সময় কলকাতা ডেস্ক, ২০ ডিসেম্বর : অশান্ত বাংলাদেশ, উঠছে ভারত বিরোধী স্লোগান, জ্বলছে দীপু চন্দ্র দাসের দেহ, জ্বলছে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়, জ্বলছে আওয়ামী লীগের আমলের নৌপরিবহন মন্ত্রীর বাড়ি, জ্বলছে বাংলাদেশ। প্রমাণের উর্ধ্বে ভারত বিরোধী যুব নেতা হিসাবে পরিচিত হাদির মৃত্যুর পরে ভারত বিরোধিতার সুর আরও চড়া করার প্রেক্ষাপট প্রস্তুত হয়েছে। ভারত বাংলাদেশ সুসম্পর্কের কথা বলা এখন বাংলাদেশে আত্মহত্যার সামিল। তথাপি উন্নততর চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য ভারতে আসতে হচ্ছে বাংলাদেশের নাগরিকদের। দু’দেশের সুসম্পর্ক কামনা করে তাঁরা একযোগে বলছেন মুষ্টিমেয় মানুষ বাংলাদেশে অচলাবস্থা সৃষ্টি করেছে। কারা এই মুষ্টিমেয় মানুষ, কার বা কাদের মদতে হিংসা ছড়াচ্ছেন সে বিষয়ে নীরব থাকছেন উন্নত থেকে উন্নততর চিকিৎসা ব্যবস্থার সুবিধা নিতে ভারতে আগত বাংলাদেশের নাগরিকরা। তাঁরা অভিযোগ করছেন, বাংলাদেশের কিছু কিছু স্থান দুষ্কৃতীদের মুক্তাঞ্চল। তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশের কিছুকিছু জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে ভারত বিরোধী ধর্মের ষাঁড়।ছেড়ে দেওয়া হয়েছে ধর্মের ষাঁড়কে। কারা ভারত বিরোধী ধর্মের ষাঁড় ছেড়েছে, সে প্রসঙ্গে নীরব, নির্বাক ভারতে আগত বাংলাদেশের নাগরিকরা। বাংলাদেশে ভারত বিরোধী ধর্মের ষাঁড় ঘুরছে – অভিযোগের নেপথ্যে কী?
” ভারতে খারাপ কিছু হলেও তা অন্যায়, বাংলাদেশে কিছু খারাপ হ’লে তাও অন্যায় ” – বক্তা জনৈক মেহেদী মেহবুব হাসান। তিনি বাংলাদেশ থেকে শিলিগুড়ি এসেছেন স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে। তিনি অন্যায়ের শ্রেণীবিভাগ করতে রাজি নন, রাজি নন বাংলাদেশে চলতে থাকা অন্যায়ের জবাবদিহি করতে। তিনি চান, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হোক। তিনি শেখ হাসিনার সময়কাল বা ইউনুসের উপদেষ্টা মন্ডলীর সময়কালের মধ্যে কোনটি ভালো, কোনটি খারাপ- তার তুল্যমুল্য বিশ্লেষণ করতে রাজি নন। তবে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু বা সনাতনী সম্প্রদায়ের দীপু দাসের ওপরে ঘৃণ্য আক্রমণকে সরাসরি ধিক্কার জানালেন তিনি। ময়মনসিংহের দীপু চন্দ্র দাসকে গাছের সঙ্গে বেঁধে তাকে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। শুধু মধ্যবয়সী মেহেদী-ই নন,উন্নততর চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসা সেদেশের একাধিক নাগরিক কার্যত ভিন্ন ভিন্ন স্থানে একই বক্তব্য তুলে ধরলেন। এই বক্তব্য প্রকাশ করতে কারও মধ্যে রয়েছে অস্বস্তি, কারও মধ্যে অনভিপ্রেত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বক্তব্য দিতে বিরক্তি। তবুও তাঁরা একই সুরে কথা বলছেন, চাইছেন ভারত বাংলাদেশের সুসম্পর্ক। রংপুর ডিভিশনের কুড়িগ্রাম বা লালমনিরহাট থেকে আসা মানুষদের বক্তব্য একই রকম। কুড়িগ্রামের আজাহার আলি বলছেন, বাংলাদেশের কিছু জায়গায় অশান্তি সৃষ্টি করছে কিছু মানুষ – সমগ্র বাংলাদেশের চিত্র এরকম নয় । তাঁর দাবি, তাঁদের এলাকায় বিভিন্ন ধর্মের ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্পর্ক মধুর। তিনি চান, প্রত্যেকে নিজের নিজের ধর্ম নিজের নিজের মতো করে পালন করুক, কেউ কারও যেন ক্ষতি না করে। যদিও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী আজাহার আলীর বক্তব্যের সম্পূর্ণ সমর্থন করে না। হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের যে অশান্তি দানা বাঁধছিল ও তার মৃত্যুর পরে অশান্তি যেভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে তাতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তাঁর কথা খাটছে না। বাংলাদেশের ভারতীয় হাই কমিশনের কার্যালয় ঘেরাও থেকে চট্টগ্রামের সহকারী হাই কমিশনারের বাড়িতে পাথর নিক্ষেপ বাংলাদেশের অশান্ত পরিস্থিতিতে ভারত বিরোধিতার চিত্রই তুলে ধরে। পাশাপাশি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সনাতন ধর্মের উপরে নির্যাতন ও লুঠতরাজ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বিগত কয়েকদিনে। গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে একাধিক ঘটনায় তা সুস্পষ্ট।
ভারত বিরোধিতার সুর চড়াতে,গণতন্ত্রের কন্ঠরোধে বা সংখ্যালঘুদের আক্রমণে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে ইউনূসের ভূমিকা নিয়ে। প্রথম আলো বা ডেইলি স্টার সংবাদপত্রের অফিস ভাঙচুর ও অগ্নি সংযোগের পাশাপাশি রয়েছে একাধিক ঘটনা যার মধ্যে নৃশংসতম দীপু চন্দ্র দাসের হত্যাকাণ্ড। তাঁর বিরুদ্ধে উন্মত্ত জনতা অভিযোগ তোলে তিনি ধর্মগুরুর অবমাননা করেছেন। দীপুর বাবা রবিলাল দাস ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে জানান, সামাজিক মাধ্যমে প্রথমে ঘটনার কথা জানতে পারেন তাঁরা। তিনি বলেন, “ফেসবুকেই প্রথম খবর পাই। পরে লোকজন বলতে শুরু করে, আমার ছেলেকে মারধর করা হয়েছে। আধঘণ্টা পরে আমার ভাই এসে জানায়, ওকে গাছে বেঁধে রাখা হয়েছে।”রবিলাল দাস আরও বলেন, “ওর গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পোড়া দেহ বাইরে ফেলে রাখা হয়েছিল। দৃশ্যটা ছিল বিভীষিকাময়।” এই ঘটনা কার মদতে তা বলতে পারেননি নিম্নবিত্ত পরিবারের পুত্রহারা রবিলাল দাস।
কেউ কেউ তবুও বলছেন। কেউ কেউ তবুও উপদেষ্টা প্রধানের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি সমালোচনা করেছেন। কেউ কেউ উপদেষ্টা প্রধানের পেছনে ভারত বিরোধী ভিন রাষ্ট্রের ছায়া দেখেছেন। একথা প্রকাশ্যে বলার ফলশ্রুতি ভয়াবহ হয়েছে তাঁদের পরিস্থিতি। ধনে- প্রাণে মারা পড়ছেন তারা । ভারত বিরোধী নেতা হিসেবে পরিচিত হাদির মৃত্যুর পরে, বাংলাদেশের অস্থিরতার, ভারত বিরোধিতার এবং বিষময় সাম্প্রদায়িকতার আবহে, আওয়ামী লীগের নেতাদের বাড়ি ভাঙচুর করা হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ককামী আওয়ামী লীগ সরকারের প্রাক্তন নৌপরিবহন মন্ত্রী খালিদ মেহমুদ চৌধুরীর বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দোষের মধ্যে তিনি বলেছিলেন, ৫ আগস্ট আন্দোলনের নেপথ্যে আবু সাঈদের হত্যাকান্ড ও সম্প্রতি হাদির হত্যাকান্ড একই সুতোয় বাঁধা। তিনি অভিযোগ করেছিলেন উভয় ক্ষেত্রেই ঘাতক স্বয়ং উপদেষ্টা প্রধান ইউনুস। খালিদ সাম্প্রদায়িক হানাহানির অবসান চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশে অচল অবস্থা তৈরি করে ভোট হতে দিতে চাইছেন না ইউনুস। কারণ ক্ষমতা আঁকড়ে থাকাই তার লক্ষ্য, এমনটাই বক্তব্য জানিয়েছিলেন সাবেক মন্ত্রী। শুক্রবার সন্ধ্যা বেলায় তাঁর বাড়িতে আগুন ধরানো হয়। বাংলাদেশের যে কোন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের নেতারা তাই প্রমাদ গুনছেন। ভারতের চিকিৎসার উদ্দেশ্যে আসা মেহেদী বা আজাহার আলিদের চাওয়ার সঙ্গে পাওয়া মিলছে না।
তথাপি একটি বিষয় পরিষ্কার, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাইলে, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক মেলবন্ধনের কথা বললে, সনাতনী ধর্মের হয়ে গলা তুললে এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের অচলাবস্থা ও অন্ধকার দশার জন্য বর্তমান বাংলাদেশের উপদেষ্টাবর্গের ও প্রধান উপদেষ্টার দায় বা মদতের উল্লেখ করলেই ঘাড়ে মাথা থাকবে না। আগুন জ্বলবে, দরকারে পুড়িয়ে দেওয়া হবে সম্পত্তি। নির্যাতন করা হবে, প্রাণেও মেরে ফেলা হতে পারে। যে যত ভারত বিরোধী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পারবে তার তত বাড়বাড়ন্ত অস্থির বাংলাদেশে। বর্তমানে গণতন্ত্রের কন্ঠরোধ, সংখ্যালঘুদের উপরে নির্যাতন, ভারত বিরোধিতাই ইউএসপি বাংলাদেশে নিরাপদ থাকার। গভীর অন্ধকার গণতন্ত্রের, গভীর অন্ধকার ইউনূসের বাংলাদেশের। বাংলাদেশে প্রশ্ন তোলা যাবে না ইউনূসের বিরুদ্ধে। ইউনুস নির্বাচনহীন ক্ষমতা চান, এই কথা বলার দুঃসাহস বাংলাদেশে থেকে কারও পক্ষে করা সম্ভব নয়। খাঁড়া ঝুলছে। অভিযোগ উঠেছে, বাংলাদেশে বেগড়বাই করলে, অপ্রিয় সত্য বললে ধর্মের ষাঁড়দেরও রেয়াত করা হবে না। অভিযোগ, ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য হাদির মত ভারত বিরোধীদেরও জবাই করা হবে ।অতএব, বাংলাদেশে কারা, কেন ভারত বিরোধী ধর্মের ষাঁড় ছেড়েছে, সে প্রসঙ্গে নীরব, নির্বাক থাকতে হয়তো বাধ্য বাংলাদেশের নাগরিকরা। পরিস্থিতি অন্তত তাই বলছে।।
#বাংলাদেশ#বাংলাদেশ


More Stories
লেনিনের মৃত্যু : বিতর্ক এবং বাস্তব
ভিড় সীমান্তে, ভিড় হোল্ডিং সেন্টারে
কলকাতায় পেট্রোলের দাম লিটারে ৪ পয়সা কমল, ডিজেল বাড়ল ৯৪ পয়সা