Home » রাজা জয়াপীড় ও নর্তকী কমলার প্রেমের ইতিহাস

রাজা জয়াপীড় ও নর্তকী কমলার প্রেমের ইতিহাস

পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা,১৭ মার্চ:

রাজা জয়াপীড় ও নর্তকী কমলার প্রেম ও তার ইতিহাস জানার পাশাপাশি একটি বিষয় প্রাককথন হিসেবে তুলে ধরা দরকার। আমরা জানি,বিভিন্ন কারণে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বিভাজন এখানেই থেমে থাকেনি। ১৯৭১সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ জন্ম নেয়। ফলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এখন তারকাঁটার বেড়াজাল।সীমানার তারকাঁটা ইতিহাসকে যে কোনোভাবে আটকে রাখতে পারে না তার প্রমাণ মিলেছে বারবার।  আজ জয়াপীড় ও কমলা শীর্ষক ঐতিহাসিক আলোচনার মধ্যে প্রবেশ করলে ভারত ছাড়িয়ে ঢুকে পড়তে অধুনা বাংলাদেশে যা কিনা অখণ্ড ভারতের অংশ ছিল। ফলে জয়াপীড়ের ও কমলার ইতিহাস আলোচনা করলে উঠে আসবে গৌড়ের ইতিহাস, পুন্ড্রবর্ধনের ইতিহাস উঠে আসবে তৎকালীন রাজন্যবর্গের কথা। অথচ আজ কালের নিয়মে গৌড় দাঁড়িয়ে আছে এপার বাংলায় এবং পুন্ড্রবর্ধন বা পুন্ড্রনগর ভগ্নদশায় পড়ে আছে বাংলাদেশের শিবগঞ্জ উপজেলায় করতোয়া নদীর তীরে। ইতিহাস বর্তমানকালের রাষ্ট্রনায়কদের দেশবিভাজনের তত্ত্বর উর্দ্ধে জেগে থাকে।

জয়াপীড় ও কমলার কথা বলতে হলেই আমাদের ফিরে যেতে হবে অতীতের অখণ্ড ভারতে আর মাঝেমাঝে বলতে হবে গৌড় বা প্রাচীন পুন্ড্রনগরের যা কিনা বর্তমানে মহাস্থানগড়ের কথা। নাহলে জয়াপীড় বা কমলার কথা নিছক ইতিহাসের এক দুর্বোধ্য অধ্যায় হিসেবে মনে হবে। যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে তখনও পাল ও সেন বংশের সূচনা হয় নি। সে সময় শুরবংশীয় রাজারা গৌড়রাজ্য শাসন করতেন, পুন্ড্রবর্ধন তাঁদের রাজধানী ছিল। অষ্টম শতকের মধ্যভাগে পুন্ড্রবর্ধন নগরের রাজা ছিলেন জয়ন্ত । জয়ন্ত ও শুররাজ আদিশুর একই ব্যক্তি বলে মনে করা হয়। ধ্রুবানন্দ মিশ্রের গ্রন্থে উল্লেখ আছে, শুর বংশীয়রা কাশ্মীরের দর্দিস্থান বা প্রাচীন দরদ দেশ থেকে গৌড়ে এসেছিলেন। আইন ঈ আকবরীতে আদিত্যশুরের উল্লেখ আছে। অনেকে বলেন, শশাঙ্ক নরেন্দ্রর বংশজাতও ছিলেন আদিশুর। আর এই রাজা জয়ন্তের সঙ্গে জুড়ে আছে জয়াপীড়-কমলার কথা।জয়াপীড় ও কমলার কাহিনীর শুরুর কথা ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হলে আমাদের কলহনের রাজতরঙ্গিনী গ্রন্থের চতুর্থ খন্ডের ৪২১ থেকে ৪৮৪ নং শ্লোক পর্যন্ত যা বর্ণিত তা জেনে নিতে হবে। কলহনের বই থেকে আমরা জানতে পারি ৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে কাশ্মীর রাজ জয়াপীড় পুন্ড্রনগরে এসেছিলেন। জয়াপের ৭৫১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৭৮২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কাশ্মীরের রাজা ছিলেন। কেন এসেছিলেন তিনি বঙ্গে?

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা ঐতিহাসিক উপন্যাস জয়াপীড়ে গল্পচ্ছলে বলা হয়েছে, জয়াপীড় একদিকে প্রবল পরাক্রমশালী ও অন্যদিকে বিলাসী ছিলেন। তিনি তাঁর লেখকের চোখে যা দেখেছেন তা পড়ে প্রত্যয় হয় তিনি প্রাচীন ঐতিহাসিক উপাদানকে তাঁর লেখায় তুলে ধরতে চেয়েছেন এবং এক্ষেত্রে যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপাদান রাজতরঙ্গিনী তা বলাই বাহুল্য। বঙ্গে এলে তিনি সঠিক কোথায় এসেছিলেন, বর্তমানে সেই স্থানের অস্তিত্ব কোথায়? আর এই আলোচনা করতে হলে
একটি ঐতিহাসিক আলোচনা ও বিতর্কে ঢোকার চেষ্টা করতে হবে।  খ্রিস্টপূর্ব ৭ম-৮ম শতকের দিকে প্রাপ্ত বেদবাক্য অনুযায়ী পুণ্ড্র ছিল একটি অনার্য গোষ্ঠী যারা গণ্ডকী নদীর পূর্বদিকে বাস করত। ১ম খ্রিষ্টাব্দের মহাভারতও এই তথ্যটি সমর্থন করে। অশোকাবদান গ্রন্থে এটি প্রথমবার পুণ্ড্রবর্ধন নামে উল্লেখিত হয়। পুণ্ড্রদের আবাসস্থলই পুণ্ড্র বা পুণ্ড্রবর্ধন নামে খ্যাত হয়েছিল। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ‍দ্বিতীয় শতাব্দীর মহাস্থান ব্রাহ্মীলিপিতে উল্লিখিত ‘পুদনগল’ (পূণ্ড্রনগর) ও বগুড়ার মহাস্থান যে অভিন্ন এবং পুণ্ড্রনগর যে পুণ্ড্রদের আবাসস্থল পুণ্ড্রবর্ধনের কেন্দ্র সে নিয়ে বিতর্ক সামান্য হলেও আছে। রজনীকান্ত চক্রবর্তীর মত ঐতিহাসিক বলেন মহাস্থানগড় ও পুণ্ড্রবর্ধন ভিন্ন স্থান।রজনীকান্ত চক্রবর্তীর মতে,মালদার বর্তমান পাণ্ডুয়া সেযুগের পুন্ড্রবর্ধন। কিন্তু অধিকাংশ ঐতিহাসিক মনে করেন আদিকালের মহাস্থান তথা মহাস্থানগড় সেযুগে পুণ্ড্রবর্ধন নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তী সময় পুন্ড্রবর্ধন রূপে বর্তমান পাণ্ডুয়ার উদ্ভব। এজন্য তাঁরা চীনা পরিব্রাজক হিউ এন সাঙ্ কে উদ্ধৃত করেন।সপ্তম খ্রিস্টাব্দের দ্বিতীয় শতকে চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এখানে আসেন। তাঁর বিবরণে এই এলাকার সমৃদ্ধির ও বিস্তৃতির কথা জানা যায়। হিউয়েন সাং লিখেছেন ‘সাং ক-চু-উ-খি-লো’ (রাজমহলের কাছে ‘কজঙ্গল’) থেকে পূর্ব দিকে রওনা হয়ে গঙ্গা পেরিয়ে ‘পুন-ন-ফ-তন-ন’ (পুন্ড্রবর্ধন) অঞ্চলে পৌঁছান। সেখান থেকে আরও পূবে গিয়ে কিয়-মো-লু-পো (কামরূপ) পৌছনোর আগে এক বিশাল নদী পার হন। অর্থাৎ কজঙ্গল থেকে পুন্ড্রবর্ধন হয়ে কামরূপ পর্যন্ত রাস্তা ছিল। ফলে, পুন্ড্রবর্ধনের অবস্থিতিতে মধ্যগাঙ্গেয় উপত্যকায় শাসন ও সংস্কৃতির বিস্তার সম্ভব হয়েছিল।

আরও পড়ুন   খনামিহিরের ঢিপির মাটিচাপা ইতিহাস

‘করতোয়া-মাহাত্ম্য’ থেকে জানা যায়, ১২ শতক পর্যন্ত পুন্ড্রনগর একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল। মধ্যযুগে পুন্ড্রনগর ও পুন্ড্রবর্ধন রাজ্য ধীরে ধীরে পশ্চাদপদ হয়ে যায়। তখন এর নাম ছিল মহাস্থান। আজ বাংলাদেশের বগুড়ার কাছে রয়েছে মহাস্থানগড়। সেখানে মাটি খণন করে পাওয়া গিয়েছে বিপুল পরিমানে ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রী। পরবর্তী সময় পুন্ড্রবর্ধনের গরিমা লুপ্ত হয়।বখতিয়ার খলজি বাংলায় নিজের প্রভাব বাড়াতে থাকেন, গৌড়ের থেকে রাজত্বের চাবিকাঠি সরে যেতে থাকে। লক্ষণ সেন যেমন রাজধানী সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন নবদ্বীপে, তুর্কী আমল থেকেই গৌড়ের রাজধানী রাজত্ব সরতে থাকে। সরে যায় দিল্লিতে। তখন স্থানীয় শাসনের কেন্দ্র হয়ে যায় নিকটের আরেকটি এলাকা – পান্ডুয়া। এই জায়গাটিই সেদিনের পৌন্ড্রবর্ধনের অপভ্রংশ সুলতান ইলিয়াস শাহ (১৩৪২-১৩৫৮) দিল্লি থেকে ফের বাংলা ছিনিয়ে নেন, আর গৌড় থেকে রাজধানী উঠিয়ে নিয়ে চলে আসেন পাণ্ডুয়ায়। পরে রাজধানী আবার গৌড়ে ফিরে গিয়েছিল। আবার ফেরা যাক মূল প্রসঙ্গে। জয়াপীড় ৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে যখন বঙ্গে আসেন এবং তারপর যেভাবে নতুন ইতিহাস গড়েন তার পেছনে জয়াপীড়ের যে চারিত্রিক কারণ ছিল তা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসে কাশ্মীররাজের বর্ণনার সাথে খাপ খেয়ে যায়। জয়াপীড় সেবার সাম্রাজ্য বিস্তারে কান্যকুব্জ ও সারস্বত রাজ্যজয় করে মিথিলার দিকে অগ্রসর হলে সেনাবাহিনী আর এগোতে চায়নি। ফিরে যাননি জয়াপীড়। তিনি এসে পৌঁছান পুন্ড্রনগরে। নগর দেখে মুগ্ধ কাশ্মীর রাজ স্কন্দ মন্দিরে পৌঁছান যেখানে সন্ধ্যার আরতি চলছে। জয়াপীড় মুগ্ধতা আরও বাড়ল নৃত্যরতাকে দেখে। এসময় মন্দিরে নৃত্যরতা ছিলেন কমলা যাকে নিয়ে বহু গান রচনা হয়েছে।এরমধ্যে একটি গান তো আজও লোকের মুখেমুখে ঘোরে : ভালো করিয়া বাজাও গো দোতারা সুন্দরী কমলা নাচে। কমলাকে দেখে যেরকম মুগ্ধ হলেন জয়াপীড় ঠিক একইভাবে জয়াপীড়ের রাজসুলভ আভিজাত্য মুগ্ধ করল কমলাকে। কথিত আছে, জয়াপীড়কে নিজ গৃহে নিয়ে যান কমলা। এসময় কমলার কাছে নগরে বন্য সিংহর খবর পেয়ে তা বধ করেন জয়াপীড়। পুন্ড্রনগর রাজ জয়ন্ত খোঁজ পান বীর জয়াপীড়ের।তাঁর বীরত্ব অভিভূত করেছিল পুন্ড্ররাজকে। কাশ্মীররাজের প্রকৃত পরিচয় জানার পরে নিজের একমাত্র কন্যা কল্যাণীর সঙ্গে বিবাহ দেন। কিছুদিন পরেই জয়াপীড় কাশ্মীর ফিরে যান কল্যাণী ও কমলাকে নিয়ে। কমলা কে তিনি বিবাহ করেছিলেন তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও অতুল সুরের মত ঐতিহাসিকদের মতে,কল্যাণী ও কমলা দুজনকে বিবাহ করেছিলেন জয়াপীড়। তাঁদের নামে জয়াপীড় দুটি নগরী পত্তন করেন কাশ্মীরে। ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রের লেখা থেকে জানা যায়, আজও কমলাপুর ও কল্যাণপুর নামে দুটি নগরীর গ্রাম আকারে ধ্বংসাবশেষ রয়ে গেছে। জয়াপীড় বা কমলা আজ নেই, তাঁদের সত্যমিথ্যে মিশ্রিত জনশ্রুতি ইতিহাসে রয়ে গিয়েছে।।

About Post Author