Home » টেস্ট ক্রিকেটে অ্যালুমিনিয়াম ব্যাট ব্যবহার করার আশ্চর্য ঘটনা

টেস্ট ক্রিকেটে অ্যালুমিনিয়াম ব্যাট ব্যবহার করার আশ্চর্য ঘটনা

সময় কলকাতা ডেস্ক, ৯ আগষ্ট :  ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বর মাসের ১৫ তারিখ ,দিনটি ক্রিকেট ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য ও কুখ্যাত দিন যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলার ডেনিস লিলির নাম । টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে ডেনিস লিলির নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে তার অসামান্য বোলিংয়ের জন্য। ৭০ টি টেস্টে ৩৫৫ টি উইকেটের মালিক ডেনিস লিলির কুখ্যাতি ছিল বদমেজাজি হিসেবে। জাভেদ মিয়াঁদাদের সাথে একবার খেলার মাঠে অত্যন্ত অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হলে মারমুখী হয়ে উঠেছিলেন তিনি। এই কুখ্যাতি বাদ দিলে তিনি আরেকটি মাত্র কুখ্যাত ঘটনার হোতা। এই ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একজনই খলনায়ক। তিনি ডেনিস লিলি। ক্রিকেটের মাঠে আক্ষরিক অর্থে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করেন কিংবদন্তি ফাস্ট বোলার যখন তিনি একটি অ্যালুমিনিয়াম ব্যাট নিয়ে ক্রিজে এসেছিলেন।ব্র্যান্ড অনুযায়ী ব্যাটটির নাম ছিল কমব্যাট। রডনি হগ,আরেক অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলার, ক্রিকেটের কলঙ্কজনক সেই টেস্টে দ্বাদশ ব্যক্তি ছিলেন যিনি তার মাথা বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন এতটাই তিনি লিলির কার্যকলাপে ভয় পেয়েছিলেন।  গ্রেগ চ্যাপেল ছিলেন অস্ট্রেলিয়া দলের অধিনায়ক, তাঁর অবস্থা হয়ে ওঠে আরও ভয়াবহ — উড়ন্ত অ্যালুমিনিয়াম ব্যাটে তার মাথা প্রায় উড়ে যেতে বসেছিল।

বেসবল ব্যাটে কাঠের বদলে ধাতু যেভাবে ব্যবহার শুরু হয়েছিল, অ্যালুমিনিয়াম ব্যাটটি ছিল গ্রাহাম মোনাঘান-এর মস্তিষ্কপ্রসূত। মোনাঘান একজন প্রাক্তন অস্ট্রেলিয়ান ক্লাব ক্রিকেটার যিনি লিলির ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ছিলেন, মোনাগানের এই সস্তা বিভিন্ন ধরণের ক্রিকেট ব্যাটের টার্গেট বাজার ছিল বিনোদনমূলক ক্রিকেট, স্কুল এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।কিন্তু, ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে, ডেনিস লিলি পার্থে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্টের মাঝখানে এই অপ্রথাগত সরঞ্জামের ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন। তখন উইলো কাঠের ব্যাটেই খেলতে হবে এরকম কোনও বাধ্যতামূলক নিয়ম জারি করা হয়নি। আর তার সুযোগ নিয়ে লিলি সেই ম্যাচে নেমে পড়েন অ্যালুমিনিয়াম ব্যাট হাতে। আর এতেই ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠে বাকি ২১ জন খেলোয়াড় ও অতিরিক্ত খেলোয়াড়দের মধ্যে। একে ধাতব ব্যাটের বিরক্তিকর শব্দ, তার মধ্যে লিলির হাতে ব্যাট! স্বাভাবিকভাবেই খেলোয়াড়দের পাশাপাশি আম্পায়াররাও খুব একটা নিশ্চিত বোধ করছিলেন না।লিলির এরকম একটি ধাতব ব্যাট ব্যবহার করার পেছনে উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক।আসলে, লিলি মনোগানের ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলেন।পরে তিনি তার আত্মজীবনী, Menace-এ স্বীকার করেছেন যে কৌশলটি ছিল সম্পূর্ণরূপে একটি বিপণন অনুশীলন। আর লিলির বিপণনের কৌশলের ধাক্কায় ক্রিকেটে নেমে আসে একটি কালো দিন। তবে সেদিনই প্রথম নয়। সামান্য কিছু দিন আগে ব্রিসবেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচেও লিলি ব্যাটটি ব্যবহার করেছিলেন।
ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানরা সেদিন খুব বেশি বিরক্ত হয়নি।

অ্যাশেজ সিরিজ শুরু হলে লিলি আবার অ্যালুমিনিয়াম ব্যাট ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন। পার্থ টেস্টের প্রথম দিনের খেলা শেষে, অস্ট্রেলিয়া ৮ উইকেটে ২৩২ রান তোলে । লিলি ১১ রানে অপরাজিত ছিলেন। পরের দিন সকালে গ্রেগ চ্যাপেল যখন লিলিকে নেটে ধাতব ব্যাট ঘোরাতে দেখেন, তখন তিনি খুব একটা উদ্বিগ্ন ছিলেন না। তাঁর ধারণা ছিল, যতক্ষণ সম্ভব ব্যাটিং করে ইংরেজদের বিরক্ত করে লিলি যদি ব্যাটটি জাতীয় টেলিভিশনের পর্দায় দেখাতে চান- অধিনায়ক হিসেবে তার প্রধান ফাস্ট বোলারের ক্ষেত্রে সেরকম কড়াকড়ি না থাকা নিয়ম কিছুটা শিথিল করতে পারেন। নেটে ভয়ঙ্কর শব্দ করলেও খেলার মধ্যে এক বা দুই ওভার সহ্য করা হয়তো যাবে, এমনটাই চ্যাপেল ভেবেছিলেন । পরের দিন খেলা শুরু হলে, ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইক ব্রিয়ারলি মোটেই অ্যালুমিনিয়াম ব্যাট দেখে খুশি হন নি ও ধাতব ব্যাটের কারণে বিরক্ত হয়ে ওঠেন।চ্যাপেল সেসময় দ্বাদশ ব্যক্তি হগের দিকে ফিরে বললেন, “মাঠে গিয়ে ডেনিসের উইলো ব্যাটটা নিয়ে নাও এবং ওভারের শেষে অ্যালুমিনিয়াম ব্যাটটি ফিরিয়ে এনো ।”হগ আতঙ্কিত ছিলেন । ওভারের পরে, তবুও তিনি মাঠে গিয়েছিলেন এবং উইলো কাঠের ব্যাট না দিতে পেরে হাতে নিয়ে ফিরে এসেছিলেন। লিলি তখনও অ্যালুমিনিয়াম ব্যাট সবেগে চালাচ্ছিলেন । ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইক ব্রিয়ারলি তখন আপত্তি তুলতে থাকেন।চ্যাপেল হগকে কী হয়েছে তা জিজ্ঞাসা করেন ও আবার কাঠের ব্যাট নিয়ে মাঠে যেতে বলেন।লিলির বদমেজাজের সঙ্গে পরিচিত হগ জানান যে, তাঁর মাথার নিরাপত্তা আগে, তাই তিনি যাবেন না। অগত্যা গ্রেগ চ্যাপেল নিজেই উইলো ব্যাট নিয়ে মাঠে ঢুকে পড়েন এবং পিচের কাছে আসেন। তিনি যখন লিলির থেকে প্রায় বাইশ গজ দূরে ছিলেন, তখন তিনি একটি চাকতি ঘোরার মত সাঁই সাঁই শব্দ শব্দ শুনতে পান। আদতে চ্যাপেলকে কাঠের ব্যাট হাতে মাঠে আসতে দেখে অ্যালুমিনিয়ামের ব্যাট সজোরে ছুঁড়ে দেন লিলি।অ্যালুমিনিয়ামের ব্যাটটি চ্যাপেলের মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় এবং তার মাথার পিছনে কয়েক গজ দূরে এসে পড়ে।চ্যাপেল শান্তভাবে তার ফাস্ট বোলারকে উইলো ব্যাট তুলে দেন এবং ফেরার পথে আপত্তিকর ব্যাটটি তুলে ড্রেসিংরুমে চলে যান।যাইহোক, লিলির ইনিংস দীর্ঘায়িত হয়নি।শীঘ্রই তিনি বোথামের বলে বব টেলরের হাতে ধরা পড়ে প্যাভেলিয়ানে ফেরেন।ঘটনাটি তবুও বাণিজ্যিকভাবে বিস্ময়কর কাজ করেছে। সংশ্লিষ্ট ঘটনার ফুটেজের জন্য, লিলি আর্থিকভাবে উপকৃত হয়েছিলেন। যাইহোক, কয়েক মাসের মধ্যে ক্রিকেট ব্যাটের আইনে পরিবর্তন করা হয় এবং শর্ত ঢোকানো হয় যে ব্যাটকে অবশ্যই কাঠের তৈরি হতে হবে।পার্থে ব্যবহৃত ব্যাট লিলি এখনও তার ক্রিকেট স্মৃতির সংগ্রহশালায় রেখে দিয়েছেন।টেস্ট শেষে দুই দলেরই সই করিয়ে নেন তিনি। মাইক ব্রিয়ারলি এতে “বিক্রয়ের সাথে সৌভাগ্য” লিখেছিলেন। পাশাপাশি টেস্টম্যাচটিতে জয়ী হয় অস্ট্রেলিয়া। অনেকেই সে ম্যাচে নজরকাড়ার মত পারফর্ম করেছিলেন। বোলিং বিভাগে ইংল্যান্ডের ইয়ান বোথাম ও অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে জিয়ফ ডিমকের দু ইনিংসের প্রদর্শন ছিল দুর্দান্ত । ব্যাট হাতে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে বর্ডার ও কিম হিউজ এবং ইংল্যান্ডের হয়ে ব্রিয়ারলি ও বয়কট প্রত্যেকেই একটি করে অসামান্য ইনিংস খেলেছিলেন।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:অস্ট্রেলিয়া ২৪৪ (কিম হিউজ ৯৯; ইয়ান বোথাম ৭৮রানে ৬ উইকেট ) এবং ৩৩৭ (জুলিয়েন ওয়েনার ৫৮ অ্যালান বর্ডার ১১৫, গ্রেগ চ্যাপেল ৪৩; ইয়ান বোথাম ৯৮ রানে ৫ উইকেট ডেরেক আন্ডারউড ৮২ রানে ৩ উইকেট ) ইংল্যান্ডক ২২৮ (ব্রিয়রলি ৬৪, লিলি৭৩রানে ৪ উইকেট , জিওফ ডাইমক ৫২ রানে ৩ উইকেট এবং ২১৫ (জিওফ বয়কট অপরাজিত ৯৯, জিওফ ডিমক ৩৪ রানে ৬ উইকেট )।অস্ট্রেলিয়া জয়ী ১৩৮ রানে ।

About Post Author