Home » Lok Sabha Election 2024: কলকাতা উত্তরের কুর্সি দখলের মেগা লড়াইয়ে মুখোমুখি কংগ্রেসি ঘরানার তিন প্রার্থী, এগিয়ে কে?

Lok Sabha Election 2024: কলকাতা উত্তরের কুর্সি দখলের মেগা লড়াইয়ে মুখোমুখি কংগ্রেসি ঘরানার তিন প্রার্থী, এগিয়ে কে?

সময় কলকাতা ডেস্ক, ৩১ মেঃ রাজ্য রাজনীতিতে উত্তর কলকাতা মানেই কংগ্রেসি রাজনীতির আঁতুড়ঘর। স্বাধীনতার পর থেকে এই আসনে নামমাত্র কয়েকবার জয়ী হয়েছেন অ-কংগ্রেসি প্রার্থীরা। ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকাকালীনও বামেরা এই এলাকায় বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা হওয়ারও সাক্ষী কলকাতা উত্তর। প্রতিষ্ঠা লাভের পর থেকে এই আসন ঘাসফুল শিবিরের কাছে হয়ে উঠেছে অভেদ্য দুর্গ। দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে উত্তর কলকাতাবাসীর আশীর্বাদ পেয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনের সপ্তম বা শেষ দফায় রাজ্যের মোট নয়টি কেন্দ্রের মধ্যে এই কেন্দ্রেও রয়েছে ভোটগ্রহণ। এ বারও নিজেদের দুর্গ রক্ষা করতে পারবে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস? নাকি, উত্তর কলকাতায় এবার পরিবর্তনের হাওয়া? কী বলছে এই কেন্দ্রের নির্বাচনী ইতিহাস?

অধুনা উত্তর কলকাতা কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৯ সালে।  কলকাতা জেলায় অবস্থিত দুটি লোকসভা কেন্দ্র কলকাতা উত্তর-পশ্চিম ও কলকাতা উত্তর-পূর্বকে মিলিয়ে এই কেন্দ্রটি গঠিত হয়েছিল।  আত্মপ্রকাশের পর থেকে পরপর তিনবার এই কেন্দ্রটি নিজেদের দখলে রেখেছে তৃণমূল কংগ্রেস। এই কেন্দ্র থেকে ঘাসফুলের টিকিটে জয়ী হয়েছেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০০৯ সালে তিনি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সিপিআইএমের প্রার্থী মহম্মদ সেলিমকে ১ লক্ষ ৯ হাজার ২৭৮ ভোটের ব্যবধানে পরাস্ত করেন। তৃণমূল প্রার্থী পেয়েছিলেন ৫২.৫০ শতাংশ ভোট। ২০১৪ সালে এই কেন্দ্রে তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে বড় ধস নামে। তৃণমূল প্রার্থী সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় পেয়েছিলেন ৩৬.৯৪ শতাংশ ভোট। বিরোধী ভোট সিপিএম, বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। প্রায় ২১ শতাংশ ভোট বাড়িয়ে দ্বিতীয় স্থানে শেষ করে বিজেপি প্রার্থী রাহুল সিনহা। সিপিএমের রূপা বাগচী পেয়েছিলেন ২০.৫০ শতাংশ ভোট। চার নম্বরে শেষ করেছিলেন কংগ্রেস প্রার্থী সোমেন মিত্র। তিনি পেয়েছিলেন ১৩.৬৮ শতাংশ ভোট। ভোট কাটাকাটির অঙ্কে সুদীপ দ্বিতীয়বারের জন্য জয়ী হয়েছিলেন ৯৬ হাজার ২২৬ ভোটের ব্যবধানে। গত লোকসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে লড়াই হয় তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে। আবারও বিজেপির রাহুল সিনহাকে হারিয়ে দেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রায় ১৪ শতাংশ ভোট বাড়িয়ে ১ লক্ষ ২৭ হাজার ৯৫ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন তিনি। বিজেপির ভোট বেড়েছিল ১০.৭১ শতাংশ। কিন্তু সিপিএম ও কংগ্রেসের ভোটব্যাঙ্কে বিশাল ধস নামে। দুটি দল মিলিয়ে প্রায় ২৪ শতাংশ ভোট কমে তাদের। একুশের বিধানসভা নির্বাচনেও এই কেন্দ্রে হোয়াইটওয়াশ হয়ে যায় বিরোধীরা। এই কেন্দ্রের অন্তর্গত চৌরঙ্গি, এন্টালি, বেলেঘাটা, জোড়াসাঁকো, শ্যামপুকুর, মানিকতলা ও কাশিপুর-বেলগাছিয়া কেন্দ্রের প্রত্যেকটিতে জয়ী হন ঘাসফুলের প্রতীকে লড়াই করা প্রার্থীরা।

চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে উত্তর কলকাতায় তৃণমূলের প্রার্থী কে হবেন, তাই নিয়ে চলছিল জোর জল্পনা। বিদায়ী সাংসদ তথা দলের বর্ষীয়ান নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রার্থী করা নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত ছিল শাসক শিবির। দলের একাংশ প্রকাশ্যে সুদীপের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। যদিও তাদের বিদ্রোহ দলনেত্রীর কাছে ধোপে টেকেনি। পুরনো রাজনৈতিক সতীর্থে নিজের আস্থা দেখিয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। চতুর্থবারের জন্য এই কেন্দ্র থেকে সুদীপকে মনোনীত করেছেন তিনি। বিক্ষুব্ধদের অধিকাংশ নেত্রীর পছন্দকে মেনে নিলেও মানতে পারেননি তাপস রায়। কার্যত উত্তর কলকাতার তৃণমূল প্রার্থীর উপর রাগ করে দল ছাড়েন তিনি। ফিরিয়ে দেন দলের দেওয়া সমস্ত পদ। এবং যোগ দেন বিজেপিতে। কলকাতা উত্তরে একজন দক্ষ নেতার অভাব ছিল পদ্মশিবিরে। তাপস যোগ দেওয়ায় সেই অভাব অনেকটা পূর্ণ হয়। এই কেন্দ্র থেকে তাকেই প্রার্থী ঘোষণা করে বিজেপি। অন্যদিকে, কংগ্রেস প্রার্থী করে এ রাজ্যে দলের প্রবীণ নেতা প্রদীপ ভট্টাচার্যকে। তাই কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি কলকাতা উত্তরে এ বারের লড়াই দীর্ঘদিন কংগ্রেসি ঘরানার সঙ্গে যুক্ত থাকা তিন নেতার মধ্যে।

শহর কেন্দ্রিক এই লোকসভা আসনের নিজস্ব একটা গরিমা রয়েছে। এখানেই রয়েছে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ, আর.জি.কর, এন.আর.এস, বেলেঘাটা আইডির মতো বিশ্বখ্যাত হাসপাতালগুলি। দেশের তো বটেই, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগীরা এখানে আসেন চিকিৎসার জন্য। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের-মত দেশের দুই ঐতিহ্যশালী বিশ্ববিদ্যালয়ও এখানে অবস্থিত। এছাড়াও হিন্দু স্কুল, হেয়ার স্কুল, বেথুন কলেজ, স্কটিশ চার্চ-সহ একাধিক প্রসিদ্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে শিয়ালদহ, বড়বাজার, কলেজ স্ট্রিট, ধর্মতলার-মত শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্রগুলি। বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস, আরএসপি- সহ রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলির সদর দফতর এখানেই। এছাড়া জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িও উত্তর কলকাতার গরিমাকে সম্মৃদ্ধ করেছে। এককথায় বলতে গেলে, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে বিশেষ মর্যাদার দাবি রাখে উত্তর কলকাতা।

কলকাতা উত্তরে বরাবর প্রভাব তৃণমূলের। প্রায় প্রতিটি এলাকায় তাদের শক্তিশালী বুথভিত্তিক সংগঠন রয়েছে। আবার এখানে বিদায়ী সাংসদের বিরুদ্ধে ক্ষোভও রয়েছে যথেষ্ট। তাঁকে নিজের কেন্দ্রে বিশেষ সময় দিতে দেখা যায় না বলে অভিযোগ। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, সুদীপের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ দলের একটা বড় অংশ। যদিও এসব তোয়াক্কা না করে, চতুর্থবারের জন্য দিল্লির টিকিট নিশ্চিত করার ব্যাপারে ১০০ শতাংশ আশাবাদী তৃণমূল প্রার্থী।

তৃণমূলের অন্দরে সুদীপ-তাপস উষ্ণ সম্পর্কের কথা প্রায় সকলের জানা। তৃণমূলে থাকাকালীন সুদীপকে ‘নন প্রোডাকটিভ’ সাদা হাতি বলে কটাক্ষ করতেন তাপস রায়। সেই বিবাদ চরমে পৌঁছয় চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে। শীতকালের এক সকালে তৎকালীন বরাহনগরের বিধায়ক তাপস রায়ের বাড়িতে হানা দেয় ইডি। এই ঘটনার পিছনে সুদীপের হাত রয়েছে বলে ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন তাপস। তৃণমূলের পক্ষ থেকে কলকাতা উত্তরে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ঘোষণা হতেই, তাপস জানিয়ে দেন তিনি সুদীপের প্রচারে থাকবেন না। পরে দলীয় ও প্রশাসনিক সব পদ ছেড়ে পদ্মশিবিরে যোগ দেন। দলীয় প্রার্থী সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থনে প্রচারে গিয়ে একদা দলের বিশ্বস্ত সৈনিককে নিশানা করেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “ইডি-সিবিআইয়ের গ্রেফতারের ভয়ে দল ছেড়ে পালিয়েছে।”

আরও পড়ুনঃ Lok Sabha Election 2024: সপ্তম দফার ভোটে অশান্তি এড়াতে মোতায়েন ৯৬৭ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী, বিশেষ নজর থাকছে ভাঙড়েও

প্রাক্তন দল ও দলনেত্রীর বিরুদ্ধে পাল্টা তোপ দেগেছেন তাপস। মমতাকে কেন্দ্রে শরিক দল পরিবর্তনের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি। ঘরের ছেলে হয়েও উত্তর কলকাতার রাজনীতিতে তাঁকে অকেজো করে রাখা হয়েছিল বলে ক্ষোভ ছিল তাপসের। তার রাজনৈতিক উত্থানের পিছনে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। দলীয় ও প্রশাসনিক পদে তাপসকে যাতে জায়গা না দেওয়া হয়, সেই কলকাঠিও নাকি নেড়েছিলেন তিনি। তাই পদ্মশিবিরের প্রার্থী হয়ে সব বঞ্চনার জবাব দিতে প্রস্তুত তাপসও।

সুদীপ ও তাপসের লড়াইয়ে নির্ধারকের ভূমিকা নিতে পারেন কংগ্রেস প্রার্থী প্রদীপ ভট্টাচার্য। এই রাজ্যে কংগ্রেসের অন্যতম অভিভাবক তিনি। একটা সময় নিজের দুই প্রতিপক্ষকে পেয়েছেন সহকর্মী হিসাবে। উত্তর কলকাতার রাজনীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহল প্রদীপই এই কেন্দ্রে ফারাক গড়ে দিতে পারেন। তার সঙ্গে রয়েছে বামেরা। প্রচারে বাম-কংগ্রেস ঐক্যের স্পষ্ট ছবি দেখা গিয়েছে। প্রদীপের সমর্থনে প্রচার করেন ফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু-সহ বামেদের প্রথম সারির নেতা-নেত্রীরা। বয়সকে হার মানিয়ে একদা কংগ্রেসের গড়ের ভোট সমীকরণে তিনি কী প্রভাব ফেলতে পারেন সেটাই এখন দেখার।

About Post Author