Home » মোটা মানুষদের দেশে শান্তি নেই

মোটা মানুষদের দেশে শান্তি নেই

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা :

(প্রথম পর্ব) অশিয়ানিয়ার ছোট্ট দ্বীপ নাউরু। দ্বীপটায় শুধুই যেন মোটা মানুষেরই বাস । যতদূর জানা যায় প্রায় হাজার তিনেক বছর আগে দ্বীপটিতে গড়ে উঠেছিল মানবসভ্যতা। আর এই সভ্যতার প্রাথমিক বিকাশ হয়েছিল পলিনেশিয় আর মাইক্রোনেসিয়ানদের হাত ধরে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের মাইক্রোনেশিয়া অঞ্চলে এই দ্বীপে বিশ্বের সবচেয়ে স্থূলদের বাস।২১ বর্গ কিলোমিটারের দেশে জনসংখ্যা ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী প্রায় ১১,০০০।শুনলে আশ্চর্য হতে হবে এখানে মানুষদের গড় ওজন ১০০ কেজি। আর এই নাউরুর স্থূল মানুষজন বেশ কিছুদিন ধরে একদম ভালো নেই।

অতীতে একদা নাউরু পরিচিত ছিল প্লেজেন্ট আইল্যান্ড বা মনোরম দ্বীপপুঞ্জ নামেই। আজ সেই দেশের আর্থিক অবস্থা তলানিতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু’র তথ্য অনুযায়ী, নাউরুর ৯৪ শতাংশের বেশি মানুষই অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় জেরবার। এক কারাগারে যেন আটকে আছেন নাউরুর মানুষজন। অথচ এ দ্বীপে বাস্তবেই এক সময় সুখ ছিল, সমৃদ্ধি ছিল আকাশছোঁয়া । ফসফেটে নির্ভর এই দেশ ছিল বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ। মাথা পিছু আয়ের দিক থেকে বিশ্বে প্রথমসারির দেশ।সত্তরের দশকেও  বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী দেশ ছিল নাউরু। দ্রুত সময় বদলেছে।হালের সমীক্ষা বলছে নাউরু বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র পাঁচটি দরিদ্র দেশের অন্যতম।

নাউরুর স্থূল মানুষদের সমৃদ্ধির দিন অতীত, সুখও নেই।দুরারোগ্য শারীরিক অসুখ বাসা বেঁধেছে তাঁদের চল্লিশ শতাংশ মানুষের শরীরে। আর ১৫ বছর আগে আর্থিক ভাবে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া দেশটি বিদেশী অনুদানের ওপরে নির্ভরশীল।এখানে আজ নব্বই শতাংশ মানুষ কর্মহীন,বেরোজগার। কেন মুখ থুবড়ে পড়ল নাউরু?

ফসফেট ছিল নাউরুর জমির তলায় লুকিয়ে থাকা আকরিক উৎস যা তাদের একদা বিত্তশালী করেছে। উনবিংশ শতকে দীর্ঘদিন সমুদ্রে ভেসে চলা ইউরোপীয় জাহাজগুলির সঙ্গে প্রথম বাণিজ্যিক সম্পর্ক শুরু হয়। খাবারের জন্য নাউরুর অধিবাসীদের সঙ্গে জাহাজগুলি নিয়মিত বন্দুক এবং অ্যালকোহলের ব্যবসা করত। আর এখান থেকে ধ্বংসের একটি অধ্যায়ের সূচনা হয়।মদ ও অস্ত্র প্রায় এক দশক-ব্যাপী গৃহযুদ্ধে দ্বীপটিকে ধ্বংস করেছিল, যার ফলে অ্যালকোহল নিষিদ্ধ হয়েছিল এবং অনেক বন্দুক বাজেয়াপ্ত হয়েছিল।

১৮৮৬ সালে শান্তি পুনরুদ্ধার করা হয়েছিল এবং দেশটি ত্রিশ বছরের জন্য জার্মান নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল।বিংশ শতকে নাউরুতে বিশাল ফসফেট ভান্ডার র্আবিস্কার হয় যা দ্বীপের ভাগ্যকে চিরতরে পরিবর্তন করেছিল। আলিবাবার আশ্চর্য প্রদীপ হাতে পায় নাউরু। কিন্তু দেশ তখন স্বাধীন ছিল না।ফসফেটের মত অমূল্য সম্পদটি ছিল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত খনিজ, প্রাথমিকভাবে ক্ষেতে সার দেওয়ার জন্য, যা অনেক ইউরোপীয় শক্তির আগ্রহের জন্ম দেয়।জার্মানি প্যাসিফিক ফসফেট কোম্পানিকে নাউরুর ফসফেট সঞ্চয় সম্পূর্ণ ব্যবহার করতে মঞ্জুর করে,  খনির শোষণ শুরু হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতেই অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে নাউরু দ্বীপ চুক্তির অধীনে নাউরু এবং এর ফসফেটের নিয়ন্ত্রণ নেয়।বিদেশী শোষণ শীঘ্রই বড় পরিবেশগত অবনতি ঘটায় কারণ কোনও নিয়মনীতি না মেনে খনিজ সংগ্রহ করা হয়।জমির ক্ষতি নাউরুকে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে পতনের দিকে যা তখন অঙ্কুরে বিকশিত হয়ে চলছিল।

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য )

 

About Post Author