Home » চোগ্যালের দেশে : পায়ে পায়ে সিকিম

চোগ্যালের দেশে : পায়ে পায়ে সিকিম

দেবিকা চট্টোপাধ্যায় (অতিথি লেখিকা),সময় কলকাতা :

কিস্তি ৯

আগমলোক এ আমাদের ঘরের জানালার পাশে বসে পাহাড়ের গায়ে বিকেল থেকে সন্ধ্যা হতে দেখলাম। দিনের আলো কমে আসতেই পাহাড়ের গায়ে জ্বলে উঠল অসংখ্য আলোর মালা। দেখতে দেখতেই সান্ধ্যকালীন চা দিয়ে গেল হোম স্টের মালকিন নিজেই, সঙ্গে একগাল হাসি।এই পাহাড়ি মানুষ গুলোর কথা না বললেই নয়, এরা এত সরল ও শান্ত প্রকৃতির যে সর্বত্র এক অপার শান্তি।নির্জন পাহাড়ি পথে কোথাও এ পর্যন্ত হট্টগোল দেখলাম না।এক অনাবিল শান্তি চতুর্দিকে বিরাজমান।গাড্ডিগাঁও এর হোম স্টে র মালকিন ঐ একই বাড়ির দোতলায় বাস করলেও নিজে হাতে সবটা চালাননা, কর্মচারীদের দিয়ে চালান। কিন্তু বাগানের কাজ ওঁকে নিজে হাতেই করতে দেখেছি,হোম স্টের জন্য বাজারঘাট ও করতে দেখেছি।আর পদমচেন ও আগমলোক এর মালিক ও মালকিন সম্পূর্ণ নিজের হাতেই সবটা করেন।এরা ভীষন পরিশ্রমীও। রান্না ,খেতে দেওয়া ,সমস্ত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা সবটাই করে হাসিমুখে গান গাইতে গাইতে। পদমচেনের মালিক তো সন্ধ্যে পর্যন্ত ছাদে যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করল।নীচ থেকে ঠক ঠক আওয়াজ পাচ্ছিলাম। সবাই এরা নিজের বাড়ির কাজ নিজেরাই করে নেয়।সকলেই অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং একই সঙ্গে সদাহাস্যময়। পদমচেনের হোম স্টের মালিক ও মালকিন দুজনেই সারাক্ষণ গান গাইছিল সুরেলা কণ্ঠে। আমাদের গাড়ির ড্রাইভার ও গাড়িতে গান বাজাচ্ছিল হিন্দি ও নেপালী ভাষার। প্রথম দিন ছেলেমেয়েরা পেন ড্রাইভ লাগিয়ে নিজেদর পছন্দমত জেমস্ ব্লান্ট জন ডেনভার ইত্যাদি শুনলেও পরে দুজনেই শুধু নেপালী গানই শুনতে লাগল।মেয়ে তো নেপালী গানগুলোর পাহাড়ি, লোকগানের সুর শুনে সেইসব গান গাইছিলোও।পরে ইউ টিউব থেকে খুঁজে খুঁজে সেগুলো ডাউনলোড ও করে ফেলল।বলল, পাহাড়ে এসে পাহাড়ি গানই শুনব,গাইবও।


আগমলোক এ আমাদের ঘরের পাশে বারান্দায় চেয়ারে বসে পাহাড়ের গায়ে জ্বলতে থাকা আলোর দিকে বিস্মিত চোখে তাকিয়ে বসে রইলাম অনেকক্ষন, কিন্তু প্রবল ঠান্ডা হাওয়ার জন্য ঘরে এসেই সবাই কম্বল চাপা দিয়ে বসলাম। দ্বিতীয় বার আমাদের চা এর আবদার ও হাসিমুখে মেটালো হোম স্টের মালকিন।রাত  নটার মধ্যে রাতের খাবার দিল ভাত ডাল তরকারি আর চিকেনের ঝোল। আমার কয়েক দিন আগেই গলব্লাডারে স্টোন ধরা পড়ায় খুবই সাবধানে খাচ্ছি — ডাল দিয়ে ভাত মেখে তরকারির সবজি তুলে নিয়ে খাচ্ছিলাম,মাছ মাংসও তাই।সব হোম স্টে তে পৌঁছে আগেই সবাই কে মশলাদার খাবার না দেওয়ার অনুরোধ করে রেখেছিলাম। সবাই তা শুনেওছিল।

রাতে খাওয়ার পর সবাই শুয়ে পড়লাম তাড়াতাড়ি। শোবার আগে এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটালো ওরা তিনজন। সবাই দেখি হাসি হাসি মুখে আমাকে ঘিরে বসল, আমি অবাক হয়ে ভাবছি, কি ব্যাপার রে বাবা!দেখি উনি একটা কৌটো খুলে একটা আংটি আমার দিকে এগিয়ে দিলেন,হাসি হাসি মুখে- বিবাহ বার্ষিকীর অনুষ্ঠান সাড়ম্বরে পালন হল পাহাড়ে । ছেলেমেয়েরা আমাদের উইশ করল,আদরও করল। একরাশ ভালবাসা বুকে নিয়ে আমরা ঘুমোতে গেলাম।

পরের দিন সকালে উঠে দেখি শুনি কারেন্ট নেই,তাই ব্যাটারির সাহায্যে আলো জ্বললেও গীজার চলবে না । তাই সবাই কারেন্ট আসার অপেক্ষা করছিলাম। এদিকে দোরজি আগেই এসে পড়েছিল।ওর তাড়ায় আমরা শেষে ঠান্ডা জলেই কোনো মতে হাতমুখ ধুয়ে বেরিয়ে পড়ার জন্য রেডি হলাম। জলখাবার খেয়ে এখান থেকেও চেয়ে চিন্তে কিছু গাছপালা সংগ্রহ করলাম। আমাদের গাছপালার ব্যাগটা ক্রমশ ভারী হয়ে যাচ্ছে দেখে চিন্তাও হচ্ছিল , কিভাবে বাড়ি পর্যন্ত এগুলো বাঁচিয়ে নিয়ে যাবো।দোরজি গাছ নেওয়া ও সেটা ঠিক ভাবে গুছিয়ে রাখতে খুব সাহায্য করছিল।এখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম এগারোটা নাগাদ। আবার পাহাড়ি পথে যাত্রা শুরু,প্রথম গন্তব্য লিংথাম নদীর ওপর হ্যাঙ্গিং ব্রীজ। রাস্তা থেকে পাথুরে ঢালু পথ পেরিয়ে খানিকটা হেঁটে গিয়ে হ্যাঙ্গিং ব্রীজ। ব্রীজের নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে লিংথাম নদী।উচ্ছ্বল জলধারা বড়বড় বোল্ডারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে ঝরঝর শব্দে । নদীর দুই তীর বরাবর পাথরের গায়ে রং বেরঙের বুনো জঙ্গুলে ফুল ফুটে আছে, সেদিকে তাকিয়ে সময় কিভাবে যে কেটে গেল বুঝতেই পারিনি।দোরজির ডাকে সম্বিত ফিরল আমাদের। রাস্তা পর্যন্ত ফিরতি পথের একপাশে খাড়াই পাথুরে দেওয়াল,তার ভিজে পিছল শেওলা ধরা দেওয়ালে অসংখ্য অর্কিড ঝুলে আছে। লম্বা লম্বা গাছের শেওলা ধরে কালো হয়ে যাওয়া গাছের গায়েও জড়িয়ে আছে কতোই না অর্কিডের ফুল। ভীষন ইচ্ছে থাকলেও এগুলো নেবার উপায় না থাকায় ফিরে এলাম গাড়িতে।দোরজি আবার পথ চলা শুরু করল।

( আগামী কাল পরবর্তী অংশ )

About Post Author