Home » ভোটার নাহলে কি নাগরিক নয়?

ভোটার নাহলে কি নাগরিক নয়?

পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা, ১৯ নভেম্বর : চঞ্চলতার আবহ, উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রহর। বলা হচ্ছে উদ্বেগ সর্বত্র। উদ্বেগ রয়েছে পাড়ায় পাড়ায়। উদ্বেগ অলিতে গলিতে। উদ্বেগ গ্রামে গ্রামে। উদ্বেগ শহরে বাজারে। উদ্বেগ শুরু হয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে। এসআইআর হওয়া শুরু হতেই উদ্বেগের ভাষা বদলেছে। উদ্বেগের চিত্র পাল্টেছে। কেন এই উদ্বেগ?এসআইআর নিয়ে দু একটি কথা বলা প্রয়োজন। এসআইআর বা স্পেশাল ইন্টেন্সিভ রিভিশন এর বাংলা ভাষায় অর্থ বিশেষ নিবিড় সংশোধন। কী সংশোধন এটাও বলা দরকার। SIR কথাটি সম্পূর্ণ অর্থে এসআইআর অফ ইলেক্টোরাল রোল বা ভোটার তালিকা সংশোধন। বৈধ ভোটার বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়ার নাম এসআইআর।

অন্যদিকে,এনআরসি-র  সম্পূর্ণ কথাটি ‘ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস’ বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জি, যা ভারতের সকল বৈধ নাগরিকের একটি তালিকা।

সিএএ কী তাও জেনে নেওয়া যাক।এই অ্যাক্ট অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় কারণে নিপীড়নের জন্য এ দেশে আসা শরণার্থীদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ওই দেশগুলি থেকে হিন্দু, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ, পার্সি এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের শরণার্থীদের নাগরিকত্ব প্রদানের বিষয়টি সিএএ-তে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এই আইনে মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্তদের কথা বলা হয়নি। অর্থাৎ ওই ছয় সম্প্রদায় ছাড়া পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান বা অন্য কোনও দেশ থেকে আসা অন্য কোনও সম্প্রদায়ের শরণার্থীকে ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া হবে না বলেই উল্লেখ করা হয়েছে।

এসআইআর, এনআরসি ও সিএএ তিনটি আলাদা বিষয় একথা বলাই বাহুল্য। প্রত্যেকটি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা। এদের মধ্যে যোগসূত্র আছে কিনা তা চর্চার বিষয়।

সুস্পষ্ট ভাবে বলা দরকার এসআইআর চালু হতেই মানুষের মনে ভোটার ও নাগরিকত্বর সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসআইআর, সিএএ ও এনআরসি গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। কেউ কেউ এমন তত্ত্ব খাড়া করছেন যে, সংশোধিত ভোটার মানে নাগরিক এবং সেক্ষেত্রে এই তত্ত্ব ও খাড়া করা হচ্ছে সংশোধিত ভোটার তালিকায় যাদের নাম নেই তারা নাগরিক কিনা তা নিয়েও নাকি সংশয় রয়েছে। আরও একধাপ এগিয়ে  বলার প্রশ্ন করা হচ্ছে, কোনও ব্যক্তির ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে  নাগরিক হিসাবে তাঁর মান্যতা থাকবে কি ? অনেক বলার চেষ্টা করছেন এসআইআরের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে নাগরিকত্বর সংজ্ঞা। বিষয়টি যে অপব্যাখ্যা এবং ভোটার এবং নাগরিক যে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় তা অত্যন্ত পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট। নাগরিক ও ভোটার সম্পূর্ণ দুটি আলাদা সংজ্ঞা। একথা সত্য যে, ভোটার মাত্রই দেশের নাগরিক। কিন্তু এ কথা সর্বৈব মিথ্যা ও তত্ত্বগতভাবে ভুল যে ভোটার হলে নাগরিক। ভোটার নাহলেই সে দেশের নাগরিক নয় একথা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। ভোটার দুটি শব্দের সংজ্ঞা পৃথক। নাগরিকত্ব হলো কনস্টিটিউশনাল স্ট্যাটাস বা সাংবিধানিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। ভোটদান হল স্ট্যাটুয়েটারি রাইট বা আইন দ্বারা বিধিবদ্ধ অধিকার। এক্ষেত্রে প্রথমেই উদাহরণ হিসেবে সামনে আনা যেতে পারে ১৮ বছর ভোটারের কথা। সর্বোপরি, সকল নাগরিকই স্বীকৃত ভোটার নয়। এস আই আর এর লক্ষ্য কি? নির্বাচন কমিশন প্রথমেই তাদের লক্ষ্য নির্দিষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে। তারা জানিয়ে দিয়েছে, যারা নাগরিক তাদের নামই কেবলমাত্র সংশোধিত ভোটার তালিকায় থাকবে এবং যারা নাগরিক নয় তাদের নাম সংশোধিত ভোটার তালিকায় থাকবে না। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টে এও নিশ্চিতভাবে ব্যাখ্যা করেছে যে এস আই আর কোনোভাবেই সংশোধিত ভোটার তালিকায় নাম না থাকা ব্যক্তির নাগরিকত্ব খারিজ করার বিষয় চৰ্চা করবে না অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন পরিষ্কার করে দিয়েছে সংশোধিত ভোটার তালিকায় নাম না থাকলেও তিনি নাগরিক নন এ কথা বলা হচ্ছে না। সব মিলিয়ে একথা বলার কোন জায়গা নেই, ভোটার তালিকায় নাম না থাকার অর্থ তিনি নাগরিক নন।

অত্যন্ত স্পষ্ট যে সব ভোটারই নাগরিক কিন্তু সব নাগরিকই ভোটার নন। অন্যদিকে এও স্পষ্ট যে, ভোটার নাহলেও তিনি বা সে নাগরিক হতেই পারেন বা পারে।পাশাপাশি, ভোটার নয় ভারতে বসবাসকারী মানুষ ভারতের নাগরিক নাও হতে পারেন।

তাহলে ভারতীয় নাগরিকদের কেন এই সংশয়, কেন এই টানাপোড়েন?  আতঙ্ক কি শুধু ভোট না দিতে পারার? নাকি ভোটার লিস্টে নাম না থাকলে তাঁকে ভবিষ্যতে নাগরিকত্ব খোয়াতে হতে পারে এরকম ভাবনাই কাজ করছে? নাকি ভারতে বসবাসকারী কোনও ভাবেই ভারতের নাগরিক নন এরকম মানুষদের মনেই আতঙ্ক?  পরবর্তী পর্যায়ে সাধারণ মানুষের বক্তব্য এবং আতঙ্কিত ও প্রান্তিক মানুষের বক্তব্য, নেতাদের বক্তব্য তুলে বিষয়টির গভীরে ঢোকার চেষ্টা করা হবে। পরবর্তী পর্যায়ে এনআরসি এবং সিএএ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে এসআইআরের সঙ্গে তার তাৎপর্যগত যোগসূত্র আছে কিনা তাও চেষ্টা করা হবে।

চলবে

About Post Author