পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা , ১৬ জুন :ইতিহাস সবকিছু লিখে রাখে, লিখে রাখে প্রেম, বিরহ, দ্বন্দ্ব , ইতিহাস লিখে রাখে রক্তপাতের কথা। ইতিহাস কিছুই লিখে রাখতে ভোলে না। ইতিহাস মহাপুরুষ দের পাশাপাশি দুর্বৃত্ত কথা লিখে রাখে।লিখে রাখে নিপীড়িত আর নিপীড়ক, অত্যাচারিত ও অত্যাচারীদের কথা। লিখে রাখে অপরাধ ও অপরাধীদের কথা। বিশ্বের সত্যিকারের ক্রাইম কাহিনীর খাতায় বেশ বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকবেই যে অপরাধীদের নাম তাদের মধ্যে অন্যতম চার্লস শোভরাজ। মূলত সিরিয়াল কিলার হিসেবে কুখ্যাত চার্লস শোভরাজ ও তার রাইট হ্যান্ড বলে পরিচিত অজয় চৌধুরীকে ঘিরে অন্ধকার জগতের একটি বিরাট বৃত্ত দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থেকেছে যে কর্মকান্ডের বেশ কিছুটা সংঘটিত হয়েছে ভারতের বুকে।

সিরিয়াল কিলার চার্লস শোভরাজের অপরাধের ইতিহাস আদিঅন্তহীন।খলনায়ক শোভরাজের দুস্কর্মের খতিয়ানেরও যেন শেষ নেই। অথচ শোভরাজের জীবন কল্পজগতের রূপকথা হয়ে উঠেছে। তার অপরাধের আলোচনায় পাতার পর পাতা লেখা হয়েছে। সিরিয়াল কিলার, সার্পেন্ট, বিকিনি কিলার নামে পরিচিত চার্লস শোভরাজ নিশ্চিতভাবে বারোটি খুন করে। এই সংখ্যা তিরিশটি বা বেশিও হতে পারে । মূলত সত্তরের দশকেই অধিকাংশ হত্যালীলা সংঘটিত করে শোভরাজ ও তার বাহিনী।একাজে ছিল তার একাধিক সঙ্গী যার মধ্যে নৃশংসতার কারণে উল্লেখযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত অজয় চৌধুরী।মূলত এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে হত্যালীলা চালানো শোভরাজের পরিচিতি ছিল বিকিনি কিলার হিসেবেও । সুদর্শন শোভরাজের রক্তে ছিল অপরাধ। মহিলাদের আকর্ষণ করার সাবলীল ক্ষমতা ছিল তার। ‘ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড’ রুপী শোভরাজ মহিলা ও বিদেশী পর্যটকদের সর্বস্বান্ত করে অবলীলায় খুন করত । হিপিদের দিকেও তার নজর পড়ত প্রায়শই। পুলিশের চোখে ধুলো দিতে সিদ্ধহস্ত ছিল এই ডাকাবুকো অপরাধী।টাকা, পাসপোর্ট ছিনতাই করে শিকারকে প্রাণে বাঁচিয়ে রাখত না শোভরাজ। ৭৯ বছর বয়সী শোভরাজ নেপালের জেলে দীর্ঘ কারাবাসের সাজা কাটিয়ে কয়েকমাস আগে মুক্তি পেয়েছেন ।
২০২২ সালের ২১ ডিসেম্বর , নেপালের সুপ্রিম কোর্ট ১৯বছর কারাভোগের পর তার বার্ধক্যের কারণে তাকে কারাগার থেকে মুক্তির আদেশ দেয়।তাকে ১৫ দিনের মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয় ।২৩ ডিসেম্বর তিনি তার বয়সজনিত কারণ এবং সুভদ্র ও সুন্দর আচরণের কারণে কারাগার থেকে মুক্তি পান।
তাকে ফ্রান্সে নির্বাসিত করা হয়েছিল এবং কমপক্ষে ১০ বছরের জন্য নেপালে ফিরে যেতে পারবেন না। ইদানীং তিনি প্যারিসে আছেন।
কিন্তু কি হল তাঁর অতীতের দুস্কর্মের সঙ্গীদের?শোভরাজ তিনটি নন-ফিকশন বইয়ের বিষয় হয়েছিলেন, থমাস থম্পসনের ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত সার্পেন্টাইন , ১৯৮০ সালে রিচার্ড নেভিল এবং জুলি ক্লার্কের দ্য লাইফ অ্যান্ড ক্রাইমস অফ চার্লস শোভরাজ, এবং “দ্য বিকিনি মার্ডারস ” শিরোনামের লেখা যা ১৯৮২ সালে ইন্টারপোলের গ্রেট কেস যা রিডার্স ডাইজেস্টের কালেকশন।
নেভিল এবং ক্লার্কের বইটি একটি টিভির জন্য তৈরি করা চলচ্চিত্র, শ্যাডো অফ দ্য কোবরার ভিত্তি ছিল।২০১৫ হিন্দি ফিল্ম ম্যায় অউর চার্লস, প্রওয়াল রমন এবং সিজনৌর নেটওয়ার্ক পরিচালিত,এবং নতুন দিল্লির তিহার জেল থেকে চার্লস শোভরাজের পালানোর উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।দ্য সার্পেন্ট নামে একটি আটটি এপিসোডের বিবিসি-কমিশন মিনিসিরিজ ২০২১ সালের জানুয়ারিতে সম্প্রচার করা হয়েছিল, তাহার রহিম এখানে শোভরাজ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, ২০২১ সালের এপ্রিলে নেটফ্লিক্স এটি দেখায়।তবে শোভরাজের আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়েছে এবছর ফেব্রুয়ারী মাসে যার নাম “মই লে সার্পেন্ট “। সবমিলিয়ে এক অপরাধ জগতের এক ঐতিহাসিক চরিত্রে পরিণত হয়েছে চার্লস শোভরাজ।
চার্লস শোভরাজের নাম বললে তার অধিকাংশ দুস্কর্মের সঙ্গী অজয় চৌধুরীর নাম উঠে আসতে বাধ্য। যাই হোক সংক্ষেপে চোখ রাখা যাক শোভরাজের ঠিকুজি কুষ্ঠিতে।শোভরাজের জন্ম ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটিতে। ১৯৪৪ সালের এপ্রিল মাসের ৬ তারিখে অর্থাৎ ৭৯ পেরিয়ে ৮০ বছরে পা রেখেছে বর্তমানে অশক্ত শরীরের এই ঘাতক তথা অজস্র হত্যার মাস্টারমাইন্ড।তার বাকি সবকিছুর মতই জন্ম বৃত্তান্ত ও পিতা মাতার পরিচয়েও রয়েছে অসাধারণত্ব এবং কিছুটা অস্বাভাবিকত্ব। প্রকৃত নাম হাতচাঁদ ভাবনানি গুরমুখ শোভরাজ। তার পিতা ছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভুত , মা থাইল্যান্ডের অধিবাসী। বাবা মার অশান্ত দাম্পত্য জীবন তাকে অল্প বয়সেই বহির্মুখী করে তোলে। ফরাসি নাগরিকত্বর অধিকারী চার্লস কালক্রমে অপরাধের পাকেচক্রে জড়ায় ।অজস্র কাহিনী জন্ম নিয়েছে চার্লস কে ঘিরে। কিন্তু তার দুস্কর্মের সঙ্গীদের সম্পর্কে রয়েছে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব।সেভাবে কেউ সেভাবে কিছুই জানে না। শত্তরের দশকে শোভরাজের অধিকাংশ খুনকে যে বাস্তবে রূপ দিত সেই সঙ্গী অজয় চৌধুরী আচমকাই যেন উবে যায়। অজয় চৌধুরীর সম্পর্কে শোনাও যায় না আর কিছু। কোথায় গেল সেসময় শোভরাজের সঙ্গে থেকে নৃশংস হত্যাকান্ডে জল্লাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ অজয় চৌধুরী?

সাপের মত গতিবিধি ছিল নায়কোচিত চেহারার শোভরাজের,তাই তাকে ‘দি সার্পেন্ট’ বলা হত। কিন্তু বলা হয় শোভরাজ নিজে অপরাধ করত না, শোভরাজ তৈরি করত যাবতীয় ব্লু প্রিন্ট আর অপরাধের রূপায়ণ ঘটাত অন্যরা। জেল ভেঙে পালানো যেন তার কাছে ছিল জলভাত। ১৯৮৬সালে সঙ্গীর জন্মদিন পালন করার নাম করে মিষ্টি ও ফলে চেতনানাশক দ্রব্য মিশিয়ে কারারক্ষীদের অচেতন করে তিহার জেল থেকে সে পালায়।এখানেও এক বিদেশি অভিযুক্ত ছিল শোভরাজের যাকে সামনে রেখে সে পালায়। ফেলিক্স ডেসকোয়েনকে নিয়ে অল্প বয়সে ছোটমাপের অপরাধ সংগঠিত করত শোভরাজ। তার প্রথমা স্ত্রী চান্তাল ও তার অপরাধ কর্মে সঙ্গিনী ছিল। নেটফ্লিক্স সিরিজ ‘দ্যা সারপেন্ট’-এ দেখা গেছে ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া সহ তার সঙ্গী ছিল মারি আন্দ্রে লেকলর্ক ও অজয় চৌধুরী। এদের বাস্তবেও অস্তিত্ব ছিল বলে মনে করা হয়। ক্যান্সারে ১৯৮৪ সালে মারির মৃত্যু হয়। অজয় চৌধুরীর ইতিহাস আজও রহস্যাবৃত।
অজয় চৌধুরীর কি বাস্তবে অস্তিত্ব ছিল? শোভরাজ ভারতের জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ৯৭ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরলেও নেপালে গিয়ে ধরা পড়ে। সেখানে তার নামে ছিল একাধিক খুনের অভিযোগ। আমৃত্যু কারাবাসের সাজা হয় শোভরাজের। তদন্তের সময় নেপাল থেকে সেসময় তল্লাশি শুরু হয় এক ভারতীয়র সন্ধানে।শোভরাজের সে সময়ের সঙ্গী হওয়ায় মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত ছিল সে। প্রকৃত অর্থেই সত্তরের দশকে শোভরাজের ডান হাত ছিল অজয়।জানা গেছে দিল্লির বাসিন্দা ছিল অজয় চৌধুরী। ভারতে তার সঙ্গে শোভরাজের আলাপ হয়েছিল বলা হলেও তা নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না। তবে তথ্য- অনুসন্ধান করে এবং গার্ডিয়ান সহ বিদেশী বহু পত্র পত্রিকার গবেষণার ভিত্তিতে বলা যায় শোভরাজ পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড চূড়ান্ত রূপায়ণ ঘটাত অজয় চৌধুরী । তথ্য প্রমাণ লোপাট করতে হত্যার পরে নিহতকে পুড়িয়ে বিকৃত করে দিত অজয় চৌধুরী।
সম্প্রতি ওয়েব সিরিয়ালে অজয় চৌধুরীকে মালয়েশিয়াতে চার্লস শোভরাজ ছেড়ে চলে যায় এরকমটাই দেখালেও তার পরে বিদেশে দেখা যায় নির্মম ও নিষ্ঠুর অজয় চৌধুরীকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী,১৯৭৬ সালে দেখা গেছিল অজয় চৌধুরীকে। সেবছর শেষবার জার্মানির ফ্রাঙ্কফুটে দেখা যায় শিহরণ জাগানো এই খুনেকে । তারপরে কর্পূরের মত উবে যায় চার্লস শোভরাজের সঙ্গী জল্লাদ অজয় চৌধুরী।তার শেষ ইতিহাস আজও অজানা।তিনি যেন হাওয়ায় উবে গিয়েছেন কর্পূরের মত।নেপালের কারাগারে মুক্তির পরে ইদানীং ফ্রান্সে থাকা শোভরাজ “মই লে সার্পেন্ট ” নামের আত্মজীবনী পর্যন্ত লিখে ফেলেছেন। একাধিক ফরাসি শোতে তাঁকে দেখা গেলেও আইনজ্ঞকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বয়ান দিয়ে থাকেন। হাবে ভাবে এখনও বনেদিয়ানা কমে নি ছিটেফোঁটা। তিনি যে অদ্বিতীয়- ৮০ বছরে এসেও তা বারবার প্রমাণ করে চলেছেন শোভরাজ।


More Stories
মোথাবাড়ি কাণ্ডের অশান্তির নেপথ্য “খলনায়ক” মোফাক্কেরুল ইসলাম গ্রেফতার কিসের ইঙ্গিত?
পাটুলিতে শুট আউট, নিহত যুবক
যোনিমুখে বীর্য নিক্ষেপই ধর্ষণের মাপকাঠি নয়, জানাল আদালত