পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ২ নভেম্বর : একদিবসীয় ক্রিকেটের ২০২৫ সালের মহিলা বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে জয়ের রেশ এবং ঘোর এখনও কাটছে না ভারতের। মুগ্ধতা কাটছে না জেমিমা রডরিগস এবং হরমনপ্রীত কাউরের অনবদ্য রানচেস ও ম্যাচ জয়ের। কিন্তু রবিবার দিনটা যে আলাদা। নভি মুম্বাইয়ে ডি -ওয়াই প্যাটেল স্টেডিয়ামে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা মুখোমুখি। অস্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ড এবার ফাইনালে নেই।ফলে, এবার মহিলাদের ক্রিকেটে নতুন এক দেশ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে চলেছে । ভারতের মেয়েরা জেতার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হলেও ফাইনালের আগে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক লরা উলভার্ট ফাইনালে ভারতের মেয়েদের চুপ করানোর হুমকি দিয়ে রেখেছেন। তবুও আসমুদ্র হিমাচল স্বপ্ন দেখছে তাদের মেয়ে ক্রিকেটারদের নিয়ে। মহিলা ক্রিকেটারদের নিয়ে এরকম উচ্ছ্বাস আগে দেশ দেখায়নি। দেশবাসীর স্বপ্ন কতটা পূরণ হবে, ভারতের মেয়েরা কি বাজিমাত করবে ? ১৯৮৩ সালের কপিলদেবের ভারতীয় দল প্রথমবার একদিনের ক্রিকেটে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে ভারতীয় ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় তুলে নিয়ে যায়। এবার কী পারবে মেয়েরা? দক্ষিণ আফ্রিকার সম্ভাবনাই বা কতটা? একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন।
২০০৫ সালে বিশ্বকাপ ফাইনালে হয়নি, ২০১৭ সালেও হয়নি স্বপ্ন সফল। ২০০৫ সালের মহিলা বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনালে উঠলেও অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ফাইনালে লড়াই গড়ে তুলতে পারে নি ভারতের মেয়েরা । ভারতীয় প্রমীলা বাহিনী সেদিন মাত্র ১১৭ রানে অল আউট হয়ে গিয়েছিলেন। ৯৮ রানে হেরে যায় তারা। তবে, ২০১৭ সালের মহিলা ক্রিকেট বিশ্বকাপ ফাইনালে তীরে এসে তরী ডুবে ছিল ভারতের । জয়ের একবারে কাছে এসে মিতালি রাজ, ঝুলন গোস্বামীদের ভারত মাত্র ৯ রানে সেদিন হেরে যায়। ২২৮ রান তাড়া করতে নেমে একটা সময় ভারতের রান ছিল ৩ উইকেটে ১৯১। পুনম রাউত ৮৬ রানে ব্যাট করছিলেন। তিনি আউট হতেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল ভারত। সেদিন দলে ছিলেন এবারের দল নেত্রী হরমনপ্রীত কউর, স্মৃতি মান্ধানা, দীপ্তি শর্মা। হরমনপ্রীত সেদিন ব্যাটে রান পেলেও,ব্যর্থ হয়েছিলেন স্মৃতি। দীপ্তি শর্মা চেষ্টা করেছিলেন। দীপ্তি শর্মা আউট হতেই সেবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন মুছে যায়। ২০২৫ সালে ও ভারত ফাইনালে উঠল ২০১৭ সালের মতই অস্ট্রেলিয়া কে হারিয়ে। এবার হরমনপ্রীতের নেতৃত্বে ভারত কি চ্যাম্পিয়ন হতে পারবে? দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে একদিনের ক্রিকেটে ভারতীয় মহিলাদের সাফল্যর পাল্লা ভারী। ৩৪ টি ম্যাচের মধ্যে ভারতের মেয়েরা জিতেছে ২০টিতে দক্ষিণ আফ্রিকার মেয়েরা জিতেছে ১৩ টি তে। একটি ম্যাচে ফলাফল হয়নি। ৩৫ তম ম্যাচটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফাইনালের মহারণ নিয়ে কোচ অমল মজুমদার বলছেন, মেয়েরা আত্মবিশ্বাসী। তবে বোলিংয়ে দলে অনভিজ্ঞতা যে রয়েছে সেকথা তিনি মেনে নিয়েছেন। রেণুকা সিং, দীপ্তি শর্মারা থাকলেও ক্রান্তি গৌড় বা শ্রী চারানিদের অভিজ্ঞতা কম। ফলে পেস ও স্পিন বিভাগে মিশ্র অভিজ্ঞতা। তবে ব্যাটিং লাইনআপের উপরে ভরসা রাখাই যায়। জেমিমা রড্রিগস রয়েছেন সেরা ফর্মে। দক্ষিণ আফ্রিকা শিবির থেকে স্পষ্ট বলা হয়েছে তারা জেমিমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায়। আর স্মৃতি মান্ধানার ফর্ম বরাবরই দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ভালো। ৭৫ এর বেশি গড় তাঁর। হরমনপ্রিতের বিশ্বকাপের নক আউটে রয়েছে অসামান্য রেকর্ড। তিনি নক আউট স্টেজে বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী। এছাড়াও আহত প্রতিকা রাউলের বদলে দলে আসা শেফালী বর্মা তাঁর আক্রমাত্মক খেলার জন্য সুপরিচিত। লোয়ার ব্যাটিং অর্ডারে রয়েছেন বাংলার মেয়ে, উইকেট কিপার ব্যাটসম্যান রিচা ঘোষ। রিচা গ্রুপ লীগে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ৭৭ বলে ৯৪ রান করেছিলেন। তবুও গ্ৰুপ লীগে ভারত জেতার জায়গায় থেকেও হেরে গিয়েছিল স্রেফ নাদিন ডি ক্লার্কের কাছে। ৫ টি ওভার বাউন্ডারিতে ৫৪ বলে ৮৪ রান করে তিনি একাই ম্যাচ ছিনিয়ে নিয়ে যান ডি ক্লার্ক। ভারতের বিরুদ্ধে ফাইনালে প্রধান তিন বাধা দক্ষিণ আফ্রিকার লরা উলভার্ট, পেসার ম্যারিজানে ক্যাপ এবং অলরাউন্ডার ডি ক্লার্ক। সেমিফাইনালে বিধ্বংসী ১৬৯ রান করে উলভার্ট ইংল্যান্ডের সামনে রানের পাহাড় খাড়া করে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় টুর্নামেন্টে আটটি ম্যাচে লরা উলভার্ট ৪৭০ রান করেছেন। তারসঙ্গে বেশ মানানসই অপর ওপেনার ব্রিটস। আর বল হাতে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে গোটা টুর্নামেন্টে মারিজানে ক্যাপ কে ভয়ংকর মনে হয়েছে। ওপেনিং এর জোড়া ফলাকে যেমন দ্রুত আউটের রাস্তা বের করতে হবে তেমনই সামলাতে হবে মারিজানে ক্যাপ কে। অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য যে, ভারতের কোচ অমল মজুমদারকে ডি ক্লার্ককে আটকানোর টোটকা বের করতে হবে। তাহলে অনেকটাই যে বাজিমাত হবে বলাই বাহুল্য। ভারতের বোলিং সাফল্যের জন্য ভারত তাকিয়ে আছে শ্রী চারানি আর দীপ্তি শর্মার স্পিন আক্রমণের দিকে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন স্পিন আক্রমনেই কাবু করা যেতে পারে দক্ষিণ আফ্রিকাকে। তবে, ভারত সাফল্যের জন্য তাদের ব্যাটিং লাইনআপের দিকেই তাকিয়ে থাকবে সেনিয়েও সন্দেহ নেই। আবহাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকলেও ফাইনালের জন্য অতিরিক্ত দিন হিসেবে সোমবার কে রাখা হয়েছে। এখন দেখার তৃতীয়বার ফাইনালে উঠে নতুন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে পারে কিনা মহিলা ক্রিকেট দল।
ভারতের মেয়েরা কি বাজিমাত করবে? মাঝখানে সামান্য কিছুটা সময়। আর সময়ই বলে দেবে অমল মজুমদারের মেয়েরা, ভারতের মেয়েরা হরমনপ্রীতের নেতৃত্বে ফাইনালে শিরোপা জিতবে কিনা। দেশবাসী তাকিয়ে আছে ভারতের মেয়েদের দিকে।১৯৮৩ সালের কপিল দেব ও তাঁর দলের মত হরমনপ্রীত আর তাঁর মেয়েরা এবার ক্রিকেটকে নতুন কোন দিশা দেখায় সেটাও দেখার। যে দেশে মেয়েরা স্বপ্ন দেখতে ভয় পায় সেখানে নতুন সূর্য ওঠার প্রতীক্ষা।।
More Stories
ছিন্নমূলদের আত্মসম্মান ও অহংকারের নাম ইস্টবেঙ্গল, বললেন মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ
স্পেনের সীমান্তে মরোক্কোর অনুপ্রবেশকারী ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মৃত্যুমিছিল অব্যাহত
স্বপ্না বর্মনের অবসর