পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা,২৭ মার্চ : বই-মালিনী অথবা কথামানবী, মল্লিকা সেনগুপ্ত আজ প্রায় একযুগ হল আর নেই।। তবু আজও বড্ড প্রাসঙ্গিক তিনি।২৭ মার্চ মল্লিকা সেনগুপ্তের জন্মদিন।তাঁর জন্মদিনে লেখিকা মল্লিকা সেনগুপ্তকে জানতে হলে প্রবন্ধকার এবং কবি মল্লিকার বাইরে ছুঁয়ে যেতে হবে উপন্যাস লেখিকা মল্লিকাকেও। ছোঁয়ার চেষ্টা করতে হবে তাঁর ভাবনাকে।

বেঁচে থাকলে এদিন ৬৪ বছরে পা দিতেন মল্লিকা সেনগুপ্ত । তাঁর জন্মদিনে তাঁকে নিয়ে আলোচনা করতে হলে তাঁর লেখা দিয়েই শুরু করতে হবে।
“পুরুষের দেহে এক বাড়তি প্রত্যঙ্গ
দিয়েছে শাশ্বত শক্তি, পৃথিবীর মালিকানা তাকে / ফ্রয়েডবাবুর মতে ওটি নেই বলে নারী হীনমন্য থাকে / পায়ের তলায় থেকে ঈর্ষা করে পৌরুষের প্রতি “….
এই লেখাটি পড়ে মনে হতেই পুরুষকে আক্রমণ করছেন মল্লিকা। আদতে তাঁর লেখায় “পুরুষ নয়, পুরুষতন্ত্র” কে বিঁধেছেন লেখিকা। বলে নেওয়া যাক স্বপ্নের সওদাগর মল্লিকা বুঝিয়েছেন,মেয়েরা পুতুলের ভাষায় কথা বলবে না। তিনি এও দেখিয়েছেন- “লড়াইটা শুধু মেয়েদের নয়, লড়াই করতে হলে পুরুষকে পাশে পেতে হবে “।

তাঁর শেষ উপন্যাস ছিল ” কবির বউঠান “। ৫১ বছর বয়সেই তাঁর জীবন খসে পড়েছিল ক্যান্সারের মারণ থাবায়। কেমো নিতে নিতে দুই বিপরীত মেরুর জ্ঞানদানন্দিনী ও কাদম্বরী কে নিয়ে লিখেছেন আর পাশাপাশি সৃষ্টি করেছেন ম্যাজিক রিয়্যালিস্ট চরিত্র ‘ বইমালিনী”। ২০১১ সালে এই বই প্রকাশের পরে আর বিশেষ লেখার সুযোগ পান নি। বইটি প্রকাশের পরে আর চার মাস ছিলেন তিনি।অনেক লেখা বাকি রেখে চলে গেছেন কবি ও লেখক মল্লিকা সেনগুপ্ত।তবুও সমাজবিদ্যার অধ্যাপিকা এবং নারীচেতনা ও নারীবাদের বলিষ্ঠ কবি – লেখিকা দিয়েও তো কম যান নি বাংলা সাহিত্যকে।

আরও পড়ুন :কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় কেন বামপন্থী মতাদৰ্শ থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন?
মল্লিকা সেনগুপ্তের সম্পর্কে মূল্যায়ন তো বহুদিন আগেই করে গেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ” সে নিজে প্রচুর লিখেছে আবার তাঁর সমকালীন কিছু লেখককেও সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছে। কিছু কিছু প্রবন্ধে মল্লিকা নারী জাগরণের পক্ষ নিয়ে যেন লড়াই করেছে প্রতিষ্ঠিতদের সঙ্গে এবং তার একটি দুর্লভ গুন ছিল,প্রবন্ধে সে যতই যুক্তিবাদী হোক না কেন তার কবিতায় কাব্যরসের হানি হতে দেয় নি। সেগুলি পড়লে পড়লে মনে হয় যেন দুটি আলাদা কলমে দু’জন মানুষের লেখা। এ একরকম দুর্লভ ক্ষমতা। ” মল্লিকা সেনগুপ্তের তাঁর প্রবন্ধ বলছেন, “খনা যেদিন বচন লেখা শুরু করলেন সেই মূহুর্ত থেকেই বাঙালি মেয়েদের কবিতা লেখা শুরু, যে খনার খ্যাতি সহ্য করতে না পেরে স্বামী ও শ্বশুর মিলে তার জিভ কেটে নিয়েছিল মধ্যযুগের বাংলায় । বাঙালি ঘরের ছোটবেলায় মা দিদিমার কাছে আমরা সকলে শুনেছি এই কাহিনী, কিন্তু মোলায়েম সেই গল্পকথকের মধ্যে ভয়ঙ্কর ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের আভাসটকুও ছিলনা। আজ সে নিষ্ঠুর কিংবদন্তীর দিকে ফিরে তাকিয়ে ভাবি সেই বোবাকরণ শুধুমাত্র খনার ব্যক্তিগত দূর্ঘটনা ছিলনা বরং তা ছিল বাঙালি মেয়েদের কণ্ঠরোধের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ।
‘পার্সোনাল ইজ পলিটিকাল’ – এর তত্ত্ব দিয়েই মধ্যযুগের সেই ঘটনাকে বুঝে নিতে হবে আমাদের । সেই থেকেই খনা আমাদের বাঙালি কবি লেখক মহিলাদের প্রান্তিকায়নের গোপন প্রতীকি আইকন । সময় পাল্টে গেছে, কিন্তু পোস্টকলোনিয়াল বাঙালি কবি মহিলাদের পাঠ্য খুঁজলে সেই বোবাকরণের রেশ আজও পাওয়া যায় । বাঙালি মেয়েদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় কিভাবে তারা এই ‘শোষণ সম্বন্ধে ও তার বিরুদ্ধে কথা বলার’ প্রক্রিয়ায় জড়িত এবং বাঙালি মেয়েদের কবিতায় সেই প্রান্তিকের প্রতিবাদ কিভাবে উঠে এসেছে, এসব খুঁজে দেখতেই নতুন করে পড়ে দেখছি কবিতা সিংহ, বিজয়া মুখোপাধ্যায়, গীতা চট্টোপাধ্যায়, কৃষ্ণা বসুর কিছু কবিতা আর তার সাথে মিলিয়ে নিচ্ছি আমার নিজের লেখার অভিজ্ঞতাও । প্রান্তিক লিঙ্গের পক্ষ সমর্থনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং প্রান্তিকায়নের কিছু কিছু স্তরকে তুলে ধরার অনিবার্য তাড়ণায় কিছুটা সংকোচ হলেও লজ্জার মাথা খেয়ে নিজের কবিতার দুয়েকটি প্রসঙ্গ….। মেয়েদের যাপিত অভিজ্ঞতার কনটেক্সট ও কথামানবী-ক চেতনা নির্মিত হয়, এই দ্বিমুখি চলনকেই নতুন করে একটু ঝালিয়ে নিতে চাইছি.. ”
ঝালিয়ে নিতে গিয়ে তাই মল্লিকা সেনগুপ্ত ‘অর্ধেক পৃথিবী’ কাব্যগ্রন্থে লেখেন:”
গৃহশ্রমে মজুরি হয় না বলে মেয়েগুলি শুধু / ঘরে বসে বিপ্লবীর ভাত রেঁধে দেবে /আর কমরেড শুধু যার হাতে কাস্তে হাতুড়ি।/ আপনাকে মানায় না এই অবিচার/কখনো বিপ্লব হলে /পৃথিবীতে স্বর্গরাজ্য হবে /শ্রেণীহীন রাষ্ট্রহীন আলোপৃথিবীর সেই দেশে / আপনিই বলুন মার্কস, মেয়েরা কি বিপ্লবের সেবাদাসী হবে? ”
ঝালিয়ে নিতে গিয়ে তাই তিনি স্বাধীনতা উত্তর বাঙালি মহিলারা কেন প্রান্তিক ও ভূমিহারা ছিলেন তার আলোচনা করেছেন। বাংলায় নারীবাদী কবিতার পথপ্রদর্শক কবিতা সিংহ কেন পুরুষ কবিদের গ্যালাক্সিতে সমান আসন পান নি তার উল্লেখ করেছেন। টেনে এনেছেন সারা সুলেরি বা গায়ত্রী স্পিভাক চক্রবর্তীকে। তাঁর চাবুকের মত শব্দবন্ধ ঝরে পড়েছে আমাদের মননে।

আরও পড়ুন :পাবলো নেরুদা : বিশ্বসেরা কবি, বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব
“প্রকৃত নারী স্বাধীনতাকামী” মল্লিকা সেনগুপ্ত ব্যক্তিগত জীবনে ঘর বেঁধেছিলেন কবি সুবোধ সরকারের সঙ্গে।
১৯৯৮ সালে ভারত সরকারের জুনিয়র রাইটার ফেলোশিপ,১৯৯৮ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সুকান্ত পুরস্কার,২০০৪ পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি অনীতা-সুনীল বসু পুরস্কার পাওয়া মল্লিকা সেনগুপ্ত চোদ্দোটি কাব্যগ্রন্থ লিখেছিলেন। এছাড়া তাঁর অন্যতম রচনা- সীতায়ন (যা অপর্ণা সেন সিনেমা বানাতে চেয়েছিলেন ), শ্লীলতাহানির পরে, স্ত্রীলিঙ্গ নির্মাণ। তিনি লিখেছেন বিবাহ বিচ্ছিন্নার আখ্যান যেখানে ৩০ টি উপন্যাস বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন বিবাহ বিচ্ছিন্ন দিনের সমাজে উত্তরণ।
আরও পড়ুন : তৃষিত মরুর কান্তকবি রজনীকান্ত সেন
লেখার মধ্যে দিয়ে ” শিশির হয়ে,রোদ্দুর, সারস হয়ে ‘পৃথিবীতে থেকে যেতে চেয়েছেন মল্লিকা।ক্যান্সারের সঙ্গে মনের জোর নিয়ে তীব্র লড়াই করেছিলেন ‘আমাকে সারিয়ে দাও ভালোবাসা’র লেখিকা। কিন্তু তিনি যে ‘চল্লিশ চাঁদের আয়ু’ নিয়ে এসেছিলেন। তাই তাঁর লেখার মধ্যে তাঁর স্বল্পায়ু ব্যাপ্তি পেয়েছে।

মল্লিকা সেনগুপ্ত তাঁর কথামানবী গ্রন্থে দ্রৌপদী থেকে মেধা পাটেকর বিভিন্ন যুগের মহিলার আখ্যান বর্ণনা করে বলেছিলেন,” মেয়েদের মত ভালোবাসা ছেলেরা শেখে নি।” আর সেই ভালোবাসার জোরে বাঁচতে চাওয়া মল্লিকা সেনগুপ্ত আজ নেই। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, মল্লিকা সেনগুপ্তের শুন্যস্থান পূরণ হওয়ার নয়, “মল্লিকা নেই কিন্তু তাঁর রচনাগুলি আছে এবং থাকবেও বহুকাল।” তাই কথামানবী ও বইমালিনী জানা আমাদের ফুরোয় না,মল্লিকা সেনগুপ্তকে জানা আমাদের ফুরোয় না।।
আরও পড়ুন : এক কবি ও বারাসাতের মৃত্যু উপত্যকা


1 thought on “বই-মালিনী মল্লিকা সেনগুপ্তের জন্মদিনে”