Home » এবার আইপিএলে কামব্যাক ঘটানো প্রবীণ ত্রয়ী

এবার আইপিএলে কামব্যাক ঘটানো প্রবীণ ত্রয়ী

স্পোর্টস ডেস্ক,সময় কলকাতা,৩১ মেঃ ১৬ তম আইপিএল শেষ। এবারের আইপিএলে বেশ কিছু দেশি- বিদেশি ক্রিকেটার উঠে এসেছেন শিরোনামে। এঁদের মধ্যে যেরকম বেশ কিছু বিদেশি ক্রিকেটার নজর কেড়েছেন, তেমনই ভারতীয় ক্রিকেটারদের অনেকে চোখে পড়েছেন। বেশ কিছু উঠতি তরুণ খেলোয়াড়ের পাশাপাশি কয়েকজন অভিজ্ঞ ও প্রবীণ ক্রিকেটার তাঁদের অসামান্য পারফরমেন্স দিয়ে বেশ কিছু ম্যাচের নির্ধারক খেলোয়াড় বা কি প্লেয়ার হয়েছেন এবং ধারাবাহিকভাবে চোখে পড়েছেন। এই প্রবীণ তারকাদের কেউ এবারের আইপিএল খেলে আবার ভারতীয় দলে ফিরেছেন, কেউ কেউ এখনও ভারতীয় দলে ফিরে না এলেও আবার সুযোগ পেলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। এই সাড়া জাগানো, প্রত্যাবর্তন ঘটানো, বা ভারতীয় দলে ফেরার অপেক্ষায় যারা রয়েছেন, তাঁরা আইপিএলে কি করেছেন সেদিকে চোখ রাখা যাক। এরা আইপিএলে  কামব্যাক  প্রথম মরশুমে খেললেও অতীতে এরকম সময় গিয়েছে যখন দল পান নি আবার দল পেলেও সুযোগ পান নি। এবার তাঁদের পুনরুত্থান ঘটেছে। এবারের পারফরম্যান্স তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ পারফরম্যান্স হয়েই দেখা দিয়েছে।

প্রথমেই বলতে হবে আজিঙ্কা রাহানের কথা। টেস্ট ও টি টোয়েন্টি দুটি আলাদা ফরম্যাট হলেও কিন্ত ক্রিকেটিয় নৈপুণ্য প্রয়োজন দুটি ক্ষেত্রেই। বিগত সময়ে টেস্ট ক্রিকেটে বেশ কিছু কার্যকরী ইনিংস খেলা আজিঙ্কা রাহানে একটা সময় ভারতীয় দলের অপরিহার্য ক্রিকেটার ছিলেন। অস্ট্রেলিয়ায় তরুণ একটি ভারতীয় দলের নেতৃত্বে ছিলেন রাহানে এবং তার ক্যাপ্টেনসি চোখে পড়ে। অতঃপর খারাপ ফর্মের কারণে ভারতীয় দল থেকে বাদ পড়ে যান। আইপিএলে প্রথম দুটি মরশুম খেললেও ২০১০ সালে দল পাননি প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক ও মিডল অর্ডার ব্যাটার আজিঙ্কা রাহানে। বিগত আইপিএল গুলিতে দুটি শতরান সহ ৪০০০-এর বেশি রান করা আজিঙ্কা রাহানে দ্রুত রান করার জন্য কোনও কালেই খ্যাত ছিলেন না বরং তাঁকে টেকনিক্যলি সলিড ব্যাটার বলা হত। তার স্ট্রাইক রেট ১২৩ অর্থাৎ প্রতি ১০০ বলে ১২৩ রান করে তিনি করেছেন।

আরও পড়ুন   প্রতারণা চক্রের কবলে সর্বস্বান্ত ভারতীয় ফুটবলের বাবলু দা

২০২১ ও ২০২২ সাল মিলিয়ে সর্বসাকুল্যে ৯ টি ম্যাচে সুযোগ পান, রানও করেন সবমিলিয়ে মাত্র ১৪১। স্ট্রাইক রেট ছিল খুব করুণ এবং ১০০-র আশেপাশে। এবার সেই আজিঙ্কা রাহানে হয়ে ওঠেন অতি মানব। ১৪ টি ম্যাচের ১১ ইনিংস খেলে ৩২৬ রান করেছেন ১৭২-এর স্ট্রাইক রেটে। আইপিএলে তিনি প্রমাণ করেছেন তিনি আবার ফর্মে ফিরেছেন স্বমহিমায়। নির্বাচকরা তাকে আবার ফিরিয়েছেন টেস্ট দলে। মোটামুটি নিশ্চিত যে জুন মাসে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে তাঁকে দেখা যাবে ভারতীয় দলের হয়ে মাঠে নামতে। কারণ একটাই, আইপিএলে চেন্নাইকে চ্যাম্পিয়ন করার পেছনে তার অবদান প্রভূত ও অনস্বীকার্য। ফাইনালেও তাঁর করা ১৩ বলে ২৭ রানের ইনিংসটি ছোট হলেও হয়ে থেকেছে প্রভাবশালী। দ্বিতীয় নামটি মোহিত শর্মা। গুজরাট টাইটান্সের হয়ে চেন্নাইয়ের বিপক্ষে ফাইনালের ফাইনাল ওভার বল করতে এসে প্রথম চার বলে তিন রান খরচ করে মোহিত শর্মা ম্যাচ প্রায় গুজরাট দলের অনুকূলে টেনে নিয়ে যান। শেষ দু বলে ছয় ও চার মেরে রবীন্দ্র জাদেজা চেন্নাইকে ম্যাচ ও ট্রফি জেতালেও কোনওভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না এবার আইপিএলে গুজরাটের হয়ে মোহিত শর্মার ভূমিকা।

এবারের আইপিএলে ১৪ ম্যাচে ২৫ টি উইকেট পেয়েছেন। সেরা বোলিং ১০ রানে ৫ উইকেট। গত বছর আইপিএলে সুযোগ না পেয়ে, দল না পেয়ে, গুজরাট টাইটান্স দলের নেট বোলার হিসেবে মোহিত শর্মাকে দেখা গিয়েছিল। এতে ক্রিকেটপ্রেমীরা হতাশ হলেও তিনি নেটেও নতুন করে নিজেকে তৈরি করেছেন। তিনি মনে করেন যে তিনি শিখে চলেছেন, এমনকী নেট বোলার হিসেবেও শিখেছেন। তিনি আরও বলছেন, আজও তিনি নিজেকে বিগিনার বা শিক্ষার্থী মনে করেন। জাতীয় দলের হয়ে শেষবার তাঁকে দেখা গিয়েছে ২০১৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। টেস্ট দলে কখনও ভাবা হয়নি ভারতের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পেসার কপিলদেবের রাজ্য হরিয়ানার এই বোলারকে। দশ বছর আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে শুরু করেছিলেন মোহিত। ২০১৩ সালে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে এক দিবসীয় ম্যাচে অভিষেক লগ্নে ঐতিহাসিক কাণ্ড ঘটান মোহিত। ২৪ বছরের মোহিত ১০ ওভারে ২৬ রান দিয়ে ২ উইকেট পেয়ে ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ নির্বাচিত হন।

ভারতীয়দের মধ্যে ব্যাটসম্যান সন্দীপ পাতিল ছাড়া এমন নজির আর ছিল না । সেই থেকে ২৬ টি একদিনের ম্যাচে ৩১ উইকেট পান মোহিত। পাশাপাশি বাংলাদেশে হওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দলে সুযোগ পান। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচেই নজর কাড়েন তিনি। বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল ও ফাইনালে ভারতীয় দলেও ছিলেন তিনি। ফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ভারত হেরে গেলেও ২ ওভারে ১৮ রান দিয়ে ১ টি উইকেট পেয়েছিলেন তিনি। শ্রীলঙ্কা ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই তাঁর প্রথম বলেই কুশল পেরেরাকে আউট করে আশা জাগিয়েছিলেন মোহিত। সেই মোহিত আচমকাই যেন হারিয়ে যান। আট বছর জাতীয় দলে নেই। তবে কিছু বিষয় প্রমাণ করার জন্য এবার আইপিএলকে তিনি বেছে নিয়েছিলেন। বেছে নিয়েছিলেন বোঝানোর জন্য। তাঁর স্লোয়ার ও বলের ভেরিয়েশন, ডেডিকেশন দিয়ে বুঝিয়েছেন তিনি এখনও ভারতীয় দলে খেলার যোগ্যতা রাখেন।

আরও পড়ুন    গুজরাতির ব্যাটে শেষ গুজরাট জয়, পঞ্চমবারের জন্য ভারতীয় ক্রিকেটের সেরা ধোনি ব্রিগেড

আরেকটি নাম পীযুষ চাওলা। মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স দলের হয়ে নিজের সেরাটুকু উজাড় করে দিয়েছেন পীযুষ। গত বছরে আইপিএলে দলই পাননি পীযুষ, ধারাভাষ্যকার হিসেবে কাজ করেছিলেন। কিন্তু ছেলের ইচ্ছেই পীযুষ চাওলাকে নতুন করে ক্রিকেট নিয়ে ভাবতে শেখায়, আইপিএলে মুম্বাই দলের সুযোগ পেয়েই উজাড় করে দিয়েছেন, আর তাই আইপিএলের প্রথম বছরে তাঁর ১৫ ম্যাচে ১৭ উইকেট পাওয়ার রেকর্ড ১৫ বছর পরে ভেঙে দিয়েছেন পীযুষ। এবছর আইপিএলে ১৬ টি ম্যাচে পীযুষ চাওলার সংগ্রহ ২২টি উইকেট। রশিদ খান বা সুনীল নারিনের মত স্পিনাররা যেখানে মার খাচ্ছেন, সেখানেও এবারের টুর্নামেন্টে ওভার পিছু রান পীযুষ দিয়েছেন ৮.১১।

এবারের টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পরে আইপিএলে সর্বমোট ১৮০ টি উইকেট তাঁর ঝুলিতে। আইপিএলের সবচেয়ে বেশি উইকেট প্রাপকদের তালিকায় তাঁর নাম তিন নম্বরে । তিনটেস্টে সাত উইকেট আর পঁচিশটি একদিনের ম্যাচে বত্রিশটি উইকেট পাওয়া পীযুষ বিশ্বকাপ জয়ী টি টোয়েন্টি স্কোয়াডে থাকলেও আন্তর্জাতিক টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে সেভাবে সফল হন নি। সাতটি টি টোয়েন্টি ম্যাচ খেলে উইকেট পেয়েছেন চার। পড়ন্ত বেলায় তবুও আইপিএলে কুড়ি ওভারের ফর্মাটে ফুল ফোটাচ্ছেন পীযুষ। তিনি যখন বল হাতে তুলে নেন, তিনি দেখতে পান সাগ্রহে তাঁর সাফল্যের দিকে তাকিয়ে আছে তাঁর কিশোর পুত্র। এরকমই কোনও কোনও তাগিদ বা অনুপ্রেরণা তাঁদের জাগিয়ে তুললেও প্রবীণ ও অভিজ্ঞ প্লেয়াররা বুঝতে পেরেছেন ক্রিকেটকে এখনও তাদের অনেক কিছু দেওয়ার আছে। ভারতীয় ক্রিকেট সমৃদ্ধ হচ্ছে এই প্রবীণ এবং অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের অবদানে। এবারের আইপিএলে প্রবীণ ত্রয়ী ক্রিকেটারের কাম ব্যাক ভারতীয় ক্রিকেটের পক্ষে বড় প্রাপ্তি।

About Post Author