Home » তিস্তাপারের বৃত্তান্ত : নদীচরের তরমুজের আকাল

তিস্তাপারের বৃত্তান্ত : নদীচরের তরমুজের আকাল

আর্থিকা দত্ত, সানী রায় ও পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ২০ এপ্রিল :  তরমুজের জনপ্রিয়তা আজকের নয়। মিশরের কিশোর সম্রাট – ফারাও তুতেনখামেনের নাম কে না জানে! আশ্চর্যজনকভাবে,  তাঁর সমাধিমন্দিরে অন্য অনেক কিছুর মধ্যেই যা চোখ কেড়ে নেয় তা হল তরমুজ। অর্থাৎ তরমুজের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন এবং তরমুজ যুগে যুগে মানুষের পিপাসা এবং রসনাকে তৃপ্ত করে এসেছে। তরমুজের মধ্যে ৯২ শতাংশ জল এবং ৬ শতাংশ চিনি। ওয়াটারমেলন – ইংরেজি নামে জলের কথা রয়েছে। দেশে-বিদেশে তরমুজের চাহিদা প্রবল । গরমকাল হলে তো কথাই নেই ! উত্তরবঙ্গের তিস্তাপারের, তিস্তাপাড়ের তরমুজে হঠাৎ ভাটার টান।  তিস্তাপারের বৃত্তান্ত ঘিরে তরমুজ যা একদা উত্তরবঙ্গের মানুষের চাহিদা মিটিয়েছে।

তরমুজের রঙ

বাইরে সবুজ ভেতরে লাল – তরমুজের চাহিদার পাশাপাশি ভেতরে বাইরে অন্য রঙ থাকায় কাব্যে, গল্পে, উপমায়, রসিকতায় তরমুজ হয়ে উঠেছে গিরগিটি-তুল্য। ভোটের বাজারে রাজনৈতিক উত্তাপ যেমন আছে গরমও বাড়ছে এবার। প্রথম দফার নির্বাচন সাঙ্গ হয়েছে। দার্জিলিং বাদ দিলে জঙ্গল পাহাড়ে ঘেরা উত্তরবঙ্গের ভোট সম্পন্ন প্রথম দফাতেই। তবে ফলের দেরি আছে, ফল নিয়ে চৰ্চা হয়ে উঠেছে প্রাসঙ্গিক।তবে ফল নিয়ে আলোচনা দ্বিমুখী যা তিস্তাপারের বৃত্তান্ত জুড়ে।

ভোটের ফল এবং ফল তরমুজ নিয়ে উত্তরবঙ্গের মানুষ মাথা ঘামাচ্ছেন। তবে বঙ্গ রাজনীতিতে রাজনীতিতে তরমুজ রূপকটিকে প্রবলভাবে চালু করে দিয়েছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বামেদের সঙ্গে সখ্যতার জন্য কংগ্রেস নেতা সুব্রত মুখোপাধ্যায় কে তরমুজ বলে কটাক্ষ করে। তবে বঙ্গে এখন বাম তৃণমূল সংঘাতের পারদ নিম্নমুখী। আছে তৃণমূল ও গেরুয়া শিবিরের লড়াই। রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যেই ঊর্ধ্বগামী তাপমাত্রা ,রোদের তেজের জন্য ডাক্তারবাবুদের পরামর্শ এরকম আবহাওয়ায় তরমুজ খেতে হবে ।

আকালের সন্ধানে

গরমে বাজারে গেলেই দেখা মিলছে, ঢালাও বিক্রি হচ্ছে তরমুজ। দাম বেড়েছে এবার। তবে চোখে পড়ছে না তিস্তা পারের তরমুজ।  বহুযুগের ভালোবাসার তিস্তাপারের তরমুজ গেল কোথায়?

তিস্তাপারের তরমুজ বৃত্তান্ত

তিস্তাপারের তিস্তা নদীর পাড়।উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার তিস্তা নদীর চরে তরমুজ চাষীদের যাপনে আকালের ছাপ। স্বাধীনতার পর থেকেই তরমুজ চাষ করেই জীবিকা নির্বাহ করেন তিস্তাচরের বাসিন্দারা। তবে এ বছর জলপাইগুড়ির তিস্তা নদীর চরে বন্ধ রয়েছে তরমুজ চাষ। আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন তিস্তাপারের তরমুজ চাষীরা। একটা সময় ছিল যখন এই তিস্তা নদীর চরের বিস্তীর্ণ এলাকার বালিমাটিতে ভুরিভুরি তরমুজ চাষ হত আর যা জেলা, রাজ্য ছাড়িয়ে ভিনরাজ্যেও পাড়ি দিত। স্বাদে অতুলনীয় হওয়ায় প্রবল চাহিদা ছিল তিস্তাপারের তরমুজের। কথায় আছে কারও পৌষ মাস তো কারও সর্বনাশ। একদিকে যখন তিস্তানদীর পাড়ে এই বাসিন্দারা তরমুজ চাষ থেকে বঞ্চিত, ঠিক সে সময়ে জেলার বিভিন্ন বাজারগুলিতে ভিন রাজ্যের তরমুজের দেদার ক্রয়-বিক্রয় চলছে। জলপাইগুড়ির বিভিন্ন বাজারগুলিতে তাকালেই দেখা যাবে, বিহার-কর্ণাটকের তরমুজের রমরমা। ভিন রাজ্য থেকে আমদানি, ক্রেতাদের তাই বাড়তি টাকা দিয়ে এই তরমুজ কিনতে হচ্ছে । তবে এত বছর ধরে তরমুজ চাষ করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া কৃষকরা ঠিক কি এমন কারণে এতটা ক্ষতির মুখে পড়ল? এরকম অবস্থার নেপথ্যে কী?

আকালের পটভূমি

এ কোন সকাল,  রাতের চেয়েও অন্ধকার!মেঘভাঙা বৃষ্টি, হিমবাহ হ্রদ ভেঙে পড়া এবং হড়পা বানের কথা স্মরণে আনার চেষ্টা করা যাক ।

মনে পড়ে,গত বছরের চৌঠা অক্টোবরের কথা? সেই ভয়াবহ ভোর?  সিকিমের সেই বিধ্বংসী বন্যা মনে পড়ে?  ভোররাতে মেঘভাঙা বৃষ্টি শুরু হয় সিকিমে, হিমবাহ হ্রদ ভেঙে বিপুল পরিমাণ জল নামে তিস্তা নদীতে কেড়ে নেয় বহু মানুষের বসতবাড়ি থেকে তরতাজা প্রাণ। সেই বিধ্বংসী বন্যা, বদলে দিয়েছে তিস্তা গোটা চিত্রটাই। সেনাবাহিনীর বেশ কিছু মরটার শেল ভেসে এসেছিল এই তিস্তা নদী দিয়ে। তিস্তাপাড়ে চাঁপাডাঙায় মরটার শেল ফেটে নিরীহ মানুষের প্রাণ পর্যন্ত যায়। সেনাবাহিনীর সামরিক সরঞ্জাম তিস্তা দিয়ে ভেসে আসায় কিছু বিধি নিষেধ আরোপ হয়। সেনাবাহিনীর তরফে নির্দেশিকা এবং প্রশাসনিক তৎপরতার আওতায় নাভিশ্বাস ওঠে তিস্তাচরের তরমুজ চাষীদের। বন্ধ হয়ে যায় তিস্তাচরে তরমুজ চাষ। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, প্রশাসনের কড়া নির্দেশিকা রয়েছে আর তাই কোনোভাবেই কোন চাষ-আবাদ করতে পারছেন না তাঁরা।

ভোরের প্রতীক্ষা

তিস্তাপারের বৃত্তান্ত  তরমুজ চাষীদের অনুকূলে নয়।  মাথায় হাত চাষীদের । ফলশ্রুতি, বাজারে নেই তিস্তাপারের, তিস্তা নদীর পাড়ের চাষীদের ফলন । ‘লোকাল ‘তরমুজের আকালের প্রভাব সর্বব্যাপী। বহিরাগত তরমুজের দাম বেড়েই চলেছে স্থানীয় বাজারে, চাষীদের ভাত রুটিতে বেজায় টান।আকাল কেটে সুসময়ের অন্তহীন প্রতীক্ষায় প্রহর কাটছে তরমুজ চাষীদের।।

About Post Author