সময় কলকাতা ডেস্ক, ২২ ফেব্রুয়ারি: তুরষ্কের কুস্কয়, স্পেনের লা গোমেরা ও ভারতের কংথং গ্রামের মধ্যে মিল কোথায় যদি প্রশ্ন করা হয় তবে চট করে উত্তর দিতে পারবেন? ভৌগলিক অবস্থানে এই তিনটি গ্রাম বিশ্বের তিন প্রান্তে হলেও কিন্তু এক সুরে বাঁধা রয়েছে। কারণ এই তিন গ্রামের মানুষদের মনের ভাব প্রকাশের জন্য প্রয়োজন হয় না কোনও ভাষার। বিভিন্ন পাখির ডাকের শিস দিয়েই তাঁরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলে নেন। আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এটাই হল মজার প্রতিবেদন। উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্য মেঘালয়ে রয়েছে এই আজব গ্রাম। মনের ভাব প্রকাশের জন্য অন্য ধারার মাধ্যম ব্যবহারের জন্য এই গ্রামকে বলা হয় ‘A Whistling Village’।

মেঘের আড়ালে ঢাকা ছোট্ট এক পাহাড়ি গ্রাম কংথং। গ্রামটি বিখ্যাত চেরাপুঞ্জি থেকে ৫৬ কিলোমিটার দূরে এবং শিলং থেকে ৫৪ কিলোমিটার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই গ্রামের সাবেকি নাম জিঙ্গরই লবেই, এর অর্থ হল সুরের গাঁ। এই জিঙ্গরই লবেই বা কংথং গ্রামের বহু প্রাচীন রীতি হল এই গ্রামের কোনও বাসিন্দাদেরই নাম নেই। শিশু জন্মানোর পর তাঁর মা শিস দিয়ে ঘুমপারানিয়া গান গেয়ে ওঠেন। সেই গান অনুযায়ী নবজাতকের নামকরণ হয়। না, ঠিক নাম নয়, শিস দিয়েই হয় পরিচয়। এবং আশ্চর্যের বিষয়, প্রতিটি মানুষের জন্য আলাদা আলাদা শিস চিহ্নিত হয় নামের বিকল্প হিসেবে। আর তাঁরাও প্রত্যেকে সাড়া দেন শিস শুনেই।

হুইসলিং ভিলেজে বর্তমানে বসবাস করেন প্রায় ৭০০ পরিবার। তবে ভেবে নিন, কত রকমের শিস হতে পারে। গ্রামের প্রবীন বাসিন্দাদের বক্তব্য, বহুকাল পূর্বে এই এলাকার পূর্বপুরুষরা জঙ্গলে দলবেঁধে শিকারে যেত। তখন শিস দিয়েই একে অপরকে ডাকতেন। সেই রীতি মেনেই পরবর্তী সময় নামের বিকল্প হয়ে ওঠে শিস। তাঁদের বক্তব্য, পাখির ডাকও এক ধরণের ভাষা। এই পাখির ডাকের সঙ্গে মনের এক গভীর যোগ রয়েছে। তাঁরা বিশ্বাস করেন, শব্দ হল ব্রক্ষ্ণ, হোক সে পাখির ডাক। যুগ যুগ ধরে এই গ্রামের মায়েরা পাহাড় জঙ্গলে ঘুরে নানান পাখির ডাক শোনেন এবং শিখে নেন। পরে সেই পাখির ডাক থেকে নিজেরাই সুর তৈরি করেন। তাঁদের সন্তান জন্মালে সেই সুর সদ্যজাতর কানের কাছে গুন গুন করেন মায়েরা। ওই গানের প্রথম অক্ষরের সঙ্গে শিস দিয়ে সুরই হয়ে যায় ওই নবজাতকের নাম। পুরো প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় জিংগারওয়াই লেওবেই। এই গ্রামে কোনও শিশু স্কুলে যাওয়ার আগেই এই জিংগারওয়াই লেওবেই আওরাতে শিখে নেয়। তবে এই গ্রামের শিশুরা এখন স্কুলে যায়, কলেজে যায়। এই গ্রামের অনেকেই উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছেন কর্মসূত্রে।

কংথং গ্রামটি বিশ্বের পর্যটন মানচিত্রে জনপ্রিয় হুইসলিং ভিলেজ নামে। ২০১৯ সালে গ্রামটিকে দত্তক নিয়েছিলেন বিহারের রাজ্যসভার সাংসদ রাকেশ সিনহা। খাসি পাহাড়ের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত এই গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। সম্প্রতি ইউনাইটেড নেশনস্ ওয়ার্ল্ড ট্যুরিজম অর্গানাইজেশন বা UNWTO-এর সেরা পর্যটন গ্রামের জন্য মনোনয়ন পেয়েছে কংথং। এই গ্রামে ঘুরতে গেলেই শুনবেন গ্রামবাসীরা শিস দিয়ে পাখির আওয়াজে একে অপরের সঙ্গে কথা বলছেন। যদি স্থানীয় গাইড আপনি নেন, তবে তিনিই পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে দেবেন আপনাকে। গ্রামটির অসাধারণ সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবেই, সেই সঙ্গে প্রাচীন এই রীতিও আপনাকে চমকে দেবে। শিলং বা চেরাপুঞ্জি থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েই আপনাকে যেতে হবে কংথং গ্রামে।


More Stories
কেক কেটে ঈদ উদযাপন
বউ বদল : ময়নাগুড়িতে স্বামী-স্ত্রীর বদলাবদলি নাকি বদলা ?
জেলায় জেলায় অনুপ্রবেশকারীদের ও সন্দেহভাজনদের আটক করে রাখা হচ্ছে হোল্ডিং সেন্টারে