দেবিকা চট্টোপাধ্যায় (অতিথি লেখিকা ), সময় কলকাতা:
কিস্তি ৮
ছাঙ্গু লেক নিয়ে খুব ঔৎসুক্য ও আকর্ষণ থাকলেও এখানে পৌঁছে সেই বিশেষ আনন্দ অনুভূত হলোনা যা পাহাড়ি রাস্তায়, গাড্ডিগাঁও বা পদমচেন দেখে হয়েছিল।বড়সড় একটা সুন্দর লেক এটা, কিন্তু চারিপাশের ভিড়ভাট্টা, চেঁচামেচি ও নোংরা পরিবেশে অস্বস্তি বোধ হচ্ছিল। প্রচুর মানুষ এক জায়গায় জড়ো হলে যা হয় আর কি! এখানে আসার পথে রাস্তার পাশে পাশে অনেক চমরি গাই ঘুরে বেড়াচ্ছিল দেখেছি, কোনো টা কুচকুচে কালো,কোনোটা সাদা ,কোনোটার লেজটুকুই শুধু কালো বা সাদা,ঘাড়ে ও লেজে ঘন লম্বা ঝালরের মত লোম। পাহাড়ের ঢালে সবুজ জমিতে চরে বেড়াচ্ছিল ওরা। ওদের দেখে বাখ্ এর “sheep may safely grage” এই কম্পোজিশন টা মনে পড়ছিল। কিন্তু ছাঙ্গু লেকের ধারে মুখে ঠুলি ও গলায় দড়ি বাঁধা দুঃখী দুঃখী মুখের চমরি গাইগুলোকে দেখে ভীষণ কষ্ট হলো। অনেক মানুষ এদের পিঠে চড়ে ঘুরে আনন্দ অনুভব করে।চমরি গাইগুলোর পিঠে মানুষকে চড়িয়ে ঘোরানোর মধ্যে দিয়ে রোজগার করে জীবিকা অর্জনের চেষ্টায় এভাবে কিছু মানুষ ব্যাপৃত। হয়তো তারা পশুগুলো কে যত্ন করে , কিন্তু ওদের পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছিল না যে ওরা খুব সুখে আছে। গাদাগাদি করে বৃষ্টির মধ্যে সওয়ারির খোঁজে বসে আছে নিজেদের বিষ্ঠার উপর। বুঝলাম কোনো পশুই পৃথিবীতে নিরাপদ নেই। মানুষের দ্বারা ব্যবহৃত হওয়াই ওদের ভবিতব্য।যারা ওদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে ,সেই মানুষ গুলোও বেশিরভাগই বড়ই অসহায় ,তাই তাদের কে দোষ দেওয়ারও প্রশ্ন নেই।কিন্তু পশুগুলোর কষ্ট চোখে দেখে আর চড়ার প্রবৃত্তি হলো না আমাদের।
ছাঙ্গু দেখে খুব তাড়াতাড়ি গাড়িতে চড়ে বসলাম।ফিরতি পথে ওল্ড ও নিউ বাবা মন্দির থাম্ভি ভিউ পয়েন্ট,টুকলা ভ্যালি,ইকো পার্ক ইত্যাদি দেখে একই পথে ফিরে চললাম আমরা। সারাটা পথ জুড়ে বৃষ্টি পড়ছিল। পাথরের খাঁজে বরফ ও জমে ছিল, ছেলেমেয়েরা তা ছুঁয়ে দেখতে চাইলে ছাতা নিয়ে গাড়ি থেকে নামল।আস্তে আস্তে রুখুশুখু পাথুরে পাহাড়ি পথ পরিবর্তিত হল সবুজ শ্যামলিমা ভরা প্রকৃতিতে।এবার বৃষ্টি ভেজা পথে ক্রমশ উৎরাই বেয়ে নীচে নামার পালা।সামনে ও দুই পাশে একই প্রাকৃতিক দৃশ্য আর একবার প্রাণভরে দেখে নিতে চাইছিলাম, আবার এই পথে ফিরে আসার অদম্য ইচ্ছা বুকে বয়ে নিয়ে ফিরে চললাম আজকের থাকার জায়গা আগমলোক এর দিকে।দোরজি সকাল থেকেই বড্ড তাড়াহুড়ো করছিল, কিন্তু ফেরার সময় খাবার জন্য রাস্তার পাশের এক দোকানে থামতেই হলো। সবাই মিলে মোমো আর চা খেলাম পেট ভরে। এতক্ষণে বৃষ্টি থেমে রোদেলা ভাব দেখা গেল একটু। আবার গাড়িতে উঠে স্বপ্নরাজ্যের মধ্যে দিয়ে যাত্রা শুরু হলো।

আগমলোক পৌঁছতে প্রায় বিকেল হয়ে এল।এক পাহাড় ছেড়ে অন্য পাহাড়ের পথে এই আগমলোক।হোম স্টে টা প্রচুর ফুল গাছ দিয়ে সাজানো দেখে আমি গাড়ি থেকে নেমে ই গাছপালা দেখতে শুরু করলাম।এ বাড়িটাও পাহাড়ের গায়েই তৈরি।আমরা রাস্তায় গাড়ি থেকে নেমে হোম স্টে তে ঢুকেই বসার ঘর, খাবার ঘর,আর আমাদের থাকর ঘরগুলো যেতে হলো সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে। আরো নিচে আরো একটা তলা রয়েছে। গ্রাউন্ড ফ্লোর টা রাস্তার লেভেলে হলেও নীচের তলাগুলো পাহাড়ের গায়েই তৈরি। এখানেও একই রকম বড়বড় দুটো ঘর বড়বড় জানলাসহ।যেদিকেই তাকাই ঘন সবুজে মোড়া সারি সারি পাহাড় দেখা যাচ্ছে দেখে মন খুশিতে ভরে উঠল।এ পর্যন্ত প্রত্যেকটা থাকার জায়গাই পাহাড় দেখার পক্ষে উপযুক্ত। জানলার পাশে বসেই ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেওয়া যায় পাহাড়ের দৃশ্যপটের ক্রমপরিবর্তন দেখে।এখানে ঢোকার সময়েই বলে দিয়েছিলাম আজ এখন আর ভাত না খেয়ে রুটি খাবো। আধঘন্টার মধ্যে গরম রুটি করে খেতে ডাকলো আমাদের।
(আগামী সংখ্যায় প্রকাশিতব্য )


More Stories
মরিচা ঝিল, বর্তির বিল : প্রশাসনিক উদ্যোগে পর্যটন শিল্পে আমডাঙার স্বপ্নপূরণ
মূর্তি পর্যটন কেন্দ্র পর্যটকশূন্য, মূর্তির মনখারাপ
সুনতালেখোলা : কমলালেবুর স্রোত,ঈশ্বরের পবিত্র বাসভূমি