সময় কলকাতা ডেস্ক,১ এপ্রিলঃ ইতিহাসের গায়ে সব সময় লেগে থাকে শিঁকড়ের ঘ্রাণ। সভ্যতা যতই এগিয়ে চলুক, বিজ্ঞানের যতই অগ্রগতি হোক, ইতিহাস সর্বদা শিঁকড়ের পথ বেয়ে অতীতের অস্তিত্বকে স্মরণ করায়। আজ আমাদের ইতিহাসের বিষয়বস্তু এমন একজন ব্যক্তিত্ব যে নিজের দক্ষতা বুদ্ধিমত্তা নিপুণতায় ১১৭৮ সালে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছিলেন। মঙ্গোলিয়ার ওনন নদীর তীরবর্তী তৃণভূমিতে যে কিশোর ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছিল,পরবর্তীতে পৃথিবীর এক দীর্ঘতম সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা তিনি। বিশ্বজয়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষা যার মধ্যে জন্ম দিয়েছিল অদম্য জেদের। সেই জেদের বসবর্তি হয়ে নিজের সম্রাজ্য যেমন গড়ে তুলেছিলেন, তেমনি নিজেকে ইতিহাসের পাতায় প্রতিষ্ঠা করেছেন এক রক্ত পিপাসু ,ক্ষমতালোভী অত্যাচারী শাসক হিসেবে।

যার কথা বলছি তিনি হলেন চেঙ্গিস খান। সারা পৃথিবীর কাছে তিনি পরিচিত চেঙ্গিস খান নামে। তবে এটি তার আসল নাম নয়, তার প্রকৃত নাম তেমুজিন। তেমুজিন নামটি এসেছে মোঙ্গল শব্দ তেমুর থেকে। তেমুর কথার অর্থ হল লোহার তৈরি আর জিন শব্দের অর্থ কর্তৃত্ব। তেমুজিন কথার অর্থ লৌহ কার। তেমুজিন মোট ৬ ভাই বোন ছিল। তেমুজিনের বাবার প্রথম পক্ষের স্ত্রীর তিন ছেলে এক মেয়ে আর দ্বিতীয় পক্ষের ছিল দুই সৎ ভাই। হাসার হাচিউন, তেমুগে এবং বোন তেমুলেন আর দুই সৎ ভাই বেগতের ও বেলগুতেই। ইতিহাসবিদদের তথ্য অনুযায়ী চেঙ্গিস খানের জন্ম হয়েছিল ১১৬২ সালে মঙ্গোলিয়া এবং সাইবেরিয়ার বর্ডার এর কাছে একটি এলাকায়। মঙ্গোলিয়ার তৃণচারণভূমির খেনতি পর্বতমালার অন্তর্গত বুুরখান খালদুন পর্বতের খুব কাছেই ছিল দেলুন বলখাদ নামের একটি জায়গা। সেই জায়গাকেই চেঙ্গিস খানের জন্মস্থান হিসেবেই পরিগণিত করেছেন ইতিহাসবিদরা। চেঙ্গিস খানের পিতা ছিল স্থানীয় একটি জনজাতির গোত্রপতি। স্বভাবতই অভিজাত রক্ত ছিল চেঙ্গিস খানের শরীরে। তৎকালীন সময় মঙ্গোলিয়ার রীতি অনুযায়ী অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হতো কিশোরদের। আর সেই রীতি মেনেই বোর্তে নামের এক অল্প বয়সী নাবালিকার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তেমুজিনের।

তৎকালীন সময়ে মঙ্গোলিয়ায় লক্ষ লক্ষ কিলোমিটার দূরে রাজত্ব করতেন একাধিক জনজাতিগোষ্ঠী। প্রতিনিয়ত তাদের মধ্যে সংঘাত- যুদ্ধ লেগেই থাকত। না ছিল কোন নিয়মকানুন ,না ছিল সামগ্রিক ঐক্য। এই একাধিক জনজাতি গোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে লড়াকু এবং যুদ্ধে পারদর্শী ছিলেন তাতাররা। তাতারদের আক্রমণে মাঝে মাঝেই একাধিক জনজাতিকে তার নিজ বাসস্থান ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হতো। আরি তাতাররাই ছিল চেঙ্গিস খানের বাবার সবচেয়ে বড় শত্রু। মোঙ্গল জনজাতিগোষ্ঠীর তথ্য অনুযায়ী ঘোড়ার দুধে বিষ মিশিয়ে চেঙ্গিসের বাবাকে হত্যা করেছিল তাতাররা। পিতার মৃত্যুর পর চেঙ্গিস তার পরিবার সমেত তাদের গোষ্ঠীর থেকে বিতাড়িত হন। বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছে তাড়া খেয়ে অনেকটাই পরিণত হয়েছিল চেঙ্গিস। বলা হয় সেই সময়টাই তার জীবনে ছিল সবচেয়ে কঠিন সময়। সেই কঠিন সময় শৈশবের সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে নিজে কে মজবুত গড়ে তুলেছিল তেমুজিন। যে সময়ে সে লড়াই করে তেমুজিন থেকে চেঙ্গিস হয়ে ওঠে। পিতার মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল ১৪ বছর। তেমুজিনের ভালোবাসা তার স্ত্রী বোর্তেকে তুলে নিয়ে যায় তার বাবার শত্রুরা। সেই সময় নিজের পত্নীকে উদ্ধার করার জন্য তার পিতার বন্ধু তুঘরুল খানের শরণাপন্ন হয়। চেঙ্গিস সাহায্য চায় তার নিজের রক্তের ভাই জমুখার কাছে। তুঘরুল খান ছিল সেই সময় অন্যান্য দলপতিদের থেকে অনেকটাই শক্তিশালী। তুঘরুল ও জমুখার সহযোগিতায় অবশেষে উদ্ধার হয় বোর্তে। ভূতনিকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার কিছুদিন পরেই বোর্তের গর্ভে জন্ম নেয় চেঙ্গিসের বড় ছেলের জোচি। তারপর থেকেই কার্যত চেঙ্গিস খান হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য।তুঘরুল ও জমুখার সহযোগিতায় দিনে দিনে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠে চেঙ্গিস। তৎকালীন সময়ে বংশপরিচয় যাদের উচ্চ তারাই সুযোগ পেতেন সেনাবাহিনীর উচ্চপদে।

কিন্তু চেঙ্গিস তার সেনাবাহিনীতে সুযোগের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিতেন যোগ্যতাকে। ফলে তার সেনাবাহিনীতে সুযোগ্য সেনাপতিদের সংখ্যা বাড়তে থাকে আর সেটাই হয়ে ওঠে চেঙ্গিস আর জমুখার মধ্যে বিরোধের কারণ। কয়েক বছর ধরে এই দুজনের সংঘাত লেগেই ছিল। উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর সাম্রাজ্য দখলের লোভে একের পর এক গোষ্ঠী দখল করতে থাকে চেঙ্গিস। মঙ্গোলিয়ার স্তেপ তৃণভূমি কার্যতা দখলে চলে আসে চেঙ্গিসের। ১২০৬ সালে জুমাখার দলের লোকেরাই তার সঙ্গে বেইমানি করে জুমাখাকে তুলে দেয় চেঙ্গিসের হাতে। জুমাখার দলের যে সেনাপতিরা বেইমানি করে চেঙ্গিস খানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ছিল পরবর্তীতে সেই সকল সেনাপতিকে ফুটন্ত জলে সিদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন চেঙ্গিস খান। কারণ চেঙ্গিস খান মনে করতেন বেইমানি হল সবচেয়ে বড় অপরাধ যে অপরাধের কোন ক্ষমা নেই। পরবর্তীতে জুমাখারকে হত্যা করেন চেঙ্গিস। যদিও বহু ইতিহাসবিদের মতে জুমাখার কে হত্যা করতে চাননি চেঙ্গিস জুমাখার নিজেই চেয়েছিলেন পরাজয়ের গ্লানি মাথায় নিয়ে বেঁচে থাকার অর্থ হয় না ,তাই মৃত্যু চেয়েছিলেন। জুমাখার মৃত্যু এবং জুমাখার সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের পর, কার্যত সমস্ত গোষ্ঠী পরাজয় স্বীকার করেন চেঙ্গিস খানের কাছে তখন থেকেই একছত্র আধিপত্য বিস্তার হয় চেঙ্গিসের। তখন থেকে শুরু হয় চেঙ্গিস খানের জীবনের স্বর্ণযুগ।

আফগানিস্তান থেকে ভারতের পাঞ্জাব পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন চেঙ্গিস খান। তিনি একের পর এক চীন ভারত ইউরোপ এশিয়ার প্রায় এক কোটি বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে তার সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। তার জীবনের উল্লেখযোগ্য জয় ,জিয়ান সাম্রাজ্য দখল। ১২১১ সালে এই জিয়ান সাম্রাজ্য দখল করেন চেঙ্গিস তারপরেই ১২১৫ সালে দখল করে ঝিয়া সাম্রাজ্য। বারোশো কুড়ি সালে খোয়ারেজেম সাম্রাজ্য দখল করে আফগানিস্তান হয়ে পাঞ্জাব প্রদেশ পর্যন্ত চলে আসে চীন দেশের সেনাবাহিনী। একের পর এক সাম্রাজ্য দখল করতে করতে চেঙ্গিস খান পৌঁছে যায় ইউক্রেন পর্যন্ত। অবশেষে রাশিয়া জয় করে চেঙ্গিস খান। চেঙ্গিস খানের জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য তার মৃত্যু। ১২২৭ সালে মৃত্যু হয় অর্ধেক পৃথিবীর সম্রাট চেঙ্গিস খানের। চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর পর তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় পরিজনেরা তার সমাধি ক্ষেত্র কোন এক অজানা গোপন জায়গায় লুকিয়ে রাখে ।যা আজও লোক চক্ষুর অন্তরালে। বহু ইতিহাসবিদ গবেষক দিনের পর দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করেও আজও উদ্ধার করতে পারেনি চেঙ্গিস খানের সমাধি ক্ষেত্র। মনে করা হয় বহু ধনরত্ন সমেত সমাধিস্থ করা হয়েছিল চেঙ্গিস খানকে ফলে চেঙ্গিস খানের সমাধিক্ষেত্র খোঁজার জন্য আজও বহু মানুষ গবেষণা করে চলেছেন।

চেঙ্গিস খান যেমন ছিলেন এক পরাক্রমী পারদর্শী কূটনীতিবিদ মহাবলশালী এক রাজা তেমনি ছিলেন নিষ্ঠুর ক্রুর নিশংস এক রাজা। যার নৃশংসতার কাহিনী আজও লোকমুখে প্রচলিত।। কোন রাজ্য বা শহর জয় করার জন্য যে নিশংসতার আশ্রয় অবলম্বন করতেন চেঙ্গিস, তা ইতিহাসের পাতায় এক কালো অধ্যায়। প্রথমে শহরের সমস্ত মানুষকে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দিতেন সেই নির্দেশ কার্যকর না হলে সেই শহরকে অবরুদ্ধ করে অনাহারে রাখার ব্যবস্থা করতেন চেঙ্গিস। তারপরেই অতর্কিতে আক্রমণ করে চালাতেন গণহত্যা। যদিও মঙ্গলিয়ায় আজও কিছু জনগোষ্ঠী চেঙ্গিস খানকে তাদের বীর হিসেবে পুজিত করেন কিন্তু ইতিহাসে চেঙ্গিস খান মূর্তিমান বিভীষিকার প্রতিবিম্ব হয়েই রয়েছে।


More Stories
ভারতরত্ন সম্মান : ইতিহাস ও বিতর্ক
“ইতিহাসের পাতা থেকে” কালজয়ী : সাহিত্যের মণিমুক্তো
স্বামী বিবেকানন্দের মা বীর জননী আখ্যা পেয়েছিলেন, কিন্তু কার জন্য? জানেন কি?