পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ৫ জুন : তৃতীয় দফার ভোট দেশ জুড়ে ৯৪ টি লোকসভা কেন্দ্রে। বঙ্গে ৭ মে তৃতীয় দফার ভোট চারটি কেন্দ্রে, এরমধ্যে অন্যতম মালদা দক্ষিণ। এই কেন্দ্রে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কংগ্রেসের প্রার্থী ঈশা খান চৌধুরী। বিজেপির হয়ে লড়ছেন শ্রীরূপা মিত্র চৌধুরী এবং তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী শাহনওয়াজ আলি রায়হান। ২০১৯ সালে এই কেন্দ্র ছিল কংগ্রেসের। এবিএ গনিখান চৌধুরীর ভাই আবু হাসেম খান চৌধুরী যিনি ডালুবাবু নামেই বেশি পরিচিত, তিনি আটহাজারের সামান্য বেশি ভোটে বিজেপি প্রার্থী শ্রীরূপা মিত্র চৌধুরীকে হারিয়ে সাংসদ নির্বাচিত হন । ২০১৯ সালে শুধু নয়, তার আগের দুটি নির্বাচনেও কংগ্রেসের টিকিটে ডালুবাবু জয়লাভ করেছিলেন। দুবারই জয়ের মার্জিন ছিল লক্ষাধিক ভোটের। ২০১৯ সালে অতি কষ্টে জয় আসে। পাঁচ বছর কেটে গিয়েছে। এবার ডালু বাবু নয়, ভোটে প্রার্থী তাঁর ছেলে ঈশা খান চৌধুরী। ঈশা খান চৌধুরী ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে সুজাপুর বিধানসভা কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন যেখানে তাঁর শোচনীয় পরাজয় ঘটে তৃণমূলের কাছে। মাত্র ১০ শতাংশের সামান্য বেশি ভোট জুটেছিল তাঁর। এবার তিনি মালদা দক্ষিণ লোকসভা কেন্দ্রে ভোটে দাঁড়িয়েছেন, সুজাপুর এই কেন্দ্রেরই একটি বিধানসভা ক্ষেত্র। মালদা দক্ষিণ লোকসভা কেন্দ্রের নিরিখে সুজাপুর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণও বটে। প্রথমে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক, মালদা দক্ষিণ লোকসভা কেন্দ্রের অধীন বিধানসভা কেন্দ্রগুলির দিকে এবং বিধানসভা ভিত্তিক রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের দিকে।
মালদা দক্ষিণ লোকসভা কেন্দ্রে সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে পাঁচটি কেন্দ্র মালদা জেলার অন্তর্গত। এগুলি হল ইংরেজবাজার বা ইংলিশবাজার, মানিকচক, মোথাবাড়ি,সুজাপুর ও বৈষ্ণবনগর। অন্যদিকে, দুটি বিধানসভা কেন্দ্র মুর্শিদাবাদ জেলার অন্তর্গত এগুলি হল সামশেরগঞ্জ ও ফারাক্কা। এই সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে একমাত্র ইংলিশ বাজার বাদ দিলে সবগুলি রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে। ইংলিশ বাজারের বিধায়ক শ্রীরূপা মিত্র বিজেপির হয়ে লোকসভা কেন্দ্রের প্রার্থী। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনটি বিধানসভা কেন্দ্রে লিড নেওয়ার পাশাপাশি, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মালদা দক্ষিণের সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে ইংলিশ বাজার ছাড়া বৈষ্ণবনগরে তৃণমূলের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পেরেছিল বিজেপি। ২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে গনিখানের মালদায় রীতিমত ক্ষীণবল হতে শুরু করে কংগ্রেস- যে প্রক্রিয়াকরণ ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের সময় বেশ ভালোভাবে চোখে পড়েছিল। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আঙ্গিকে প্রশ্ন জমাট বাধঁতে থাকে, মালদা দক্ষিণে ঘাসফুল নাকি পদ্মফুল?
পরিসংখ্যান বলছে, বরকত গনি খানের মালদায় যতই ধর্মীয় মেরুকরণের জোরে বিজেপি শক্তিবৃদ্ধি করুক, তৃণমূলের শক্তি যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে বিগত কয়েকবছর। ৮৬ বছরের প্রবীণ ডালুবাবু এবার ভোটের ময়দানে না থাকলেও ভোটের কিছুদিন আগে থেকে এবং বিগত কিছুদিন ধরেই অধীর রঞ্জন চৌধুরীর সঙ্গে ভিন্ন মত পোষণ করে তৃণমূলের সঙ্গে জোট চেয়েছিলেন। বঙ্গে বামেদের সঙ্গে সখ্যতা করে কোন লাভ নেই, তা তিনি বারবার বলেছিলেন। তিনি একদা জানিয়েছিলেন রাজ্যে তৃণমূলের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কংগ্রেসের লাভ কারণ বামেরা রাজ্যে অত্যন্ত হীনবল, তৃণমূল শক্তিশালী। তবে বিষয় হ’ল, নিজের অবস্থানে কখনোই অটল থাকেন নি ডালুবাবু । তৃণমূলের শেষের প্রহর তিনি যেমন ঘোষণা করেছেন, আবার কখনও নরেন্দ্র মোদির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। গত কয়েকবছরে ডালুবাবুর অবস্থানের মত মালদা দক্ষিণে টলমল করেছে কংগ্রেসের অবস্থা। ডালুবাবু যাই বলুন, অধীর তত্ত্ব মেনেই বামেদের সঙ্গে জোট বেঁধে রাজ্যে লোকসভা ভোটে নেমেছে কংগ্রেস।যা পট পরিবর্তন হওয়ার ততদিনে হয়েই গিয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

কীভাবে পট পরিবর্তন হয়েছে? ২০১৯ সালের লোকসভা আসনে বিজেপি ভালো ফল করে, মানিকচক, ইংলিশ বাজার এবং বৈষ্ণবনগরে এবং তারা লিড নেয়, লোকসভা ভোটের নিরিখে বাকি চারটি বিধানসভা আসনে লিড ছিল কংগ্রেসের। দু বছরের মধ্যে ভোল পাল্টে যায়, তার প্রমাণ মেলে সুজাপুর বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটের ফলে। গনিখানের পরিবারের চিরকাল প্রভাব থাকা সুজাপুর থেকে যেন কর্পূরের মত উবে গিয়েছিল। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বরকত গনি খানের প্রভাব ধীরে ধীরে কমেছে, মেরুকরণ হয়েছে গেটওয়ে অফ নর্থবেঙ্গলের রাজনৈতিক আবহে। কংগ্রেসের প্রভাব ক্ষীণ যে হয়ে পড়েছে তা প্রথমবার ধরা পড়ার সম্ভাবনা ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে। শুধুমাত্র বিধানসভা ফলের নিরিখেই নয়, রাজনৈতিক ভাবে তৃণমূল বনাম বিজেপির হাওয়া বাকি বঙ্গের মত প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে মালদা দক্ষিণ কেন্দ্রে। সুজাপুর কেন্দ্রে তৃণমূল যদি ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলের ধারেকাছেও যেতে পারে তাহলে মালদা দক্ষিণ কেন্দ্রে লড়াই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে তৃণমূলও বিজেপির মধ্যেই। বিহার – বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেরা মালদহ দক্ষিণ কেন্দ্রে বিজেপির উত্থান বিজেপির ঘোষিত তত্ব ও এজেন্ডার জন্য অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। তাই ২০১৯ সালে মেরুকরণের সন্ধিক্ষণে বিজেপি মালদা দক্ষিণে জয়ের দৌড়ে প্রায় ফিনিশিং লাইনের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। এই সময়ে ধীরে ধীরে শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে তৃণমূল। তাই মনে করা হচ্ছে মালদার মাটিতে বিজেপির উত্থান যতই হোক- শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে বিজেপির পড়ার সম্ভাবনা থেকে গিয়েছে। বিধানসভা ভোটকে যতই প্রামাণ্য অঙ্ক হিসেবে না দেখা হোক – মালদায় বিজেপি বিরোধী শক্তি এককাট্টা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনা দেখেই ডালুবাবু ২০২৩ সালেও একাধিকবার তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধার থিওরি আউড়েছিলেন। আর এক্ষেত্রে বিজেপিকে এবার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তেই হত মালদা দক্ষিণ কেন্দ্রে। সমীকরণ বলছে, কংগ্রেসকে পেছনে ঠেলে শ্রীরূপা মিত্রকে কড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ফেলে দিতে পারেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ গবেষক রায়হান। এমনকি তৃণমূল জিতলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। রাজনৈতিক মহলের মতে, প্রশ্ন হওয়া উচিত এখন একটাই, মালদা দক্ষিণে ঘাসফুল নাকি পদ্মফুল? রায়হান লন্ডনে ভারতীয় হাই কমিশনের সামনে সিএএর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠেছিলেন। কট্টর বিজেপি বিরোধী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন রায়হান। এবার আর বিদেশে নয়, বিশ্বে গণতন্ত্রের সর্ববৃহৎ উৎসবের শরিক হচ্ছেন লোকসভা প্রার্থী হিসেবে। এবার তিনি বিজেপির বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে নামছেন। তিনি নিশ্চিত, গতবারের চেয়ে এবার মালদা দক্ষিণ কেন্দ্রে তৃণমূলের ফল ভালো হতে চলেছে। তিনি জানেন, ইংলিশবাজার- বৈষ্ণবনগর – মানিকচকে বিজেপির কিছু পকেট ভোট রয়েছে। কিন্তু কংগ্রেসের কাছে মাত্র আটহাজার ভোটে হারলেও গত লোকসভা ভোটে বিজেপির ভোট ছিল ৩৪.০৯ শতাংশ। অন্যদিকে তৃণমূল এবং কংগ্রেসের ভোট যোগ করলে যোগফল হয় ৬১.৫৬ শতাংশ। গনি খানের প্রভাব কমতে থাকা ও কংগ্রেসের শক্তি ক্ষয় হওয়ায় রায়হান আশান্বিত। তিনি বিলক্ষণ বুঝছেন, গত লোকসভা নির্বাচনের চেয়ে কিছুটা ভোট বাড়াতে পারলেই তিনি বাজিমাত করতেই পারেন। এবং পরিস্থিতি সেদিকেই মোড় নিচ্ছে। মালদা দক্ষিণ কেন্দ্রে প্রথমবার ঘাসফুল ফোটার সম্ভাবনা প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে ।।
আরও পড়ুন কুর্সির লড়াই : মুর্শিদাবাদ লোকসভা কেন্দ্র, জিতবে কে – সেলিম নাকি আবু তাহের খান ?
মালদা দক্ষিণে ঘাসফুল নাকি পদ্মফুল?


More Stories
কীভাবে ও কেন খু*ন শুভেন্দুর আপ্ত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে?
নীতিশ জমানা শেষ, বিহারের সম্রাট নতুন মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর বুলডোজার মডেল
আশা ভোঁসলের হার্ট অ্যাটাক