে শুয়ে পড়লাম , ছেলে আর বাবা মিডল্ আর আপার বার্থে শুল।শুয়ে পড়ে ট্রেনের দুলুনি অনুভব করতে করতে ঘুমোনোর চেষ্টা করছিলাম।

ট্রেনের মধ্যে জিনিসপত্র সামলে ঠিক মত ঘুম হয়না।ঘুম ও জাগরণের মধ্যেই কখন যেন ভোর হয়ে গেল।এনজেপি তে সাড়ে ছটার  একটু পরেই পৌঁছে গেল ট্রেন। আমরা পৌঁছনোর আগেই উঠে ব্যাগ গুছিয়ে রেডি হয়ে বসেছিলাম।নেমে পড়লাম ব্যাগপত্র নিয়ে।ট্রেন আমাদের ছেড়ে এগিয়ে গেল। আমার মনে পড়ে গেল ২০১৭ সালে ডুয়ার্স যাওয়ার কথা।গরুমারা অভয়ারণ্য দেখতে যাবার জন্য আমাদের সেবার মাল জংশনে নামতে হয়েছিল।এনজেপি পেরিয়ে আরো ঘন্টা দেড় কি পৌনে দুই ঘণ্টার পথ পেরিয়ে নিউ মাল জংশন।সেটা অবশ্য কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস ছিল।যাবার আগে আমার ভাসুর পো বলে দিয়েছিল এনজেপি স্টেশন পেরিয়ে যাওয়ার পরেই শুরু হয় জঙ্গল।ট্রেন লাইনের দুই পাশে নজর রেখে বসে থাকলে জন্তুজানোয়ার দেখতে পাওয়া যেতেও পারে ভাগ্য ভালো থাকলে।আমার ‘উনি’ তার আগেই চাকরিসূত্রে কিছুদিন উত্তরবঙ্গে অবস্থান করেছিল।ওর কথামত সেবার জন্তুজানোয়ার দেখার আশায় এনজেপি পেরোতেই আমরা সবাই জানলা দখল করে বসেছিলাম।এনজেপি স্টেশনে প্রচুর মানুষ নেমে যাওয়ার ফলে সিটের অভাব ছিল না তখন।এই সময়েই জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটা বিরাট দাঁতাল হাতিকে দেখতে পেয়ে আমি আত্মহারা হয়ে পড়েছিলাম। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো আমরা চার জনেই আলাদা আলাদা জানলায় বসে থাকলেও একমাত্র আমিই হাতিটাকে দেখতে পেয়েছিলাম। আমি হৈচৈ করে সবাইকে ডাকলেও ওরা তিনজন দেখতেই পেলনা।এবার ঐ জঙ্গলটা দেখার সুযোগ হলো না বলে একটু আফশোষ হচ্ছিল। এবার আমাদের গন্তব্য অন্যদের চেয়ে আলাদা তাই এনজেপি স্টেশনেই নেমে পড়তে হল।

যেখানে গাড়ি থাকার কথা,যে গাড়ি আমাদের নিয়ে গাড্ডিগাঁও যাবে, এখানেই আরিটার লেক অবস্থিত।ও ফোন করার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি নিয়ে চলে এল ড্রাইভার।ব্যাগগুলো গাড়িতে তুলে আমরা গুছিয়ে বসতেই গাড়ি ছেড়ে দিল।ড্রাইভার একজন বেঁটে খাটো গাট্টাগোট্টা টুকটুকে ফর্সা মানুষ।লালচে চকচকে মসৃণ মুখ, চোখ ছোট ছোট হলেও সরু নয়, বরং গোলালো ও জ্বলজ্বলে। মুখের মধ্যে এক অদ্ভুত সরলতা মাখানো,যা দেখলে মনে বিশ্বাস জাগে,ভরসা করা যায়।চেনা রাস্তা ধরে গাড়ি এগিয়ে চলল।চেনা এই অর্থে, গতবার ডুয়ার্স থেকে ফেরার সময় আমরা এক রাত শিলিগুড়িতে এক হোটেলে কাটিয়েছিলাম। শিলিগুড়ির বাজারে একটু ঘোরাঘুরিও করেছিলাম।সেই একই রাস্তা ধরেই চলছিলাম আমরা।ডুয়ার্স থেকে আসার সময় চেল,লিস,ঘিস,মাল,নেওড়া ও এছাড়া মূর্তি এবং তিস্তা নদী দেখতে পেয়েছিলাম। কোনো কোনো নদী বালুকাময়, কোনো নদীর কুলকুল ধারা , কোনোটার বুকভরা পাথর। মূর্তি নদীর উচ্ছ্বল নৃত্যরত ধারা কোথাও কুলকুল করে, কোথাও গর্জন করে বয়ে চলার উগ্ররূপ দেখতে পেয়েছিলাম সেবার।তিস্তার ধার ঘেঁষে যে পথ চলে গেছে সেই পথ ধরে করোনেশন ব্রীজ পর্যন্ত এসে ব্রীজ পেরিয়ে বাঁদিকে গিয়ে শিলিগুড়ি আর ডানদিকে গেলে সিকিম,একথা সেবারই আমাদের ড্রাইভার শানুর মুখে শুনেছিলাম। এবার ঐ একই রাস্তা ধরে এনজেপি স্টেশন থেকে শিলিগুড়ি হয়ে ইন্দো-টিবেটান মিলিটারি একাডেমি ও ব্যারাক পেরিয়ে তিস্তাকে ডানদিকে ও বামদিকে পাহাড়কে রেখে এগিয়ে এসে করোনেশন ব্রীজ পর্যন্ত পৌঁছে ব্রীজ পার না হয়ে তাকে ডান দিকে রেখেই  সিকিমের পথ ধরলাম আমরা।আর ডুয়ার্স যেতে হলে করোনেশন ব্রীজ পেরিয়ে ডানদিকের রাস্তা ধরতে হবে তিস্তাকে ডানদিকে রেখে।এই রাস্তা থেকেই পাহাড়ের শুরু। সেবার বামদিকে পাহাড়ের উপর একটা শিব মন্দির দেখেছিলাম ।এবার ও সেই মন্দিরে ওঠার সিঁড়ি দেখতে পেলাম গাড়ির ভিতর থেকে। বাঁদিকে পাহাড়ের সৌন্দর্য ও ডানদিকে তিস্তার অতল খাদকে রেখে আমরা এগিয়ে চললাম। দুপাশের গাছপালা ঘাসপাতা ও ফুল দেখে চোখ ও মন জুড়িয়ে যাচ্ছিল। সবার মনেই এক অনির্বচনীয় আনন্দ। অজানাকে জানার ও চেনার আনন্দ। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায় “অচেনার আনন্দ”। (চলবে, পরবর্তী অংশ আগামীকাল )

About Post Author