Home » সালতামামি ২০২৩, একনজরে এই দেশ : উল্লেখযোগ্য ২৩টি ঘটনা

সালতামামি ২০২৩, একনজরে এই দেশ : উল্লেখযোগ্য ২৩টি ঘটনা

সময় কলকাতা ডেস্ক, ১ জানুয়ারি : দিন আসে, দিন যায়, তার ফাঁকেই ইতিহাসে ঢুকে পড়ে তার চলাচলের খবর। কালের মহাগর্ভে বিলীন আরো একটি বছর। বিদায় ২০২৩ সাল। নানা ঘটনা আর উত্থান-পতন মিলিয়েই কাটল বছরটি। তারই কিছু বিষয় নিয়ে আমাদের এই বিশেষ প্রতিবেদন। একনজরে দেখে নেওয়া যাক এই এক বছরে কী কী ঘটনার সম্মুখীন হল দেশ…..

১. আদানিরা কারচুপি করে ধনী?
গৌতম আদানির বছরের শুরুটা হয়েছিল বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী হিসেবে। তিনি বলেছিলেন, তার এই উত্থান ভারতের ‘প্রবৃদ্ধির গল্প’ থেকে অবিচ্ছেদ্য। তারপরেই এক পলকে বদলায় সবটুকু। জালিয়াতি’ করে নিজেদের সংস্থার শেয়ার দর বাড়িয়েছে দেশের অন্যতম ধনী ব্যক্তি গৌতম আদানির গোষ্ঠী! আমেরিকার লগ্নি সংক্রান্ত গবেষণাকারী সংস্থা ‘হিন্ডেনবার্গ রিসার্চে’র রিপোর্টে এমন দাবির পর শোরগোল পড়ে যায়। গত ২৪ জানুয়ারি হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ রিপোর্ট পেশ করে আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে। রাতারাতি মুখ থুবড়ে পড়ে আদানি গোষ্ঠীর সংস্থাগুলির শেয়ার। হুড়মুড় করে নামে সেনসেক্সও। যেরকম উল্কার বেগে উত্থান ঘটেছিল, তারচেয়েও দ্রুত গতিতে নিচে নামে আদানি গ্রুপ। বিদেশি সংস্থার রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর বিত্তবানদের তালিকায় ধাক্কা খান দেশের অন্যতম নামী শিল্পপতি গৌতম আদানি। সারা বছর আদানি ইস্যুতে সুর চড়ায় বিরোধীরা। পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধি অভিযোগ তোলেন, ভারতে আদানি শিল্পগোষ্ঠীর নাটকীয় উত্থানের পেছনে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভূমিকা ও কারসাজি আছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি তার জবাব এড়িয়ে যান। বছরভর সরব হন তৃণমূল নেত্রী মহুয়া মৈত্র সহ অনেকেই। কিন্তু সমস্ত অভিযোগই উড়িয়ে দিয়েছে আদানি গোষ্ঠী। ক্ষমতাসীন বিজেপির শীর্ষ নেতারা বলতে থাকেন, যে অভিযোগগুলোর স্বপক্ষে বিরোধীরা কোনও প্রমাণ পেশ করতে পারেননি, সেগুলোর জবাব দেওয়ারও কোনও প্রয়োজন নেই।

২. বিরোধিতা করলেই আয়কর হানা

যেভাবে শাসকের অস্ত্র হয়ে উঠল কাস্টমস-ইডি
১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩। প্রেমের এই বিশেষ দিনে ভারতে বসন্তের হাওয়া ছিল প্রখর। অন্যান্য দিনের মতো এদিনও রাস্তাঘাটে এবং অফিসে সাংবাদিকদের ব্যস্ততা ছিল তুঙ্গে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কোম্পানি বা বিবিসির দিল্লি ও মুম্বইয়ের অফিসেও ব্যস্ততা ছিল চরম। কিন্তু হঠাৎই শোনা যায় আন্তর্জাতিক এই সংবাদ সংস্থার দুটি অফিসেই হানা দিয়েছে আয়কর। কিন্তু কেন? তদন্তকারী আধিকারিকদের দাবি ছিল বিবিসির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গড় ও টাকা হস্তান্তরের বিষয়ে বেনিয়মের অভিযোগ ছিল। কিন্তু কে করল এই অভিযোগ? কখন করল এই অভিযোগ? তা অবশ্য জানা যায়নি। বিবিসি কর্মীদের মোবাইল ফোন কম্পিউটার ল্যাপটপ বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া হয়। গোটা বিশ্বে শুরু হয় আলোচনা। অভিযোগ ওঠে বিবিসির বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতেই এই আয়কর হানা। কিসের প্রতিশোধ? উত্তর খুঁজতে গেলে একটু পিছিয়ে যেতে হবে। বছরের একেবারে শুরুতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি ‘ইন্ডিয়া: দ্য মোদি কোশ্চেন’ নামের একটি ডকুমেন্টারি প্রকাশ করে। গুজরাট দাঙ্গায় নরেন্দ্র মোদির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় ওই ডকুমেন্টারিতে। সেই দাঙ্গায় সংখ্যালঘু বহু মানুষ মারা গিয়েছিলেন। সঙ্গে গৃহহীন হতে হয়েছিল প্রচুর মানুষকে। সেই সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী পদে মোদির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। কেন্দ্র ওই ডকুমেন্টারিটি ভারতে নিষিদ্ধ করে দেয়। শুরু হয় বিতর্ক। এমনকী সংসদেও পড়ে এর আঁচ। বিরোধীরা আঙুল উঁচিয়ে বলে, এতকিছুর পর তো আয়কর হানা তো অবধারিত ছিল ! তাহলে এটাই কি দস্তুর? সোনিয়া গান্ধি, পি চিদাম্বরম, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, শরদ পাওয়ার – নাম গুলো শোনা লাগছে, তাই না? এরা বিরোধী দলের পরিচিত মুখ, বহুবার বিজেপির বিরুদ্ধে সরব হতে দেখা গিয়েছে। কিন্তু এদের মধ্যে মিল হল, এদের প্রত্যেকের বাড়িতেই কখনও না কখনও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা হানা দিয়েছে।

৩. যৌন নিপীড়ন: প্রতিবাদে রাস্তায় ভারতীয় কুস্তিগীররা
বছরের শুরু, মাঝামাঝি সময়ে আর একেবারে শেষে – তিন বার আলোচনায় উঠে এসেছে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে ভারতের অলিম্পিকস পদক জয়ী সহ তারকা কুস্তিগীরদের প্রতিবাদের ঘটনাগুলি। বিজেপি নেতা ও ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের সভাপতি ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে নারী কুস্তিগীরদের ওপরে যৌন নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ তোলা হয় জানুয়ারি মাসে। দিল্লির বুকে ধর্ণায় বসেন ভারতের অলিম্পিক পদক-জয়ী কুস্তিগীর বজরং পুনিয়া, কমনওয়েলথ গেমসে তিনবারের স্বর্ণপদক-জয়ী ভিনেশ ফোগত, রিও অলিম্পিকসে ব্রোঞ্জ পাওয়া সাক্ষী মালিকের মতো তারকা কুস্তিগীর। কুস্তিগীরদের আন্দোলনের ঝাঁজ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। দ্বিতীয়বার এই একই ইস্যুতে মে মাসে ধর্ণায় বসেন কুস্তিগীররা। যেদিন ভারতের নতুন পার্লামেন্ট ভবন উদ্বোধন হয়, সেদিনই ধর্ণায় বসা কুস্তিগীরদের ব্যাপক বলপ্রয়োগ করে তুলে দেয় পুলিশ। কুস্তিগীরদের যেভাবে মারধর করে তুলে দিয়েছিল পুলিশ, সেই ঘটনার নিন্দা জানায় এমনকি আন্তর্জাতিক অলিম্পিকস কমিটি এবং বিশ্ব কুস্তির নিয়ামক সংগঠন ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড রেসলিং। এদিকে, ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে প্রায় দেড় হাজার পাতার চার্জশিট আদালতে পেশ করে পুলিশ। যদিও, যৌন হেনস্থার অভিযোগে চক্রান্তের ভূত দেখেন ব্রিজভূষণ। বছর শেষে আবারও ওই কুস্তিগীরদের কথা উঠে আসে আলোচনায়। ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের নির্বাচনে সভাপতি পদে যিনি জয়ী হয়েছেন, সেই সঞ্জয় সিং আগের সভাপতি ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়েরই ঘনিষ্ঠ সহযোগী। নতুন সভাপতির আমলেও কুস্তিগীরদের যৌন নিপীড়ন থামবে না, এই আশঙ্কা জানিয়ে অলিম্পিকস পদক জয়ী কুস্তিগীর সাক্ষী মালিক সংবাদ সম্মেলন করে বলেন যে তিনি আর কুস্তিই লড়বেন না। কর্তব্য পথে নিজের পদক রেখে আসেন বজরঙ্গ পুনিয়া। ঘটনার পরেই নতুন কুস্তি ফেডারেশন বাতিলের কথা ঘোষণা কেন্দ্রীয় ক্রিড়ামন্ত্রকের।

৪. মণিপুরে সহিংসতা: কেন হিংসার আগুন জ্বলছে মণিপুরে ?

“আমার রাজ্য জ্বলছে। সকলে মিলে মণিপুরকে রক্ষা করুন”? – এই আর্তনাদের কথা মনে পড়ে? অলিম্পিক্স পদকজয়ী বক্সার মেরি কম-কে বলতে শোনা গিয়েছিল ঠিক এই শব্দগুলিই ! চোখে-মুখে উদ্বিগ্নতার ছাপ ছিল স্পষ্ট। কিন্তু কেন? জাতিগত হিংসা উত্তর-পূর্ব ভারতের ছোট রাজ্য মণিপুরকে ঘিরে ফেলে। মে মাসের তিন তারিখ থেকে উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে শুরু হয় জাতিগত সংঘর্ষ, যার জের বছর শেষেও শেষ হয়নি। সংঘর্ষে অন্তত ১৭০ জনের মৃত্যু হয়, ভিটে হারা হন হাজার হাজার মানুষ। সংঘর্ষ চলাকালীন নারীদের গণধর্ষণ করে হত্যার ঘটনাও ঘটে, যা মণিপুরের মতো রাজ্যে, যেখানে নারীরা অত্যন্ত সম্মানিত, সেখানে খুবই বিরল। বিজেপি শাসিত এই রাজ্যের সংখ্যাগুরু মেইতেই সম্প্রদায়কে তপশীলি উপজাতির মর্যাদা দেওয়ার কথা বিবেচনা করতে পারে সরকার, আদালত এরকম একটি নির্দেশ দেওয়ার পরেই সংঘর্ষ শুরু হয়। মেইতেইরা হিন্দু সংখ্যাগুরু আর কুকি জনজাতি সংখ্যালঘু এবং মূলত খ্রিষ্টান। কুকিদের বক্তব্য ছিল মেইতেইরা ইতিমধ্যেই রাজনীতি বা সরকারি কাজে সবথেকে বেশি নিয়োজিত, তাদের তপশীলি উপজাতির তকমা দেওয়া হলে সংরক্ষণের সুবিধা পাবে তারা। এমনকি কুকিরা যে পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করেন, সেখানকার জমিও দখল করে নিতে পারেন মেইতেইরা। সংঘর্ষ শুরুর সময়েই পুলিশের অস্ত্র লুঠ হয় বিপুল সংখ্যায়। একে অপরের বাড়িঘর, গাড়ি, এমনকি গ্রামও জ্বালিয়ে দিতে থাকেন। সংঘর্ষ শুরুর দিন কয়েকের মধ্যেই সেনাবাহিনী নামাতে হয়, দীর্ঘদিন ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি এমনই হয়ে যায় যে মেইতেই অধ্যুষিত অঞ্চল – রাজধানী ইম্ফল লাগোয়া এলাকা আর কুকি অধ্যুষিত পাহাড়ি এলাকার মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা তৈরি হয়ে যায়। একে অপরের এলাকায় প্রবেশ করেন না সংঘর্ষ শুরু হওয়ার সাত মাস পরেও। সশস্ত্র চেকপোস্ট গড়ে দুই সম্প্রদায়ই। মণিপুরে বিধানসভা নির্বাচনের জন্য বিজেপির ইশতেহারে রাজ্যের ‘আঞ্চলিক অখণ্ডতা’ রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সশস্ত্র বাহিনী বিশেষ ক্ষমতা আইন, আফসপা ১৯৫৮ বাতিল করার আরেকটি জোরাল দাবির বিষয়ে নীরব ছিল। একে অনেকেই গৃহযুদ্ধের রাজ্য হিসেবে অভিহিত করে। কিন্তু প্রশ্ন হল, সমাধান কোথায়? থাকলেও তা কবে হবে?

৫. অ্যালন মাস্কের টুইটার অধিগ্রহণ
‘‘টুইটারের সদর দফতরে ঢুকছি— লেট দ্যাট সিঙ্ক ইন!’’ যেন তখনও বিশ্বাস হচ্ছে না, চুক্তি সফল! টুইটার তাঁর। হাতের কাছেই তো রয়েছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ বা পিন্টারেস্ট-এর মতো নেটমাধ্যম। যা টুইটারের থেকেও তুলনামূলক ভাবে বেশি মুনাফা করছে। তবে টুইটারেই কেন আগ্রহ টেসলা কর্ণধারের? টুইটারের মালিক হওয়ার পর থেকেই প্রশ্নগুলি ভাসছিল। চলতি বছর তথ্যপ্রযুক্তি জগতের সবচেয়ে বড় বিতর্ক এলন মাস্কের টুইটার অধিগ্রহণ। চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি টুইটার অধিগ্রহণের পরিকল্পনায় প্রথম পা ফেলেছিলেন মাস্ক। সেই মাস থেকে টুইটারের শেয়ার কেনা শুরু করেন। মার্চের মধ্যে মাস্কের হাতে আসে ‘মাইক্রোব্লগিং সাইট’টির ৫ শতাংশ শেয়ার। তার পর এপ্রিলে মাস্ক ঘোষণা করেন, ৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলার খরচ করে টুইটার কিনতে চান তিনি। টুইটারের তৎকালীন সিইও পরাগ আগরওয়াল বহু চেষ্টা করেও টুইটার অধিগ্রহণ রুখতে পারেননি। মাস্ক টুইটার কিনেই পরাগকে বরখাস্ত করেন। শুরু হয় বিতর্ক। যা বাড়তে থাকে মাস্কের একের পর এক পদক্ষেপে। টুইটার থেকে সেলিব্রিটিদের ‘ব্লু টিক’ তুলে দেওয়া, টাকার বদলে ‘ব্লু টিক’ চালু করা, টুইট সংখ্যা বেঁধে দেওয়া, টাকার বদলে ফলোয়ার বাড়ানো, টুইটারের লোগো বদল এবং সবশেষে টুইটারের নাম বদলে এক্স করে দেওয়া, একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে গিয়েছেন। যা বছরভর শিরোনামে থেকেছে। শেষে পর অক্টোবরের ২৭ তারিখে টুইটার অধিগ্রহণ করেন মাস্ক। ‘‘টুইটারের সদর দফতরে ঢুকছি— লেট দ্যাট সিঙ্ক ইন!’’ যেন তখনও বিশ্বাস হচ্ছে না, চুক্তি সফল! টুইটার তাঁর।

৬. অভিশাপের আরেক নাম করমণ্ডল: ওড়িশায় ‘ম্যান মেড’ দুর্ঘটনা!
তিন-ট্রেনের সংঘর্ষে মৃত্যুমিছিল! রেল-নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে করমণ্ডল এক্সপ্রেস দুর্ঘটনা। ভারতে, এই শতাব্দীর সবথেকে ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনাটি ঘটে এ বছরের দোসরা জুন, ওডিশার বালেশ্বরের কাছে। প্রায় আড়াইশোরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, আহত হন প্রায় নয়শো যাত্রী। কলকাতার দিক থেকে দক্ষিণ ভারত অভিমুখী একটি যাত্রীবাহী ট্রেন ওডিশার বাহানাগা বাজার স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মালগাড়ীতে ধাক্কা মারে। যাত্রীবাহী ট্রেনটির অনেক কামরা দুমড়ে মুচড়ে মালগাড়ীর ওপরে উঠে গিয়েছিল। আবার ওই যাত্রীবাহী ট্রেনটির কিছু বগি পাশের লাইনে ছিটকিয়ে থেকে পড়লে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি যাত্রীবাহী ট্রেনের কিছু কামরার সঙ্গে ধাক্কা লাগে। বহু মৃতদেহ এতটাই বিকৃত হয়ে গিয়েছিল যে তা শনাক্ত করাই অসম্ভব ছিল। এক দেহ একাধিক পরিবার দাবি করে। হাসপাতালগুলিতে সেখানে আত্মীয় স্বজনদের উৎকণ্ঠা, দেহ শনাক্ত করার পরে সন্তানের ভেঙ্গে পড়া বা সন্তানের খোঁজে অভিভাবকের ছুটে বেড়ানোর দৃশ্য – এসবই দীর্ঘকাল মনে থেকে যাবে মানুষের। প্রশ্নের মুখে পড়ে যাত্রী নিরাপত্তা। দুর্ঘটনার পরে রেল যেমন নিজস্ব তদন্ত শুরু করেছিল, তেমনই অন্তর্ঘাত হয়েছে কী না, সেই খোঁজে সিবিআইকেও তদন্ত করতে দেয় সরকার। মনুষ্যজনিত সিগনালিং ব্যবস্থায় গুরুতর গলদ ধরা পড়ে। গ্রেফতার হন রেলের কয়েকজন স্থানীয় কর্মচারী।

৭. ‘পেপারলেস’, ৬০ হাজার কর্মবীরের শ্রমের ফল স্মার্ট সংসদ

অটুট থাকবে ১৫০ বছর পর্যন্ত

গান্ধী-নেহরু-পটেল-নেতাজি বা আম্বেডকর নন। তাঁদের বদলে বিনায়ক দামোদর সাভারকরের জন্মদিনে নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। হাজারও বিতর্ক, বিরোধীদের অনুষ্ঠান বয়কট-সহ একাধিক বাধাবিপত্তি কাটিয়ে পূজাপাঠ শেষে ভবনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের বিভিন্ন রাজ্যের বিখ্যাত উপকরণ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন সংসদ ভবন। নাগপুরের সেগুনকাঠ থেকে শুরু করে উত্তরপ্রদেশের মির্জাপুর থেকে আনা কার্পেট! কী নেই সেখানে। পবিত্র বেদমন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে নতুন সংসদ ভবনে স্বর্ণদণ্ড সেঙ্গোল স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নয়া নতুন সংসদ ভবনের নাম ‘পার্লামেন্ট হাউস অফ ইন্ডিয়া’। তবে নতুন সংসদ ভবন তৈরি হলেও সগৌরবে এবং স্বমহিমাতেই দাঁড়িয়ে থাকবে বর্তমান সংসদ ভবনটি। বহন করবে ভারতীয় ইতিহাসের সাক্ষী।

৮. রাহুলের সাড়ে চার মাস !
মোদি-পদবি নিয়ে বিতর্কের জেরে গত ২৩ মার্চ গুজরাটের আদালতের নির্দেশে সাংসদপদ হারিয়েছিলেন রাহুল গান্ধি। তবে সুপ্রিম কোর্ট মানহানির মামলায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করার নির্দেশে স্থগিতাদেশ দেয়। চারমাস পর সাংসদ পদ ফিরে পান রাহুল গান্ধি। সাংসদ পদ খোয়ালেও রাজনৈতিক ভাবে এই সময় আরও ‘সক্রিয়’ হয়ে উঠতে দেখা যায় রাহুলকে। কর্নাটকের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে হারিয়ে বড় জয় পায় কংগ্রেস। ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’র পর নেতা হিসাবে যে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন রাহুল, কর্ণাটক জয়ে তা প্রায় স্বীকৃতি পেয়ে যায়। রাহুলের সাংসদ পদ খারিজ বিজেপি বিরোধী দলগুলিকে কাছাকাছি আনতে সহায়ক ভূমিকা নেয় বলেও অনেকে মনে করেন। রাহুল এবং কংগ্রেসের প্রতি উপেক্ষা এড়িয়ে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র পটভূমি তৈরি হয়ে যায় তখনই।

৯. ‘পুজো-যজ্ঞ নয়, চন্দ্রযানে সাফল্য শুধুই বিজ্ঞানের’
এ বছর চন্দ্রাভিযানে সাফল্যের শিরোপা উঠে আসে ভারতের মাথায়। আমেরিকা, রাশিয়া এবং চিনের পর ভারত চতুর্থ দেশ যেটি চাঁদের মাটি ছুঁয়েছে। ১৪ই জুলাই অন্ধ্র প্রদেশের শ্রীহরিকোটা উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে চাঁদের দিকে রওনা দেয় চন্দ্রযান ৩। একটি এলভিএম-৩ রকেট দিয়ে চাঁদের উদ্দেশ্যে চন্দ্রযানটিকে উৎক্ষেপণ করা হয় যাতে ছিল একটি ল্যাণ্ডার ও রোভার। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর প্রতিষ্ঠাতা বিক্রম সারাভাইয়ের নামে ল্যাণ্ডারটির নাম রাখা হয়েছে ‘বিক্রম’ আর রোভারটির নাম ‘প্রজ্ঞান’। চাঁদে বিক্রমের সফট ল্যান্ডিং, চাঁদে রোভারের চলাচল এবং চন্দ্রপৃষ্ঠকে পর্যবেক্ষণ করা এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল। আনুমানিক ৬১৫ কোটি টাকা খরচ করে তৈরি এই চন্দ্রযান। চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছয় ৫ আগস্ট এবং ১৭ আগস্ট প্রপালশন মডিউল থেকে পৃথক হয়ে যায় ল্যান্ডার বিক্রম। ২৩ আগস্ট ল্যান্ডারটি চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে অবতরণ করে। এর আগে, ২০১৯ সালে, চন্দ্রযান-২ সফট ল্যান্ডিং-এ ব্যর্থ হয়েছিল। ডিসেম্বর মাসে, ইসরো সফল চন্দ্রাভিযানের জন্য আইল্যান্ডের হুসাভিকে অবস্থিত ‘এক্সপ্লোরেশন মিউজিয়ম’-এর পক্ষ থেকে ‘লেইফ এরিক্সন লুনার প্রাইজ’ পেয়েছে। এই অভিযান পুরোটাই বিজ্ঞানের উপরে নির্ভরশীল। ‘পুজো-যজ্ঞ নয়, চন্দ্রযানে সাফল্য শুধুই বিজ্ঞানের’।

১০. ভারতের দ্বিতীয় মহাকাশযান: আদিত্য-এল১
গত ২ সেপ্টেম্বর অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটার সতীশ ধওয়ান মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র থেকে সূর্যের উদ্দেশে পাড়ি দেয় আদিত্য-এল১। আদিত্য-এল১ ভারত থেকে সূর্যের দিকে পাঠানো প্রথম মহাকাশযান। সূর্যের অপর নাম আদিত্যর নামে নামকরণ করা হয় মহাকাশযানটির। মহাকাশযানটিকে ‘হ্যালো’ কক্ষপথের এল১ পয়েন্টে স্থাপন করা হয়। সূর্যের বায়ুমণ্ডল সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করতে আদিত্য-এল১-কে মহাকাশে পাঠানো হয়। এই অভিযানের মাধ্যমে সূর্য সম্পর্কে অজানা অনেক তথ্য ভারতের হাতে আসবে বলে জানিয়েছেন ইসরোর বিজ্ঞানীরা।

১১. ইন্ডিয়া’র শরিকরা কি শেষমেশ একজোট থাকবে?
দিল্লিতে আম আদমি পার্টি। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল। তেলঙ্গানায় ভারত রাষ্ট্র সমিতি। কর্ণাটকে কংগ্রেস। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে। একের পর এক বিরোধী শাসিত রাজ্যে বিরোধী দলের নেতানেত্রীদের বিরুদ্ধে সিবিআই, ইডি, আয়কর দফতরের হানা বিরোধী জোট ইন্ডিয়া-র নেতানেত্রীদের চিন্তায় ফেলছে। এ বিষয়ে রাজ্য স্তরে মতভেদ ভুলে পরস্পরের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন কি না, তা নিয়ে ‘ইন্ডিয়া’ শিবিরে আলোচনা শুরু হয়। বিজেপি বিরোধিতার উদ্দেশ্যেই আত্মপ্রকাশ করে নতুন জোট— ‘ইন্ডিয়া’, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টাল ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্স। যার নামকরণে মমতার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিরোধী শিবির সূত্রের খবর। জোটের সলতে পাকানোর পর্বে প্রবল উৎসাহ নিয়ে যিনি ইনিংস শুরু করেছিলেন এবং পরে কিছুটা ম্রিয়মান হয়ে পড়েন, তিনি বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার। তবে বিরোধী দলগুলি কত দিন একসঙ্গে থাকবে, তা বলায় সময় এখনও আসেনি বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।

১২. বালি থেকে ‘গর্বের’ হাতুড়ি নিয়ে আসেন মোদি

জি-২০ সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেছে ভারত

এ বছর সেপ্টেম্বর মাসে আয়োজিত জি ২০ সম্মেলনের সভাপতিত্ব করে ভারত। আফ্রিকান ইউনিয়ন যারা ৫৫টি আফ্রিকান দেশের প্রতিনিধিত্ব করে তাদের জি-২০-এর স্থায়ী সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ভারতের তরফে। এ বারের সম্মেলনের মূল বিষয় ‘বসুধৈব কুটুম্বকম্’। সরকারি সূত্রের ব্যাখ্যা, ‘এক বি‌শ্ব, এক পরিবার, এক ভবিষ্যৎ’। সকলের জন্য সমান উন্নয়নই যার লক্ষ্য। মোদি সরকারের এই পদক্ষেপ প্রশংসা কুড়িয়েছে। জি ২০ সম্মেলনে অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্ত্ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আন্তর্জাতিক ঋণ মকুব এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর করদানের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। শীর্ষ সম্মেলনের মাঝেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, সৌদি আরব এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন রেলপথ এবং শিপিং রুটের একটি নতুন নেটওয়ার্ক ঘোষণা করেছে। প্রসঙ্গত, ২০২৪ এর নির্বাচনের আগে এটা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে ভারতকে গ্লোবাল সাউথ-এর কন্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ ছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।

১৩. ভারত-ইন্ডিয়া, এ কোন জুজুর উদয় ?
দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ছিয়াত্তর বছর পার, সংবিধানের বয়সও তিয়াত্তর অতিক্রান্ত। এই দীর্ঘ জীবনে হাজার সমস্যায় দেশ নাজেহাল হয়েছে, হয়ে চলেছে, পুরনো সমস্যার সঙ্গে ক্রমাগত যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন সমস্যার বোঝা। কিন্তু নিজের নাম নিয়ে তার কোনও সমস্যা আছে বলে এত কাল জানা ছিল না। দেশবাসীও জেনে এসেছেন, যা ইন্ডিয়া, তাই ভারত। এমনকী, এমনকি শহর থেকে রেল স্টেশন অবধি সব কিছুর নাম বদলে হিন্দুত্বের নামাবলি রচনায় প্রবল উৎসাহী নরেন্দ্র মোদি সরকারও প্রায় এক দশক যাবৎ ‘ইন্ডিয়া দ্যাট ইজ ভারত’ নিয়ে দিব্য রাজ্যপাট চালাচ্ছে। এরই মাঝে গোল হল কি — সহসা বিজেপি-বিরোধী দলগুলি একজোট হতে উদ্যোগী হল এবং অচিরেই সেই সমন্বয়ের মঞ্চটির নামকরণ হল: ইন্ডিয়া। এই নামের অভিঘাতে প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর সতীর্থরা গোড়া থেকেই বিচলিত হয়ে পড়েছেন, সেটা আজ সর্বজনবিদিত। দেশের নাম ‘ইন্ডিয়া’র বদলে ‘ভারত’ করার পক্ষে ময়দানে নামে কেন্দ্রীয় সরকার। সেই প্রক্রিয়া শুরু হয় দেশের মাটিতে আয়োজিত জি-২৪ বৈঠক থেকে। ওই বৈঠকেই দেশের নাম হিসাবে ইন্ডিয়ার জায়গায় ভারত লেখা শুরু হয়। প্রেসিডেন্ট অব ইন্ডিয়া এবং ভারতের রাষ্ট্রপতি এত কাল এক সঙ্গে কাল কাটিয়েছেন, হঠাৎ, আক্ষরিক অর্থে রাতারাতি, প্রেসিডেন্ট অব ভারত নামক মিশ্রভাষার উদয় হয়। ক্রমে সেই প্রবণতা দেখা যায় অন্য জায়গাতেও। এমনকী পাঠ্যবইতেও ‘ইন্ডিয়া’র বদলে ‘ভারত’ ব্যবহার শুরু হয়। যদিও সরকারিভাবে সংসদে কোনও প্রস্তাব বা বিল আনা হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই এই নিয়ে বিতর্ক বেঁধে যায়। বিরোধীদের দাবি, তাঁরা মোদির বিরুদ্ধে লড়াই করতে ইন্ডিয়া নামের জোট গঠন করার পরই দেশের নাম বদলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মোদি সরকার। এমন খিচুড়ি রান্নার দৌড় যে কোথায় গিয়ে থামবে, তা বোধ হয় নিজেরাও জানেন না।

১৪. উত্তরকাশীর সুড়ঙ্গ: প্রশ্নে ঠিকাদার এবং নজরদারেরা
উত্তরকাশীতে নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গ ধসে গত ১২ নভেম্বর থেকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত আটকে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের তিন জন-সহ মোট ৪১ জন শ্রমিক। উদ্ধারের চেষ্টা অনেক বার ব্যর্থ হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সম্মিলিত টানা চেষ্টায় এবং বিদেশের বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ১৭ দিনের মাথায় বার করে আনা হয় তাঁদের। ১৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের অংশ হিসাবে, উত্তরকাশীর সিল্কিয়ারা থেকে বারকোট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটারের ওই সুড়ঙ্গ তৈরি হচ্ছিল হিমালয়ের মধ্য দিয়ে। তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে ছিল পরিবহণ মন্ত্রকের অধীনস্থ ন্যাশনাল হাইওয়েজ অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড। জাতীয়স্তরের এক সংবাদমাধ্যমের দাবি, ঠিকাদার এনএইচআইডিসিএল-এর ইঞ্জিনিয়ারদের থেকে নির্মাণকাজের পদ্ধতি অনুমোদন করিয়ে নেননি। নানা রকমের ভূমিরূপের বিষয়টি উপেক্ষা করে বদল করেছিলেন কাজের পরিকল্পনাও। পর্যাপ্ত ছিল না ‘সেন্সর’ এবং যন্ত্রপাতি, যার থেকে পরিকল্পনা-পরিবর্তনের ফলে মাটির ভিতরে কী হচ্ছে তার আঁচ পাওয়া সম্ভব হত। আরও দাবি, বড় দুর্ঘটনার আগে ২১ বার ছোট ছোট ধস নেমে সুড়ঙ্গে গর্ত হয়েছিল। সেই কথা এনএইচআইডিসিএল-এর এক আধিকারিক লক্ষ করে বলার পরেও নজর দেওয়া হয়নি। উত্তরকাশীর সুড়ঙ্গ-বিপর্যয়ের জন্য আঙুল তোলা হয়েছে কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারদের দিকে। নজরদারির দায়িত্বে থাকা সরকারি আধিকারিদের গাফিলতিও ছিল বলে দাবি তদন্তকারী দলের। দুর্ঘটনার তদন্তকারী দলে রয়েছেন বর্ডার রোডস অর্গানাইজ়েশন এবং রেলের আধিকারিক, দু’জন অধ্যাপক।

১৫. ভারতেই তৈরি যুদ্ধবিমান তেজস

হালকা যুদ্ধবিমান নির্মাণে বিশ্বের মানচিত্রে ভারত

প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে চলতি বছরে ঐতিহাসিক সাফল্য ভারতের। বহুদিন ধরেই আমেরিকা থেকে তেজস যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিন তৈরির প্রযুক্তি চেয়েছিল ভারত। জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরেই স্বাক্ষরিত হয় প্রযুক্তি হস্তান্তরের চুক্তি। এতদিন পর্যন্ত ফাইটার জেট তেজসের বাকি অংশ ভারত তৈরি করলেও ইঞ্জিন তৈরি হত আমেরিকায়। কিন্তু মার্কিন সংস্থা জেনারেল ইলেকট্রিক ও হিন্দুস্তান এয়ারোনটিক্স লিমিটেডের মধ্যে চুক্তির পর থেকে ইঞ্জিন-সহ গোটা যুদ্ধবিমানই তৈরি হচ্ছে ভারতে। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি তেজস বিমানে চাপেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও। বায়ুসেনা সূত্রের খবর, আগামী কয়েক বছরে ৩০০-রও বেশি তেজস যুদ্ধবিমান শামিল হবে ফাইটার স্কোয়াড্রনগুলিতে।

১৬. হঠাৎ কেন ২০০০ টাকার নোট বন্ধ করল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক?

২০১৬ সালে নোট বাতিলের সময় ঘটা করে মোদি সরকার চালু করেছিল ২ হাজার টাকার নোট। সরকারের দাবি ছিল, বড় নোট চালু হলে কম সময়ে মানুষের কাছে বেশি টাকা পৌঁছে দেওয়া যাবে। দুর্নীতি কমবে, নতুন নোট চালু হলে জাল করার প্রবণতাও কমবে। কিন্তু বছর ছয়েক বাদে চলতি বছরই ২০০০ টাকার নোটে মোহভঙ্গ হয় কেন্দ্রের। ধীরে ধীরে বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয় বৃহত্তম নোট। শেষে সরকারিভাবে ২ হাজারের নোট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তও ঘোষণা করা হয়েছে। এই মুহূর্তে ২০০০ টাকার নোটে আর কোনওরকম লেনদেন করা যাবে না। তবে এখনও ওই নোট থাকলে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের শাখায় জমা করা যাবে। বিরোধীদের প্রশ্ন, ঘটা করে যখন ২০০০ টাকার নোট চালু করা হল, তাহলে বাতিল করতে হল কেন? বাতিলই যদি করা হবে, তাহলে চালু হয়েছিল কেন?

১৭. সাম্প্রতিকতম দুর্যোগের নাম মিগজাউম
এবছর বেশ কয়েকটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলেছে পৃথিবী। কোনওটা এদেশে, কোনওটা বিদেশে। তার মধ্যে সাম্প্রতিকতম দুর্যোগের নাম মিগজাউম। মায়ানমারের নামাঙ্কিত এই ঝড়ে দেশের দক্ষিণ প্রান্ত অর্থাৎ অন্ধ্র, তামিলনাড়ুতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৭ জন। শুধু কি তাই? এই ভরা শীতে ঘূর্ণিঝড়ের দাপটে তামিলনাড়ুতে রেকর্ড বৃষ্টি হয়েছে। বলা হচ্ছে, ৪৭ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ। সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয় ধ্বংসলীলার ছবি। পাশাপাশি আরও একটি ছবিও বেশ ভাইরাল হয়েছে। চেন্নাইয়ের পেরুনগালাতুর এলাকায় রাস্তার উপরই ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় একটি কুমিরকে। অর্থাৎ প্রকৃতির রোষ থেকে জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে কি মানুষ, কি প্রাণী – সকলেই যেন এক হয়ে যায়। কোনও ফারাক থাকে না।

১৮. দু’পয়সা, দু’কোটি এবং দুই ভোট, কাকতালীয়!

মহুয়া বার বার হোঁচট খান ‘দুই’-এর গেরোতেই !

তিন বছর আগে সংবাদমাধ্যমকে নিশানা করে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন মহুয়া মৈত্র। ঘটনাচক্রে, মহুয়ার বিরুদ্ধে ‘ঘুষ নিয়ে প্রশ্ন’ তোলার অভিযোগ উঠেছে। সেই অভিযোগেরই একটি অংশ হল, মহুয়া দুবাইয়ের ব্যবসায়ী দর্শন হীরানন্দানির থেকে দু’কোটি টাকা নগদ নিয়েছেন। অভিযোগ তোলেন বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে এবং মহিয়ার প্রাক্তন বান্ধব জয় অনন্ত দেহাদ্রাই। মহুয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি লোকসভার এথিক্স কমিটির কাছে পাঠান স্পিকার ওম বিড়লা। এথিক্স কমিটির বৈঠকে ৫০০ পাতার খসড়া রিপোর্ট চূড়ান্ত হয়। রিপোর্টের নির্যাস, মহুয়াকে সংসদ থেকে বহিষ্কার করা হোক। প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়ে ছ’টি। বিপক্ষে চারটি। দু’টি ভোটের ব্যবধানে মহুয়াকে বহিষ্কারের সুপারিশে সিলমোহর পড়ে। কখনও দু’পয়সা, কখনও দু’কোটি টাকা। আবার কখনও সাংসদ পদ খারিজের সুপারিশে এথিক্স কমিটিতে দুই ভোট! মহুয়া কি বার বার হোঁচট খান ‘দুই’-এর গেরোতেই? সে যাই হোক, মহুয়ার সাংসদ পদ খারিজের ইস্যুতে বেশ খানিকটা পোক্ত হতে দেখা যায় ইন্ডিয়া জোটের শরিকদের মধ্যে বোঝাপড়া।

১৯. কংগ্রেস সাংসদের বাড়ি থেকে উদ্ধার ৩৫৩ কোটি!
দেশে আয়কর হানায় এত বিপুল পরিমাণ অর্থ আগে কখনও উদ্ধার হয়নি বলেই সূত্রের খবর। কংগ্রেসের রাজ্য সভার সাংসদ ধীরজ সাহুর অফিস থেকে সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা নগদ উদ্ধার করা হয়। ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডের একাধিক জায়গায় আয়কর দফতরের হানায় ধীরজ সাহুর অফিস থেকে নগদ ৩৫০ কোটির বেশি টাকা উদ্ধার হয়। দলের সাংসদের বাড়ি-অফিস থেকে এই বিপুল পরিমাণ নগদ উদ্ধারের ঘটনায় তুমুল অস্বস্তিতে পড়ে কংগ্রেস। দলের রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ধীরজ সাহুর থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি দলের তরফে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, এত পরিমাণ টাকা জমা করার বিষয়টি ওই সাংসদকেই ব্যাখ্যা করতে হবে। এই আয়কর হানার দু’দিন পরেই বিষয়টি নিয়ে এক্স-হ্যান্ডলে মুখ খুলে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে আক্রমণ শানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর সুরেই বিজেপি সভাপতি জেপি নড্ডা, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-সহ বিজেপির নানা স্তরের নেতারা কংগ্রেসকে আক্রমণ করেছেন।

২০. বিধানসভায় বিজেপির জয় কি লোকসভা নির্বাচনের পূর্বাভাস?
মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’, অর্থাৎ, মোদি থাকলে সবই সম্ভব, ২০১৯ সালে ভারতের লোকসভা নির্বাচনের আগে এটাই ছিল গেরুয়া শিবিরের স্লোগান। এবছরের মে মাসে কর্ণাটকে এবং ২০২২-এর শেষ নাগাদ হিমাচল প্রদেশে ভরাডুবির পর ভারতের পাঁচ রাজ্যে সদ্য অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে তিনটি হিন্দিভাষী রাজ্যেই বিজেপি-র জয়ের কৃতিত্বও তাদের নেতা নরেন্দ্র মোদির ঝুলিতেই দিয়ে দেয় দলটি। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের আর কয়েক মাস বাকি থাকতে ‘সেমিফাইনালে’ এই জয় গেরুয়া শিবিরের আত্মবিশাস দৃঢ় করে। ইতিমধ্যেই একাধিক বিরোধীদের প্রশ্নের মুখে পড়েছে গেরুয়া শিবির। মোদি-আদানি সম্পর্ক, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, মূল্যবৃদ্ধি, সীমান্তে চিনের অনুপ্রবেশ, একাধিক বিষয় নিয়ে রাজ্যগুলির সঙ্গে কেন্দ্রের বিবাদের মতো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধীরা সরব থেকেছেন। এসবের মধ্যেই এই জয়কে মি. মোদি নিজেই ‘ঐতিহাসিক’ বলে আখ্যা দিয়ে দেন। মোদি আরও একবার ‘হ্যাটট্ট্রিক’-এর ‘গ্যারান্টি’ দেন। ফল ঘোষণার পরে তিনি বলেন, “এই হ্যাটট্ট্রিক ২০২৪-এর হ্যাটট্ট্রিক-এর গ্যারান্টি দিয়ে দিয়েছে”।

২১. ২০০১: বাইরে সন্ত্রাস, ২০২৩: ভিতরে হামলা

সংসদকাণ্ডে জুড়ে গেলেন বাজপেয়ী-মোদি

নিরাপত্তায় ফাঁক ছিল ২২ বছর আগেও। যার সুযোগ নিয়ে সংসদে হামলা চালিয়েছিল পাক মদতপুষ্ট জঙ্গিরা। আর ১৩ ডিসেম্বর সেই হামলার ২২ তম বার্ষিকীর দিনে লোকসভার অভ্যন্তরে সাংসদদের বেঞ্চের উপর দিয়ে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে দুই যুবক গ্যাস ক্যানিস্টারের রং স্প্রে করার ঘটনা বুঝিয়ে দিল, নিরাপত্তার সেই ফাঁক রয়ে গিয়েছে ২২ বছর পরেও। জিরো আওয়ারে দু’জন ঢুকে পড়েন সংসদের নতুন ভবনে। ‘তানাশাহি নেহি চলেগা’— স্লোগান দিতে দিতে ঢোকেন দু’জন। হাতে ছিল রং বোমা। ওই সময়ে সংসদে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মু। ধোঁয়া দেখে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। বিজেপি সাংসদ প্রতাপ সিমহার অতিথি হয়ে ঢুকে পড়া ওই প্রবেশকারীরা বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন। প্রশ্নের মুখে পড়ে সংসদের নিরাপত্তা। অনেকেই বলেন, পুরনো সংসদ ভবনের তুলনায় নিরাপত্তারক্ষীর সংখ্যা অনেক কম থাকে নতুন সংসদ ভবনে। সেটাই বাড়তি সুবিধা করে দিয়েছিল হানাদারদের। প্রশ্ন ওঠে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নেতৃত্বাধীন দিল্লি পুলিশের নজরদারিতেই এমন ঘটনা ঘটে গেল। কী ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গায় নিরাপত্তার এমন গাফিলতির ঘটনা ঘটল? কাদের নামের পাস ওদের দেওয়া হয়েছিল?’

২২. গণহারে সাংসদ সাসপেন্ড, রইল বাকি…!
সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধীদের ভূমিকা এবং সক্রিয় বিরোধিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের সংখ্যা কত, তা নিয়ে বিরোধীদের দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। কে বলেছিলেন? নরেন্দ্র মোদি। কবে? ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে তিনশোর বেশি আসনে জিতে দ্বিতীয় বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে। কখন? সপ্তদশ লোকসভার প্রথম অধিবেশন শুরুর আগে। প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেছিলেন, “আমি আশা করব, বিরোধীরা সরব হবেন। সংসদে সক্রিয় হবেন।” পাঁচ বছর পরে সপ্তদশ লোকসভার শেষ পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন চলে ডিসেম্বরে। এই শীতকালীন অধিবেশন চলাকালীনই সংসদে হামলার ঘটনা। এই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি দাবি করেন বিরোধী সাংসদরা। পদত্যাগ চাননি। শুধু বিবৃতি। কিন্তু, তাতেই বিরোধীদের দলে দলে সাসপেন্ড করে দেওয়া হয়। লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে সাসপেন্ড হওয়া সাংসদের সংখ্যা দেড়শো ছুঁই-ছুঁই। সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসকের কাছে কি আরও খানিকটা ম্রিয়মান হয়ে যায় বিরোধী পক্ষ? মাস তিনেকের মধ্যেই লোকসভা নির্বাচন। তার আগে, সংসদ কার্যত বিরোধী-মুক্ত। লোকসভায় বিজেপি এবং এনডিএ জোটভুক্ত দলগুলির সদস্যসংখ্যা ৩০০-র বেশি। শাসক শিবিরের কোনও সাংসদই সাসপেন্ড হননি এই অধিবেশনে।

২৩. মন্দির ‘তুরুপের তাস’?
আর কয়েকমাসের মধ্যে হতে চলেছে লোকসভা নির্বাচন। তার আগেই ২২ জানুয়ারি অযোধ্যায় উদ্বোধন হওয়ার কথা রামমন্দিরের। প্রাণপ্রতিষ্ঠা হবে রামলালার। উপস্থিত থাকবেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নিমন্ত্রিত দেশের বিশিষ্টজনেরা। সেই উপলক্ষে তুঙ্গে প্রস্তুতি। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছিল ভারতের উত্তরাঞ্চলের শহর অযোধ্যায়। ধর্মীয়ভাবে পবিত্র হিসেবে বিবেচিত এই অঞ্চলে বহুবছর ধরেই হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। ২০১৯ সালেই অযোধ্যা প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক রায় দেয় সুপ্রিম কোর্ট। তৎকালীল প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ-এর নেতৃত্বে সাংবিধানিক বেঞ্চ জানায় অযোধ্যার ওই জমিতে রামমন্দির নির্মাণ হবে। তারপর শুরু হয় মন্দির নির্মাণের কাজ। জানুয়ারিতে উদ্বোধন। মন্দিরের উদ্বোধন ঘিরে হিন্দুত্বের আবেগ উস্কে গেরুয়া শিবির ভোটে নামতে চলেছে। বিজেপি-র ‘তুরুপের তাস’ রামমন্দিরকে বিরোধীরাই হাতিয়ার করে ফেলে দেখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই মাঠে নামেন। লোকসভা ভোটের আগে সেই উন্মাদনা আরও বাড়িয়ে ভোটে তার সুফল পেতে মরিয়া গেরুয়া শিবির। পাল্টা রামমন্দিরের উদ্বোধন নিয়ে লোকসভা ভোটের আগে বিজেপি রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ।।

About Post Author