Home » চোগ্যালের দেশে : পায়ে পায়ে সিকিম

চোগ্যালের দেশে : পায়ে পায়ে সিকিম

দেবিকা চট্টোপাধ্যায়, (অতিথি লেখিকা ), সময় কলকাতা :

কিস্তি ১০ (সমাপ্তি পর্ব )

হ্যাঙ্গিং ব্রীজ দেখে আমরা চললাম রংপো বাজার। প্রথমেই ছেলেমেয়েদের বন্ধুবান্ধবদের জন্য কিছু স্যুভেনির কেনা হলো,আমি ঢাকনা দেওয়া চা এর কাপ কিনলাম,যে কাপগুলোতে আমাদের চা খেতে দিয়েছিল পদমচেন বা আগমলোকে।এরপর আরো কিছু প্রয়োজনীয় শীতের পোশাক কেনাকাটা করতে বেশ বেলা হয়ে গেল।দোরজি গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। গাড়িতে ফিরে আমরা সবাই কলা বিস্কুট আর আইসক্রিম খেলাম।গাড়ি এবার রং পো বাজার ছাড়িয়ে চলল মনসাং এর পথে, আমাদের পরবর্তী গন্তব্য।মনসাং পাহাড়ের উপর এক অতীব সুন্দর জায়গা বলে শুনেছি।এখান থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাওয়া যায় খুব ভালো ভাবে, আবহাওয়া ঠিক থাকলে।এই আশায় ও আনন্দে আমাদের মনসাং যাওয়া।গাড়ি আবার চড়াই রাস্তায় চলল মনসাং এর পথে। এই সময় মনসাং হোম-স্টে থেকে কেউ ফোন করে জানতে চাইল আমরা কখন পৌঁছব? এবং কখন ওদের রান্না করে রাখা ভাত খাবো? জিজ্ঞাসার মধ্যে একটা যেন রুক্ষতার ভাব ছিল,যা আমাদের অবাক করল।এখন ই না খেয়ে নিলে ঐ সব খাবার নাকি তুলে রাখা ওদের পক্ষে অসুবিধে জনক।এ শুনে আমরা যারপরনাই অবাক ও বিরক্ত হলাম। নতুন অতিথি কে এ কি সম্ভাষন?আগের প্রতিটা জায়গায় আমরা দেরি করেই পৌঁছেছি, এবং অতিরিক্ত বেলা হয়ে যাওয়ায় ভাত খাবো না বলায় ভাতের বদলে আমাদের গরম রুটি করে দিয়েছে হাসিমুখে,আর এরা কি বলছে?সব কথাই হচ্ছে বাংলায়, তার অর্থ হলো এখানের কর্মচারীরা সকলেই বাঙালী।বাঙালী হয়েও যে এভাবে বাঙালী অতিথি কে আক্রমণ করতে পারে এ দেখে আমরা হতবাক হয়ে গেলাম।এ কদিন সম্পূর্ণ পাহাড়ী মানুষদের আশ্রয়ে থেকেও এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয় নি,আর এরা এরকম করছে?সকলের মনের মধ্যে এক বিরক্তি ছড়িয়ে গেল। টাকাপয়সা আগের থেকে দেওয়া অথচ সামান্য খাবার নিয়ে এই ধরনের কথাবার্তায় আমরা ভীষন অপমানিত বোধ করছিলাম।উনি কড়া গলায় জানিয়ে দিলেন যে আমরা বেড়াতে এসেছি, নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া না হতেও পারে।তাতে আমাদের কোনো অসুবিধে নেই আর আপনাদের খাবার তুলে রাখতে অসুবিধে? অতিরিক্ত বেলা হয়ে যাওয়ার ফলে আজ আমরা আর ভাত খাবো না।ঐ ভাত রাতে খেতে পারি, ঠিক ভাবে রাখলে।আর এখন আমরা রুটি খাবো।পারলে করুন। আমাদের ট্যুর অপারেটর এর সঙ্গে কথা বললাম,সে আবার এই হোম স্টের মালিককে সব জানাল। ওদের মধ্যে কি কথা হল কে জানে? কিন্তু এই ভ্রমনের শেষ পর্যায়ে এসে এই বিরক্তিকর ঘটনায় সবার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। অনেক পথ পেরিয়ে আমরা প্রায় বিকেল বেলায় মনসাং পৌঁছলাম।দুজন কর্মচারী ছিল যারা বাঙালি, কিন্তু আমাদের বাঙালি দেখেও তারা ভাবলেশহীন।আমরাও গুরুত্ব না দিয়ে নিজেদের বুক করে রাখা ঘরে চলে গেলাম তিনতলায়। খানিকক্ষণ বাদে হাতমুখ ধুয়ে, জামাকাপড় বদলিয়ে নীচে এলে আমাদের রুটি আর দুপুরের খাবার হিসেবে তৈরি ডাল তরকারি মাছ দিল খেতে। খাওয়া হলে আমরা ঘুরে ঘুরে এই হোম স্টের লাগোয়া নার্সারির নানান অজানা গাছপালা দেখলাম।রামতুলসীর বীজ আর পিটুনিয়া র বীজ সংগ্রহ করলাম।এরপর তিনতলায় উঠে নিজেদের ঘর লাগোয়া খোলা বারান্দায় বসে চারিদিক পর্যবেক্ষণ করতে করতেই ছাদে যাবার পরিকল্পনা করে সবাই ছুটলাম ছাদে।ওখান থেকে পাহাড়ে সন্ধ্যা নামার দৃশ্য ভালো দেখতে পাবো এই আশায়। সত্যি ই তাই। কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্যাস্ত হল, চোখের সামনে তা ঘটতে দেখে ছবি তোলা হলো।আস্তে আস্তে আকাশ ভরে উঠল তারায়।আর চারপাশের পাহাড়ের গায়ে জ্বলে উঠল অসংখ্য বাতি,যা দেখতে অবিকল তারাভরা আকাশের মতোই লাগছিল। যেন আকাশ আর পাহাড় মিশে গেছে একসঙ্গে। বহুক্ষণ আমরা চারজন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলাম সেই অপূর্ব দৃশ্যের মুখোমুখি।রাত যত বাড়ল পাহাড়ের গায়ে বাতির সংখ্যা ততোই বেশি মনে হচ্ছিল। পাহাড়ের গায়ে রাস্তা,ও তাতে গাড়ির চলাচল দেখা যাচ্ছিল পরিস্কার।চা খেতে নীচে আমাদের ঘরে নেমে এলাম। ফোন করে ওরা জানাল রুম সার্ভিস নেই এখানে। তাই চা জল যা প্রয়োজন আমাদের নিজেদের ই আনতে হবে। আবার আমাদের অবাক হওয়ার পালা।

কোনো রকমে এখানে রাত কাটিয়ে কাল সকালে বেরিয়ে পড়তে পারলে এখন বাঁচি।রাতে খেয়ে শুয়ে পড়লাম সবাই।একটু পরেই শুরু হল আমার পেটে ব্যাথা।ক্রমশ বাড়তে বাড়তে তা অসহনীয় হয়ে ওঠায় ওকে ডাকতে বাধ্য হলাম।বাকি রাতটা দুর্বিষহ হয়ে উঠল।সকালে ছেলেমেয়েরা আমার ঐ অবস্থা দেখে উতলা হয়ে পড়ল। ব্যাথার ওষুধ ও গরম জলের সেঁক নিয়ে সামান্য কমলে সবাই স্নান করে রেডি হয়ে নীচে নামলাম। ওরা জলখাবার খেলেও আমি কিছু খেলাম না।দোরজি কাছের এক দোকানে মুড়ির খোঁজে গেল কিন্তু পেলনা।ও মুড়িকে বলছিল মুরাই।বেরোবার আগে হোম স্টে সংলগ্ন নার্সারি থেকে বেশ কিছু গাছ কিনে ও চেয়ে নিলাম।এরপর গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম এন জে পি র উদ্দেশ্যে। ফেরার পথে আমরা দেখলাম জলসা ভিউ পয়েন্ট। আবার এক অপূর্ব দৃশ্যের মুখোমুখি আমরা সকলে।এরপর মাল্লি বাজার হয়ে তিস্তা ভিউ পয়েন্ট দেখে সোজা স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে দোরজি ফিরে গেল।ফেরার আগে দাজু ভাইয়ার সঙ্গে ছবি তুলতে ভুললাম না আমরা।।

(সমাপ্ত)

About Post Author