Home » তাগদা আর লেপচাজগৎ : অন্য দার্জিলিং

তাগদা আর লেপচাজগৎ : অন্য দার্জিলিং

অনামিকা সরকার ( অতিথি লেখিকা), সময় কলকাতা:

‘মেঘ পিওনের ব্যাগের এবার মন কেমনের দিস্তা ,
সেই মন কেমনের মনের টানে চলছে বয়ে তিস্তা।’
——-
কিছুদিন ধরেই ঋতুপর্ণ ঘোষের লেখার মতই সত্যি মন কেমন করছিল।কোভিড পরিস্থিতিতে ঘর বন্দী দশায় থেকে অশান্ত মন কে শান্ত করতে কয়েকদিনের জন্য পাহাড়ের শোভা আর ঠান্ডা হিমেল হাওয়ায় মেঘ পাহাড়ের লুকোচুরি দেখতে ঘুরে এলাম অন্য দার্জিলিং। কারণ দার্জিলিং এর আশেপাশে কিছু এমনই সুন্দর অফবিট জায়গা রয়েছে, যেখানে অনায়াসে রাত্রিবাস করে, সেখান থেকে দার্জিলিং, কার্শিয়াং, কালিম্পঙ ঘোরা যায়।

ক্লান্তিকর একঘেঁয়েমির জীবন ছেড়ে কোনো পাহাড়ি গ্রামের ছোটো হোমস্টেতে থেকে গায়ে হাল্কা চাদর জড়িয়ে কফির কাপে চুমুক দিয়ে প্রকৃতির অপরূপ শোভা উপভোগ করলে মন ভেসে যাবেই । তাই হয়তো দার্জিলিং এর ভীড় এড়িয়ে প্রকৃতির রূপ – রস – গন্ধ – স্বাদ উপভোগ করতে দার্জিলিং থেকে ২৮ কিমি দূরে তাকদা কেই বেছে নিলাম থাকার জন্য।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তাকদার উচ্চতা ৫১০০ ফিট। তাকদা হলো ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম ক্যান্টনমেন্ট জোন।সারাবছর এখানে কুয়াশায় ঢাকা থাকে l দার্জিলিং থেকে এখানে ঠান্ডাও অনেক বেশি। শান্ত নিরিবিলি এই পরিবেশের সাহচর্য্য পেতে এনজেপি থেকে তাকদা হোমস্টে এর গাড়ী করে তিস্তা, রামভি হয়ে সাড়ে তিন ঘন্টায় পৌঁছে গেলাম প্রায় ৫৫০০ ফিট উঁচুতে। দুপুর তিনটেয় নেমে গেলাম তাকদায়। প্রকৃতি এখানে নিজেকে যেন উজাড় করে দিয়েছে, নির্জনতার মাঝে প্রকৃতির অপরূপ শোভা দেখতে দেখতে জড়িয়ে ধরল মুগ্ধতা।যাত্রা পথে মাঝে মাঝে নেমে দূরের প্রকৃতির দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করলাম। যত উঁচুতে উঠছি তত হিমেল হাওয়া, ঘন কুয়াশা, শিহরণ জাগানো সুন্দর সেইসব মুহূর্ত, আর আমাদের গাড়ির ড্রাইভার বিনোদজির স্টিয়ারিং হাতে দক্ষতাও ছিল অসাধারণ। অনায়াসে চড়াই উৎরাই পেরোতে যা ছিল আমাদের বাড়তি পাওনা।

তাকদার অন্যতম আকর্ষণ শতবর্ষ প্রাচীন ব্রিটিশ বাংলো।হোমস্টের সুন্দর আপ্যায়ন, খাওয়া, থাকার সুন্দর ব্যবস্থা পথশ্রম নিমেষে লাঘব । বিকেলে হোমস্টের আশেপাশে ঘুরে দৃশ্য মেঘপাহাড়ের দেশে মেঘকে যেন হাতের মুঠোয় নিয়ে আসার পালা । সন্ধ্যেবেলায় রেস্ট নিয়ে দ্বিতীয়দিন সকাল ৯ টায় ব্রেকফাস্ট করে আবার যাত্রা শুরু । তিনচুলে সান রাইস পয়েন্ট, তিনচুলে মোনাস্ট্রি, লামহাট্টা ইকো পার্ক, ত্রিবেণী, গুম্বাডারা ভিউ পয়েন্ট। গুম্বাডারা ভিউ পয়েন্ট দেখতে দেখতে বেলা গড়িয়ে গেল চোখের পলকে , কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে বিকেলে ফিরলাম হোমস্টেতে । লামহাট্টা পার্কের সেক্রেড লেক এখনও টানছে। বিশাল উঁচুউঁচু পাইন গাছ পার্ক এর শোভা বাড়িয়েছে । সর্বত্র প্রাকৃতিক দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী না করে উপায় কি!

তৃতীয়দিন আমাদের ভ্রমণের লক্ষ্য লেপচাজগৎ। সেই উদ্দেশ্যে সকাল ৯ টায় ব্রেকফাস্ট করে রওয়ানা হলাম তাকদা হোমস্টের নিজস্ব গাড়িতে। যাওয়ার পথে দেখলাম তাকদা অর্কিড গার্ডেন, রংলী রংলিয়েট টি গার্ডেন, ঘুম স্টেশন, ঘুম মোনাস্ট্রি। তারপর আরও উচ্চতায় ওঠা শুরু। লেপচাজগৎ যেতে যেতে রাস্তায় শুরু হলো বৃষ্টি সঙ্গে ঘন কুয়াশা। সামনের রাস্তা দেখাই যায় না এমন পরিস্থিতি। বিনোদজি কিন্তু অকুতোভয়। নিপুন হাতে গাড়ি চালিয়ে আমাদের দুপুর বেলায় নামিয়ে দিলো লেপচাজগৎ হোমস্টে তে। বৃষ্টি তখনও ধরে নি।চারপাশ যেন গাঢ় কালো চাদরে মোড়া,কিছুই দেখা যায় না। তার মধ্যেই সারি সারি পাইন গাছের ফাঁকে কুয়াশা, সে এক অপূর্ব দৃশ্য।সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে লেপচাজগৎ এর উচ্চতা প্রায় ৬৯০০ ফিট।জুনের প্রথমেও বেশ ঠান্ডা এখানে। মিলল হোমস্টেতে সুবন্দোবস্ত আর মানুষদের আন্তরিকতা।

চতুর্থদিন সকালে ওদের গাড়িতে বৃষ্টি মাথায় করে ঘুরতে গেলাম দার্জিলিং। ঘুম হয়ে এলাম তেনজিং নোর্গে রক দেখতে, হাল্কা বৃষ্টি সঙ্গে নিয়ে টয় ট্রেনের শব্দ অন্য জগতে নিয়ে যাবে । উপভোগ করলাম টয় ট্রেনের যাত্রা। সেখান থেকে গেলাম বাতাসিয়া লুপ। বাতাসিয়া লুপ থেকে দেখা যায় দার্জিলিং শহরের অনেকটা অংশ, যারা গেছেন তাঁরা জানেন, যারা যান নি তাঁরা অনেককিছু পান নি।পরবর্তী গন্তব্যস্থল দার্জিলিং ম্যাল। কিছু সময় কাটিয়ে আবার ফিরেছি লেপচাজগৎ এর উদ্দেশ্যে।

দিনকয়েক মেঘ-পাহাড়ের দেশে ছিলাম। ছিলাম যেন স্বপ্নের দুনিয়ায়। ফেরার তিস্তা তোর্সা এক্সপ্রেস ধরতে মিরিক ঘুরে এনজেপি। আবার রুক্ষ বাস্তবে ফেরার দিন। পাথেয় হিসেবে বুক ভরে নিয়ে এলাম টাটকা হাওয়া। আপনিও ঘুরে আসতে পারেন, খুব বেশি হ’লে এরকম কয়েকদিনের ভ্রমণে মাথাপিছু খরচ খরচা হাজার দশ হাজার টাকা, আনন্দ অমূল্য ।।

About Post Author