সময় কলকাতা ডেস্ক : চোখ তুলে তাকালেই শরতের নীল আকাশ – এ যেন কাশফুল, শিউলি ফুলের দিন।দেবী আসছেন । উমা তার চার ছেলেমেয়েকে নিয়ে বাপের বাড়ি উঠবেন। আগে দুগ্গা ঠাকুরের বাপের বাড়ি ছিল বাংলার রাজপরিবার, জমিদার বাড়ি, বাবুদের বাড়ি। সে তো কয়েকশো বছর আগের কথা। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে বারোয়ারি পূজো চালু হল। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে সূচনা হল সার্বজনীন পুজোর । উমার বাপের বাড়ি এখন শহরে নগরে গ্রামে প্রান্তরে। তা বলে কি পুজোর আঙ্গিকে জমিদার বাড়ির কৌলিন্য বা অভিজাত্য বিন্দুমাত্র খর্ব হয়েছে? এখনো নিয়ম আর প্রথা মেনে অনেক জমিদার বাড়িতেই ঘটা করে হয় দুর্গাপুজো। অনেক পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও অনেক ইতিহাস। অনেক দুর্গা পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক কাহিনী গল্পকথা এমনকী মনীষীদের স্মৃতি। আজ আমরা চর্চা করব এমনই এক বনেদি বাড়ির পুজোর কথা। সোনারপুরের কোদালিয়ার বসু পরিবারের দুর্গা পুজো নিয়ে করব চর্চা। এখানের দুর্গা পুজোর কথা নিয়ে আলোচনা করতে গেলেই উঠে আসবে বরেণ্য দেশনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর কথা। নেতাজির পূর্বপুরুষ যে দুর্গা পুজোর সূচনা করেছিলেন তার সঙ্গে নিবিড় যোগসূত্র ছিল সুভাষচন্দ্রের। মা দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে ছেলে মেয়েদের নিয়ে আজও ওঠেন কোদালিয়ার বসু পরিবারের বাড়িতে।
দুশোবছরের বেশি আগে শুরু হওয়া এক বনেদি বাড়ির পুজোর চর্চার আগে স্মরণ করা যাক বঙ্গ তথা ভারত বর্ষের এক প্রাতস্মরণীয় মহাপুরুষের কয়েকটি শব্দবন্ধ। “মা-কে বাদ দিয়ে কোনও পূজাই হয় না। আমাদের সমাজের ইতিহাসে যখনই বিপদ-আপদ জুটিয়াছে, তখনই মা-র আবাহন করিয়াছি। আমাদের অন্তরের যাহা কিছু পাইয়াছি, তাহা লইয়াই মাতৃমূর্তি রচনা করিয়াছি। …তাই বুঝি ‘মা’-র সৃষ্টি। ভগবান করুন যেন আমি চিরকাল এই ভাব নিয়ে মাতৃপূজা করে যেতে পারি…,” নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু একদা চিত্তরঞ্জন দাসের স্ত্রী বাসন্তী দেবীকে লেখা তাঁর চিঠিতে এমন বেশ কিছু কথাই বলেছিলেন। তার মাতৃভক্তি আর মাতৃরূপিণী দেবীর আবাহন মিশে গিয়েছিল তাদের বাড়ির দুর্গা পুজোর আরাধনায়। নেতাজির স্মৃতিধন্য কোদালিয়ার হরনাথ লজ আর নেতাজির পূর্বপুরুষ বা হরনাথ বসু বা তাঁর পূর্বপুরুষেরা এখানে যে পুজোর পরম্পরা বজায় রেখেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি প্রবাসে বা কারাগারে না থাকলে তাঁর মাকে নিয়ে প্রতিবার দূর্গা পূজার সময় পৌঁছে যেতেন কোদালিয়ার বসু বাড়িতে। এলাকার প্রবীনরা বলেন তাঁরা তাদের প্রাচীন পূর্বজদের কাছে শুনেছেন যে পুজোর সময় নিবিষ্ট চিত্তে নেতাজি মা দুর্গার সামনে ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। পাশে থাকতেন তাঁর মা প্রভাবতী দেবী।

নেতাজির পরিবারের নথিপত্র ঘেঁটে যা জানা যায় কোদালিয়ার বসু পরিবারের দুর্গা পুজোর প্রথম প্রচলন হয়েছিল ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে। অর্থাৎ এবছর ২০৩ বছরে পা দিচ্ছে বসু পরিবারের পুজো। উল্লেখ্য যে বসু পরিবার মাহিনগর ছেড়ে ১৭০৭ সালে বাস শুরু করে কোদালিয়ায়। তার ১১৩ বছর পরে,সে সময় পরিবারের প্রধান যাদব চন্দ্র বসুর বিধবা বোনের একাগ্র আগ্রহে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়। কাল ক্রমে এই পুজোর দায়িত্বভার নেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের পিতা জানকীনাথ বসু। প্রচলিত মত ও জনশ্রুতি যাই থাকুক না কেন, জানা যায় সুভাষচন্দ্র বসু সক্রিয়ভাবে তিনবার কোদালিয়ার বসু পরিবারের দুর্গাপূজায় অংশ নিয়েছিলেন। এরমধ্যে একবার রাজনৈতিক ভাবে যথাক্রমে ১৯২৮, ১৯৩৭ ও ১৯৩৯ সালে নেতাজি কোদালিয়ায় এসে দুর্গা পূজার দিনে ছিলেন। ফলে বরেণ্য দেশনায়কের স্পর্শ রয়ে গেছে এখানের দুর্গাপুজোয়। তাৎপর্যপূর্ণ যে হরিপুরা কংগ্রেসের আগে ও পরে দুবছরই নেতাজি দূর্গা পূজার দিনগুলো কাটিয়ে গেছেন কোদালিয়ায়। গান্ধীজীর সঙ্গে সংঘাত ও সম্পর্কে ফাটল ধরলেও নেতাজি নিজের নীতি থেকে এক চুল পিছু হটেন নি। তিনি এক দিকে দৃঢ় চিত্তে নিজের রাজনৈতিক মত প্রকাশ করে গেছেন তার বৈপ্লবিক চিন্তাধারা দিয়ে দেশকে স্বাধীন করার চেষ্টাকরেছেন। ফলে ফলে যিনি বিশ্বাস করতেন বিপদ-আপদে সময় মানুষ দেবীর আবাহন করে থাকে, তিনি দেশবাসীর বিপদ থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে শক্তি লাভ করেছিলেন কোদালিয়ায় তাদের পরিবারের দুর্গা পুজোর আবাহনের মধ্যে দিয়ে।
আজও নেতাজির ভ্রাতার দৌহিত্র তথা বংশধররা রীতি মেনে পুজোর আয়োজন করেন। দুর্গার বোধন হয় মহালয়ার পরের দিন।সাবেকি রীতি মেনেই হয় পুজো। এখন এখানে বসু পরিবারের কেউ থাকেন না ঠিকই কিন্তু অষ্টমীর দিন কাছে দূরে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বসু পরিবারের মানুষজন এসে হাজির হন কোদালিয়ায়।

বনেদি বাড়ির দুর্গা পুজোর বিশেষত্ব কেবল সীমাবদ্ধ থাকে না পুজো আয়োজনের অভিনবত্বে, পুজোর দীর্ঘ সময়ের পরতে পরতে থাকা ইতিহাসও বিশেষত্ব হয়ে ওঠে বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর। নেতাজি সুভাষের স্মৃতিধন্য হওয়ায় কোদালিয়ার বসু পরিবারের পুজো অগ্রগণ্য বনেদি বাড়ির পুজো।
মানুষ জীবনে এমন একটি স্থান চায় যেখানে তর্ক থাকবে না বিচার থাকবে না – মাতৃপূজা সম্পর্কে এমন মতের কথা লিখে গেছেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র। নেতাজির মাতৃ পূজার সংকল্প মিশে যেত তার মাতৃভক্তির সঙ্গে। ঠাকুর দালানে পাশে মা প্রভাবতী বসু ও সামনে আনন্দময়ী দেবী মা দুর্গা, নিবিষ্ট চিত্তে ধ্যানরত নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু – এই চিত্র মনোশ্চক্ষে ভেসে উঠলেই বনেদি বাড়ির পুজোর ঐতিহ্যের চিত্র সমুজ্জল হয়ে ওঠে।।


More Stories
চলে গেলেন মিঠু মুখার্জী
‘দিল্লি কা লাড্ডু’ খেয়ে গাছের মগডালে : আহমেদ আনসারীর আশ্চর্য কাহিনী
আসছে ভুতু আয়া ভাগো