চুমকি সূত্রধর, সময় কলকাতা,৫ জানুয়ারিঃ তিনি সংগ্রামের প্রতীক। তিনিই আন্দোলনের মুখ। তিনি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ, ৫ জানুয়ারি তাঁর জন্মদিন।
আশুতোষ কলেজের ছাত্রনেত্রী থেকে ৩৪ বছরের এক নিয়মতান্ত্রিক সরকারকে সমূলে উপড়ে ফেলেছিলেন তিনি। তিনি সংগ্রামী। তিনি আন্দোলনের মুখ। তিনি মানেই হেরে গিয়েও আবার ফিরে আসা যায়। সেই সংগ্রামী নেত্রী আজ বাংলার মসনদে।

তিনি বাংলার প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী, তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে, এই পথ কিন্তু সহজ ছিল না! এই পথ পেরোতে মার খেতে হয়েছিল অনেক। কিছুটা প্রকাশ্যে, কিছুটা চোরাগোপ্তা। এটা শোনা যায় সেই ঘটনাগুলোর সাক্ষী থাকা মানুষগুলোর মুখেই। ১৯৯৩ সাল, ২১ জুলাই, নো কার্ড, নো ভোট, সচিত্র ভোটার কার্ডের দাবিতে এই স্লোগান তুলেই মহাকরণ অভিযানের ডাক দিয়েছিলেন তিনি। বাংলার মসনদে তখন জ্যোতি বসুর সরকার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যুব প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি। বঙ্গ রাজনীতির ক্যালেন্ডারে এই দিনটা লেখা থাকবে চিরকাল। রাইটার্স অভিযানে তরতাজা ১৩টি প্রাণ ঝরে যায়। তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বলেছিলেন, ‘ওরা মহাকরণ দখল করতে এসেছিল, পুলিশ গুলি চালিয়েছে।’ কিন্তু, সেই দিনটিকেই পাথেয় করে বঙ্গ রাজনীতিতে স্বতন্ত্র জায়গা করে নেন মমতা। আসলে বলা চলে, সেটাই ছিল মমতার উথ্থান। আসলে সেদিন থেকেই মমতার এই রণংদেহী, সংগ্রামী, যোদ্ধা মনোভাবকে ভয় পেতে শুরু করেছিলেন তারা। দক্ষিণ কলকাতার ওলিতে, গলিতে, বস্তিতে মেয়েদের ওপর অত্যাচার হলেই শোনা যেত, মমতা আসছে, সবাইকে ঠিক করবে।
রাজনীতির ইতিহাসে দ্বিতীয় বড় ধাক্কা ছিল হয়তো ২০০৬ সালের সিঙ্গুর আন্দোলন। তত্কালীন বামফ্রন্ট সরকার ন্যানো শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের কথা ঘোষণা করে। তারপরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে শুরু হয় জোর করে কৃষিজমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলন। ৯৯৭ একর কৃষিজমি অধিগ্রহণের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। তার নেতৃত্বে ছিল বিরোধী তৃণমূল। ২০০৬-এর ৩০ নভেম্বর সিঙ্গুরে গিয়ে আক্রান্ত হন তৎকালীন বিরোধীনেত্রী মমতা। সেই অশান্তির রেশ এসে পৌঁছে গিয়েছিল রাজ্য বিধানসভাতেও। সিঙ্গুরের ‘অনিচ্ছুক’ কৃষকদের জমি ফেরানোর দাবিতে ২০০৬ সালে, ২৬ দিন ধর্মতলার মোড়ে অনশন-অবস্থান করেছিলেন মমতা। অনশনের পথে গিয়ে আন্দোলনকে সংসদীয় রাজনীতিতে কিভাবে তুলে ধরা যায়, তা হয়তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেকেই শিখে নিয়েছিলেন অনেক পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ। তবে, সেসময় অনেকেই দিধাবিভক্ত থাকলেও ২০০৬ সালে মমতা যে ঠিক ছিলেন, তার প্রমাণ মিলেছিল ২০১৬ সালে।
সুপ্রিম কোর্ট জানায়, সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া অবৈধ ছিল। সেই সময় মমতার মুখের হাসিটা হয়তো অনেকেই মিস করেছিল। ২০০৬ সাল ছিল মমতার উড়ান শুরু। সেই উড়ানের বৃত্ত শেষ হয়েছিল নন্দীগ্রামে গিয়ে। আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠেছিলেন মমতা। নন্দীগ্রামে ১০ হাজার একর জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর সরকার। ‘অনিচ্ছুক’ কৃষকরা অবশ্য রুখে দাঁড়াতে পারেননি। আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর ফলে আটকে গিয়েছিল সালেম গোষ্ঠীর কেমিক্যাল হাব তৈরির পরিকল্পনা। অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে নন্দীগ্রাম, খেজুরি-সহ পূর্ব মেদিনীপুরের একাধিক এলাকা। ১৪ জন নিরীহ গ্রামবাসীর উপরে নির্বিচারে গুলি চলেছিল সেদিন। সে সময় মমতার আন্দোলন লিখে দিয়েছিল, বাংলার মসনদে এবার বদল আসতে চলেছে। ঠিক সেটাই হয় ২০১১ সালে। বাংলার মসনদে বসেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যাপাধ্যায়। এবার বাংলার মসনদ সামলানোর পালা। প্রথম দুটো পালায় খুব সহজে সংখ্যা গরিষ্ঠতা আনতে পারলেও একুশে সারদা সহ একাধিক দুর্নীতির ইস্যুতে সেই জেতার স্পিরিটটা টলমল হয়েছিল তাঁর দলের বহু নেতাদেরও। এবার প্রতিপক্ষ বদলেছিল। এবার মমতার সামনে প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল বিজেপি। কিন্তু, তবুও তৃণমূল সুপ্রিমোর স্পিরিট কিন্তু টলমল হয়নি। ভাঙা পায়ে মমতার প্রচারে একটুও আঁচ আসেনি। ডাক্তাররা হাঁটতে বারণ করেছিল তাঁকে। সে সময় বিরোধীদের কুকথাও শুনেছিলেন প্রচুর। কিন্তু, গায়ে মাখেননি তিনি। তাঁর সেই মুখ, তাঁর সেই আত্মবিশ্বাসই জয় ছিনিয়ে এনেছিল দলের জন্য। আজও যখন কোনও প্রশাসনিক মঞ্চে অথবা রাজনৈতিক মঞ্চে মমতাকে হাঁটতে দেখা যায়, তখন না চাইতেও অনেক সময়ই তাঁর পায়ের দিকে চোখ চলেই যায়। মনে হয়, এখনও হয়তো সামান্য খোঁড়াচ্ছেন তিনি। কিন্তু, হয়তো মনের ভুল হিসেবে ভাবনা বদল করে নেয় অনেকেই।

তবে, এখন পরিস্থিতি বদলেছে। মমতার সেই দল এখন শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, আবাস দুর্নীতি, কয়লা পাচার, গরু পাচার সহ একাদিক দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ। শ্রীঘরে রয়েছেন মমতার স্নেহধন্য তাবড় তাবড় নেতা। সবটাই বিচারাধীন। ষাট পেরিয়ে সত্তর ছুঁই ছুঁই মমতা। কিন্তু, আজও তাঁকে দেখে অনুপ্রাণিত হন অনেকে। এত দুর্নীতির অভিযোগের মাঝেও মমতার হার না মানা মনোভাব আজও উজ্জিবিত করে তৃণমূলের বহু নেতাকে। তাঁর পথচলা এখনও বাকি। এখনও অনেক মাইল ফলক তৈরি করা বাকি। শুভ জন্মদিন মাননীয়া।


More Stories
কেক কেটে ঈদ উদযাপন
রবীন্দ্র জন্মদিন : মোদি ও মমতার কবিগুরু স্মরণ
রবীন্দ্রনাথের পরলোক চেতনা ও প্রেতচৰ্চা