সময় কলকাতা ডেস্ক : ইংরেজ চক্রান্তে রাজ্যহারা অযোধ্যার শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহকে নিয়ে কাহিনীর শেষ নেই। কবিতা ও সঙ্গীতপ্ৰিয় নবাবকে ইতিহাস ভোলে নি। সুর যন্ত্রসঙ্গীতের মেলবন্ধনে এক মায়াময় নগরী গড়ে তুলেছিলেন তিনি।বাস্তব হল তিনি ছিলেন ভাগ্যের হাতে আহত এক শিল্পী যাঁর গৌরব মানুষের হৃদয়ে অক্ষয় থেকে গিয়েছে যুগযুগ ধরে। তিনি শতরঞ্জ কে খিলাড়ি নন, হয়ে উঠেছিলেন দাবার বোড়ে মাত্র।সিপাহী বিদ্রোহের পর লখনউ থেকে ওয়াজিদ এসে উঠেছিলেন কলকাতা সংলগ্ন মেটিয়াবুরুজে। তবুও মুক্তি মেলে নি তাঁর।ওয়াজেদ আলি শাহকে আটক করা হয় ফোর্ট উইলিয়ামে। তবুও ওয়াজিদ আলি শাহকে কিছুতেই রোখা যায় নি। তাঁর শিল্পীসত্তা, তাঁর সংবেদনশীল ও উদার চরিত্রর জুড়ি আজও মেলে না। তিনি মেটিয়াবুরুজ কে করে তুলেছিলেন আরেকটি লখনউ।কৃষ্টি, রুচি, সংস্কৃতির অপর নাম ওয়াজিদ আলি শাহ।
আমজাদ আলি শাহের পরে ১৮৪৭ সালে অযোধ্যার সিংহাসনে বসেছিলেন ওয়াজিদ আলি শাহ। ওয়াজিদ আলি শাহ তখন পঁচিশ বছরের তরুণ। নিজে লিখতে পারতেন, লেখক ও গুণীদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।১৮২২ সালের জুলাই মাসে জন্ম তাঁর।যখন ওয়াজিদ আলি নবাব হন নি তিনি তখন ১৮৪৩ সালে ভাই সিকন্দর হাসমতের সম্মানে এক জলসার আয়োজন করেন ওয়াজিদ আলি। ওয়াজিদ স্বরচিত নাটক ‘রাধা কানহাইয়া কা কিস্যা ’ মঞ্চস্থ করেন। এই নাটকটিকে বলা হয় প্রথম আধুনিক উর্দু নাটক।বলা হয়,গোপিনীদের সঙ্গে কৃষ্ণের লীলা নবাবের চিরকালীন অনুপ্রেরণা ছিল। কৃষ্ণের রাসলীলা থেকেই লখনউয়ে ‘রহস’-এর সৃষ্টি। ওয়াজিদ আলির রহস আদতে অপেরা বা থিয়েটার , এই মাধ্যমে তিনি ব্রজ অঞ্চলে কৃষ্ণের জীবন নিয়ে প্রচলিত নৃত্যের সঙ্গে নিজস্ব কত্থকের ঘরানা ও লেখনী মিলিয়েছিলেন।আর এজন্যই হিন্দুস্তানি থিয়েটারের প্রথম নাট্যকার হিসেবে ওয়াজিদ আলি শাহের উল্লেখ করা হয়ে থাকে।

লখনউ আর কলকাতা মিশে গিয়েছিলাম মেটিয়াবুরুজের দরবারের মধ্যে দিয়ে। দরবারের যন্ত্রসংগীতের উল্লেখ করে ‘তারিখ-ই-পরিখানা’-য় ওয়াজিদ লিখেছেন, তিনি বিখ্যাত সেতারি কুতুব আলি খানের কাছে সেতার শেখেন। সেনি ঘরানার উস্তাদ বসত খান মেটিয়াবুরুজে রবাব নিয়ে আসেন। সুরশৃঙ্গারও তারই আনা, ওয়াজিদ এই যন্ত্রটিকে জনপ্রিয় করেন। ছিলেন বিখ্যাত বিনকার ও রবাবিয়া কাসিম আলি খান। ওয়াজিদের আহ্বানে কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় তার দরবারে সুরবাহার বাজিয়েছিলেন। এই দরবারেই নাকি উস্তাদ নিয়ামতুল্লা খান আধুনিক সরোদ সৃষ্টি করেন। এগারো বছর তিনি ওয়াজিদ আলির কাছে ছিলেন। ওয়াজিদ তবলাকেও এ শহরে জনপ্রিয় করেন। সানাই, এসরাজের সঙ্গেও জড়িয়ে ওয়াজিদ আলি শাহের নাম। সবমিলিয়ে শাস্ত্রীয় সংগীতের এক মহান পৃষ্ঠপোষক হিসাবে তাঁর নাম অম্লান থেকে যাবে।
ওয়াজিদ আলি শাহকে নিয়ে অল্প কথায় তুলে ধরা সম্ভব নয় – এতটাই তাঁর বিস্তার।১৮৫৭ সালে তাঁকে বন্দী করা হয়।হুতোম’ লিখছেন—“লক্ষ্ণৌর বাদশাকে কেল্লায় পোরা হলো, গোরারা সময় পেয়ে দু’চার বড় ঘরে লুটতরাজ আরম্ভ কল্লে মার্শাল লা জারি হল।” ওয়াজিদ আলি শা ১৮৫৭ সালের জুন থেকে ১৮৫৯ সালের জুলাই পর্যন্ত বন্দী ছিলেন ফোর্ট উইলিয়ামে। আবার ফিরলেন মেটিয়াবুরুজে। তাঁর ছোঁয়ায় মেটিয়াবুরুজের চেহারা গেল পাল্টে। মেটিয়াবুরুজে রমণীদের নিয়ে “প্রায় কুড়িটি নাচগানের দল ” তোলেন নবাব। নবাবের নাচগান আর রমণীবিলাস ভিন্ন নেশা ছিল না। নবাব ছিলেন ধর্মপ্রাণ।আর একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। নবাব এক চিড়িয়াখানা গড়ে তুলেছিলেন যা চিতাবাঘ, হরিণ,পাখি, সাপ, ময়ূর, জিরাফ প্রভৃতির বিচরণভূমি ছিল। সবমিলিয়ে বিদ্যা, জ্ঞানে,নাচে, গানে, আমোদে প্রমোদে কলকাতার কাছে মেটিয়াবুরুজ হয়ে উঠেছিল আরেকটি লখনউ, যেখানে লখনউ ছেড়ে এসেছিলেন মেটিয়াবুরুজে। “সেই মুরগিবাজী, বটেরবাজি, আফিমখোর, ফানুস ও ঘুড়ির নেশা। সেই কথকতা, মার্সিয়া তাজিয়াদারী, সেই ইমামবাড়া ও কারবালা। যে জাঁকজমকের সঙ্গে বাদশাহের তাজিয়া উঠত, লখনউয়ের বাদশাহী আমলে তেমন ওঠে নি ” মেটিয়াবুরুজ ছিল লখনউ আর তাঁর কেন্দ্রে ছিলেন নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ।।


More Stories
লেনিনের মৃত্যু : বিতর্ক এবং বাস্তব
রাজ কিরণ অন্তর্ধান রহস্য
নেতা নয় নায়ক, যমের অরুচি, ঋতব্রতকে ভয়ঙ্কর আক্রমণ শতরূপের