পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা, ১১ জুন : 2024 Loksabha Elections এনিয়ে কোনও দ্বিমত থাকার কারণ নেই যে,চতুর্থ দফার ভোটে সারাদেশের নজর থাকছে কৃষ্ণনগর লোকসভা কেন্দ্রে। এর একমাত্র কারণ সাংসদ পদ থেকে বহিষ্কৃত হওয়া মহুয়া মৈত্র আবার এই কেন্দ্রে জেতেন কিনা সেদিকে থাকছে চোখ । ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটে এই কেন্দ্রে বিজেপির কল্যান চৌবে কে ৬৩ হাজার ভোটে হারিয়ে দিয়েছিলেন মহুয়া মৈত্র। সেবার তিনি এই কেন্দ্রের পূর্বতন সাংসদ তাপস পালের ২০১৪ সালে প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে ১০ শতাংশ ভোট বাড়ালেও বিজেপির ভোট বাড়ে ১৩ শতাংশ। কিন্তু বামেদের ভোট প্রায় একুশ শতাংশ কমে যায়।এবার তাঁর প্রতিপক্ষ বিজেপির কৃষ্ণনগরের রানী মাতা অমৃতা রায় এবং সিপিএমের এসএম সাদী। প্রত্যেকেই ভোটে জেতার আত্মবিশ্বাসের কথা বললেও মহুয়া মৈত্রের দিকে নজর একেবারেই অন্য কারণে।
মহুয়া মৈত্র প্রার্থী হিসেবে অন্যদের চেয়ে আলাদা ।হয়তো বঙ্গে ইন্ডিয়া জোটের মুখ সম্ভবত মহুয়া মৈত্র। বঙ্গের বাকি ৪১ জন তৃণমূল প্রার্থীর চেয়ে মহুয়া মৈত্র আলাদা কারণ তিনি বিজেপি বিরোধিতার অন্যতম প্রধান মুখ । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়া জাতীয় রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে তৃণমূলের হয়ে এতটা কেউ আলোচিত হন নি। মহুয়া মৈত্র বিজেপি বিরোধীতার মুখ শুধু তার দলেই নয়, বিজেপি বিরোধী সমস্ত রাজনৈতিক দলের কাছে। ক্যাশ অন কোয়ারি কাণ্ড ঘিরে তার পাশে যতটা তৃণমূল থেকেছে ততটাই থেকেছে বাম – কংগ্রেস । ঘুষের বিনিময়ে তথ্য পাচারের অভিযোগ উঠেছিল মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে। বিজেপি নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ কে অস্বস্তিতে ফেলার জন্য সংসদে তিনি গৌতম আদানির নাম জড়িয়েছেন বলে অভিযোগ। কিন্তু এতে রুখে দেওয়া যায়নি মহুয়া মৈত্রকে । আদানি ও আদানির সংস্থাকে একাধিক ক্ষেত্রে অন্যায়ভাবে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন তিনি। অতঃপর খাঁড়া নেমে আসে তাঁর ওপরে।এথিক্স কমিটির সুপারিশে সাংসদ পদ খারিজ হয়ে যায় মহুয়া মৈত্রের। সম্প্রতি লোকপাল তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছে সিবিআইকে। মহুয়া মৈত্রকে প্রার্থী পথ দেওয়ার পরেও তাঁর অস্বস্তি কাটার লক্ষণ নেই। দুর্নীতিবিরোধী ন্যায়পাল লোকপাল মঙ্গলবার সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই) কে নির্দেশ দিয়েছে যে তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) নেতা মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে ক্যাশ অন কোয়ারি অভিযোগের তদন্ত করতে হবে এবং ছয় মাসের মধ্যে চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দিতে হবে।প্রতি মাসেএই তদন্তের অগ্রগতির রিপোর্ট ও জমা দিতে হবে।
মহুয়া মৈত্রের ওপরে আঘাতের শুরুটা হয় বিজেপির লোকসভার সদস্য নিশিকান্ত দুবেকে দিয়ে। তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে মহুয়া মৈত্র দুবাই-ভিত্তিক ব্যবসায়ী দর্শন হিরানন্দানির কাছ থেকে নগদ এবং উপহারের বিনিময়ে সংসদে প্রশ্ন করেছিলেন। তবে মহুয়া মৈত্র ঘুষের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। অভিযোগ ছিল, মহুয়া মৈত্র ঘুষের বিনিময়ে গৌতম আদানিকে টার্গেট করেন এবং এবিষয়ে তার মূল লক্ষ্য ছিল নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ। এরপরে এথিক্স কমিটি একতরফা ভাবে মহুয়া মৈত্র কে বহিষ্কার করে। তার পাশে ছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানান মহুয়া মৈত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। মমতার মতই পাশে দাঁড়াতে দেখা যায় কংগ্রেস এবং বামেদের। অধীর চৌধুরী সরাসরি দাবি করেন, মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে এথিক্স কমিটির আনা প্রস্তাবে সিলমোহর সংখ্যাগুরুর দাদাগিরি। এবং তিনি এও দাবী করেন মহুয়া মৈত্রর ঘুষ নেওয়ার কোনও তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি । মহম্মদ সেলিম, সরাসরি বলেন সরব হলেই এরকম হবে। মোহাম্মদ সেলিম জানান, রাহুল গান্ধী সাংসদ পদ খারিজ হয় যে কারনে মহুয়া মৈত্রও সেই কারণে ছাড় পাননি।কি বলেছিলেন মহুয়া মৈত্র? প্রথমে দেখে নেওয়া যাক মহুয়া মৈত্রর সংসদে আদানিদের বিরুদ্ধে বক্তব্য। নিউজ লন্ড্রি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী সংসদে ৬২ বার প্রশ্ন করেছেন মহুয়া মৈত্র। মধ্যে ৯ বার তিনি সরব হয়েছেন আদানি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। মূলত তার পাঁচটি বিষয়ে ছিল এবং এর মধ্যে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে আদানি গোষ্ঠীকে অনৈতিকভাবে সুবিধাবাদ চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন মহুয়া মৈত্র । এর মধ্যে অন্যতম আদানি গোষ্ঠীর ধমরা বন্দর কেন্দ্রিক যা কিনা উড়িষ্যার ভদ্রকে অবস্থিত। সেখানে বঙ্গোপসাগর থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন করার বিষয়ে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার প্রশ্ন তোলেন কৃষ্ণনগরের প্রাক্তন সাংসদ । সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পরে তাঁর প্রথম প্রশ্নই ছিল কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রককে, যার সব উত্তর মন্ত্রক দিয়ে উঠতে পারেনি বলেই তথ্যভিজ্ঞ মহল মনে করেছিল ।তাঁর আরও প্রশ্ন ছিল,পারাদীপ বন্দরকে স্টোরেজ প্রজেক্ট থেকে সরিয়ে গেল ও ইন্ডিয়ান ওয়েল বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে শেয়ারে হাত মিলিয়েছে কিনা যে সংস্থা ধমরা বন্দরের মালিক। তিনি ২০১৯ শীতকালীন অধিবেশনে আবার এই প্রাকৃতিক গ্যাস নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেন। তার প্রশ্ন ছিল দুই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ট্রোলিং চুক্তি করেছে কিনা। প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে এবং দরপত্র বিডিং নিয়ে প্রকৃত নিয়মাবলীকে উলঙ্ঘন করা হয়েছে কিনা। পরবর্তীতে মহুয়া মৈত্রই আবার আদানিদের কয়লা আমদানিতে দুর্নীতির সরাসরি উল্লেখ করেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে তিনি এক্স হ্যান্ডেলে আদানিদের বিরুদ্ধে তের হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির তথ্য সম্বলিত অভিযোগ কার্যত জনতার সামনে তুলে ধরেন। বারংবার মহুয়া মৈত্র আদানী গোষ্ঠীকে তুলোধোনা করেন তাঁর ৬২টি প্রশ্নের মধ্যে ৯ প্রশ্নে আদানি গোষ্ঠীকে একের এক সুবিধা দেয়ার অভিযোগ তুললেও হিরানন্দানী গোষ্ঠীর নাম একবারই উঠেছিল। আর নিশিকান্ত দূবে অভিযোগ তোলেন, গৌতম আদানি কেন্দ্রিক প্রশ্ন তোলার জন্য মহুয়া মৈত্র দর্শন হিরানন্দানীর কাছে ঘুষ নিয়েছেন। এবং এই কান্ড প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কে অস্বস্তিতে ফেলার জন্য।

বিজেপির সঙ্গে মহুয়া মৈত্র র সখ্যতা কোনদিনই ছিল না। বরং রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপরে ধন্যবাদ জ্ঞাপন রাখতে গিয়ে মহুয়া মৈত্র বলেছিলেন জাতীয়তাবাদ, মানবাধিকারের প্রতি ঘৃণা, মিডিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি আবেশ, ধর্ম এবং সরকারের অন্তর্নিহিততা, বুদ্ধিজীবী ও শিল্পকলার প্রতি অবজ্ঞা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থায় স্বাধীনতার অবক্ষয়- ভারতে ফ্যাসিবাদ বাড়াচ্ছে। সেই শুরু এবং তখন থেকেই ঠোঁটকাটা মহুয়া মৈত্র কে কেন্দ্রীয় বিরোধিতার কণ্ঠস্বর হিসেবে দেখতে থাকে দেশ। তাই মনে করা হচ্ছে, বিজেপি বিরোধী মুখ হিসেবেই তিনি জিতবেন।রানী মা অমৃতা রায় আশা করছেন তিনি জিতবেন। তাঁর লক্ষ্যে ভোটে জয়লাভ করে উন্নয়ন করা।মহুয়া মৈত্রর ভোটে জয়ের জন্য আরও বাড়তি কিছু তাগিদ রয়েছে।

মহুয়া মৈত্র আবার ভোটে জিততে চান বিজেপির বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠস্বর আরও তীব্র করতে। তিনি মনে করছেন, তাঁর জেতার বিষয়টিকে অনেক আগেই নিশ্চিত করে দিয়েছে বিজেপি তাঁকে একটানা আঘাত করে। আদানি সখ্যতার প্রশ্ন তুলে বিজেপিকে বহুবিধ প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো মহুয়া মৈত্র কি আবার সংসদে বিজেপিকে আদানি প্রসঙ্গে বিঁধতে পারবেন? তারজন্য যে লোকসভা ভোটে আরেকবার তাঁর বাজিমাত করা দরকার। পারবেন কি মহুয়া মৈত্র? কৃষ্ণনগর লোকসভা কেন্দ্রের ভোটাররা তাঁর সঙ্গে থাকেন কিনা এখন এটাই দেখার?


More Stories
ব্রাজিলের জনবহুল এলাকায় আচমকাই ভেঙে পড়ল যাত্রীবাহী বিমান, পাইলট-সহ বিমানের ৬২ জন যাত্রীর মৃত্যু
অধীর চৌধুরী নিজে ডুবলেন, ইন্ডিয়া জোটকে ডোবালেন, বাঁচালেন এনডিএ ও বঙ্গ বিজেপিকে
INDIA Alliance: সরকার গঠন নয়, আপাতত ঐক্যবদ্ধ বিরোধী হিসাবেই সংসদে বসতে চায় ইন্ডিয়া জোট