পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ১৬ জানুয়ারি : অবশেষে নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে তুলেই দিলেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। বৃহস্পতিবারই হোয়াইট হাউসে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নোবেল পুরস্কার ট্রাম্পের হাতে তুলে দিয়েছেন। এই পুরস্কার বিনিময় একটি সত্য প্রকট করে দিল এবং আরও দুটি প্রশ্নের জন্ম দিল। প্রথম প্রশ্ন, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে কি স্বীকৃত হবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প? দ্বিতীয় প্রশ্ন, সর্বক্ষেত্রেই ডোনাল্ড ট্রাম্প কি এই নীতি অনুসরণ করলে – সেই নীতি কি সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে উঠবে? নোবেল পুরস্কার দেওয়া- নেওয়ায় কি শান্তির মধ্যে অশান্তির ইঙ্গিত?
যা চাই তা পেতেই হবে – সেখানে বৈধতা থাকুক বা না থাকুক,তাকে কেউ মানুক বা না মানুক, তার সরকারি বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি থাকুক বা না থাকুক, বাহুবলে হোক বা চাপ সৃষ্টি করে হোক। ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার তেমনটাই বুঝিয়ে দিচ্ছেন। খনিজ তেল বা ভূসম্পদের জন্য অন্য দেশের দখলদারি নেওয়া বা ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা হিসেবে নোবেল প্রাইজ পাওয়া – সর্বত্রই ডোনাল্ড ট্রাম্পের একই মানসিকতা কাজ করছে। ২০২৫ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া মারিয়া করিনা মাচাদোর হাত থেকে নোবেল পুরস্কার নিয়ে নিজেকে ও নিজের মানসিকতাকে আরো একবার প্রকট করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ট্রাম্পের শান্তি পুরস্কার কি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হবে নোবেল শান্তি কমিটির মাধ্যমে?
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০২৫ সালে ক্ষমতায় এসেই তার নজর ছিল নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার। নোবেল শান্তি কমিটির পক্ষে তাঁকে ২০২৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া সম্ভব ছিল না কারণ নোবেল শান্তি কমিটি প্রতিবছর ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সম্ভাব্য বিজয়ীদের কার্যকলাপ দেখে সেই অনুযায়ী সে বছরের নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করে থাকে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকৃতপক্ষে ও আনুষ্ঠানিকভাবে জানুয়ারি মাসের ২০ তারিখে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কার্যভার গ্রহণ করেন। নোবেল শান্তি কমিটির পক্ষে প্রাণকে পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে বিবেচনা করার জন্য হাতে ছিল মাত্র ১২ দিনে ট্রাম্পের কাজ। স্বাভাবিকভাবেই তাঁকে উপযুক্ত পুরস্কার প্রাপক হিসেবে বিবেচনা করা সম্ভব ছিল না নোবেল শান্তি কমিটির পক্ষে। তারা নোবেল শান্তি পুরস্কার তুলে দেয় মারিয়া করিনা মাচাদোকে।
কেন মাচাদোকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছিল? কেন যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাঁকে? পুরস্কার ঘোষণা করার পরে নোবেল কমিটি এক্স পোস্টে জানায় “ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্য গণতান্ত্রিক অধিকার প্রচারে তার অবদানের জন্য এবং শান্তিপূর্ণভাবে একনায়কতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে রূপান্তর আনতে তার সংগ্রামের জন্য এই পুরস্কার দেওয়া হয়।”নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়রগেন ওয়াটনে ফ্রিডনেসআরো বলেন, “গত বছর, মাচাদোকে লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল। তার জীবনের ওপর গুরুতর হুমকি সত্ত্বেও তিনি দেশে থেকেছেন, এই সিদ্ধান্ত লাখ লাখ মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে”।তিনি আরও বলেন, “মাচাদো ২০ বছরেরও বেশি আগে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, অর্থাৎ বন্দুকের বদলে ব্যালটকে বেছে নিয়েছিলেন”।
তথাপি ৫৮ বছর বয়সী মারিয়া করিনা মাচাদোকে ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিতর্কিত হয়ে ওঠে। তাঁর বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ হলো মাচাদো ইসরায়েল এবং গাজায় বোমা হামলার প্রকাশ্য সমর্থক।তিনি ইসরায়েলের লিকুদ পার্টির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেন এবং তিনি ক্ষমতা এলে ভেনেজুয়েলার দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুসালেমে স্থানান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হিসেবে দেখা হয়।বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের সমর্থনে মাচাদো তার নিজের দেশের সরকারকে উৎখাত করার জন্য আগেও সচেষ্ট হয়েছিলেন (এবার খোলাখুলি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা করেছেন। মাদুরোকে অপহরণ করার জন্য।) শান্তি পুরস্কারের জন্য এমন একজনকে বেছে নেওয়াকে অনেক মানবাধিকার কর্মী ও সংস্থা “অযৌক্তিক” বলে মনে করেন। সর্বশেষ যে বিষয়টি সবচেয়ে বিতর্কিত হয়ে ওঠে তা হল নোবেল শান্তি কমিটি না চাইলেও তাঁর পুরস্কার ট্রাম্পের হাতে তুলে দেওয়া।
বলা বাহুল্য,নোবেল পুরস্কার জেতার পর মাচাদো এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উৎসর্গ করেছিলেন। ট্রাম্প বরাবরই এই পুরস্কার পাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা রাখতেন, তাই মাচাদোকে এই সম্মান দেওয়া ট্রাম্প মেনে নিতে পারেননি। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসন ও তার সমর্থকরা মাচাদোর ট্রাম্পকে পুরস্কার উৎসর্গ করাকে একটি রাজনৈতিক চাল হিসেবে সমালোচনা করেন।ডোনাল্ড ট্রাম্পের অসন্তোষ থেকেই যায়। মাচাদোর নোবেল জয়কে তিনি তার নিজের প্রতি “চরম অবমাননা” হিসেবে ঘোষণা করেন । অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার খনিজ তেলের প্রতি আকর্ষণ তাঁকে ভেনেজুয়েলায় চরম পরদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে। রাষ্ট্রপ্রধান নিকোলাস মাদুরোকে তিনি অপহরণ করেন। ভেনেজুয়েলার তেলের ওপরে অধিকার কবজা করেন ট্রাম্প। সেদেশের অধিকার কব্জা করে নিজেকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করে দেন ট্রাম্প। ভেনেজুয়েলার নির্বাচনের বিষয়ে তিনি মুখ খোলেননি এবং ট্রাম্প এনিয়ে জানান যে, মাচাদোকে তিনি ভেনেজুয়েলার নেতা হিসেবে সমর্থন করেন না, কারণ তার মতে মাচাদোর প্রতি দেশের জনগণের পর্যাপ্ত সম্মান ও সমর্থন নেই। ট্রাম্প জানান, ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে এবং তিনি বুঝেছেন তার পছন্দের নেত্রী মাদুরো অপহরণ পরবর্তী ভেনেজুয়েলার বর্তমান প্রেসিডেন্ট দেলসি রোদ্রিগেজ। সমস্যা হল, রোদ্রিগেজ আবার জানিয়ে দেন, ট্রাম্পের বক্তব্যের তিনি ঘোরতর বিরোধী। অন্যদিকে, নতুন ঘটনাপ্রবাহে ভেনেজুয়েলায় ফেরার তোড়জোড় শুরু করেছিলেন সেদেশের ক্ষমতায় আসতে আগ্রহী মাচাদো। তিনি বুঝেছিলেন, ডোনাল্ডো ট্রাম্পের সহযোগিতা ছাড়া ক্ষমতা পাওয়া তো দূরের কথা, দেশে ফেরাই অসম্ভব। সে ক্ষেত্রে, আবার তিনি নোবেল পুরস্কারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। মাদুরোকে অপহরণ করায় ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি নিজের নোবেল পুরস্কার ট্রাম্পকে তুলে দেওয়ার জন্য আরও একবার ইচ্ছে ও বাসনা প্রকাশ করতে শুরু করেন। ট্রাম্পেরও নোবেল পুরস্কার পাওয়ার জন্য তীব্র বাসনা প্রশমিত হয়নি। তবুও নোবেল শান্তি কমিটির বক্তব্য এক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ছিল।
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি ও নরওয়েজিয়ান নোবেল ইনস্টিটিউট যৌথভাবে বলেছে, ‘একবার নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হলে তা প্রত্যাহার করা যায় না, ভাগাভাগি করা যায় না বা অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করা যায় না। এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত এবং চিরকালের জন্য বহাল থাকে। এতদ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায় – নোবেল শান্তি পুরস্কার শুধুমাত্র পদক হিসাবে উপহার পেতে পারেন ট্রাম্প যা ব্যক্তিগতভাবে তুলে দিয়েছেন মাচাদো। ট্রাম্পের নোবেল পুরস্কার শুধুমাত্র একটি উপহারের স্তরে থেকে যায়। নোবেল পুরস্কার প্রাপক হিসাবে এবং নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে কোনো সিলমোহর থাকছে না।
তথাপি ট্রাম্প পুরস্কার উপহার হিসেবে নিয়েছেন।হোয়াইট হাউসে মাচাদো নিজে মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে নোবেল পুরস্কার তুলে দেন। হোয়াইট হাউসে সাক্ষাতের পর ট্রাম্প বলেন, ‘আমি যে কাজ করেছি তার জন্য মাচাদো আমাকে তার নোবেল শান্তি পুরস্কার দিয়েছেন।’ তিনি মাচাদোকে ‘একজন অসাধারণ মহিলা’ বলেও প্রশংসা করেন এবং বলেন, “এই পদক দেওয়া ছিল পারস্পরিক সম্মানের একটি সুন্দর উদাহরণ। “
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে নোবেল ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, মাচাদো আদতে তাঁর নোবেল পুরস্কার ট্রাম্পকে দিতে পারেন না। এই ঘটনাটি মূলত প্রতীকী। তবুও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ট্রাম্প এতদিন কার্যত মাচাদোকে রাজনীতিতে পাশ কাটিয়ে দিয়েছেন, যদিও তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভেনেজুয়েলার প্রতিরোধ আন্দোলনের মুখ ছিলেন। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে ট্রাম্প এই পুরস্কারটি নিজের কাছেই রাখবেন। সুতরাং পুরস্কার দেওয়া- নেওয়া এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের বক্তব্য বুঝিয়ে দেয় মাচাদো নোবেল পুরস্কারের বিনিময়ে ট্রাম্পের গুডবুকে নাম তোলার ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রসর হতে পেরেছেন।
এবার উঠে আসে দ্বিতীয় প্রশ্ন। শান্তির মধ্যে অশান্তির ইঙ্গিত নিহিত? নোবেল পুরস্কারের মত কি কেউ না মানলেও তাঁর কাঙ্ক্ষিত এবং কাম্য সবকিছুই কব্জায় পেতে চান ডোনাল্ড ট্রাম্প? বিষয়টি সর্বজনগ্রাহ্য না হয়ে উঠলে সেক্ষেত্রে কী হবে? গ্রিনল্যান্ড দিয়েই ডোনাল্ড ট্রাম্প বিষয়টির উত্তর দিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড পছন্দ করুক না করুক গ্রিনল্যান্ড তার চাই। সহজ বা কঠোরভাবে তিনি গ্রিনল্যান্ড দখল করবেন। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড মাচাদর নোবেল পুরস্কার নয় যে গ্রিনল্যান্ড বিনাবাক্য ব্যয় করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তা তুলে দেবে।আর এখানে বিপদ। ইংল্যান্ডে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে ডেনমার্ক। গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক জানিয়ে দিয়েছে ট্রাম্প তাদের দেশে আগ্রাসী নীতি চালালে প্রথমে চলবে গুলি,তারপরে আলোচনা।
ইরান হোক বা গ্রিনল্যান্ড – কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব খর্ব করা যায় না তার উল্লেখ রাষ্ট্রসঙ্ঘের সনদে আছে। রাষ্ট্রসংঘ পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, প্রতিটি দেশের সার্বভৌমত্বের পবিত্রতায় তারা বিশ্বাস করে। কিন্তু সে কথা ট্রাম্প মানলে তো? ইরান বা গ্রিনল্যান্ড স্পষ্ট করে দিয়েছে ট্রাম্প যা চান তা পেতে গেলে শুরু হবে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। মাচাদোর মত কেউ উপহার সাজিয়ে রাখেন নি ট্রাম্পের জন্য। নোবেল পুরস্কারের মত সবকিছু ট্রাম্প পেতে চাইলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবল সামরিক শক্তিধর দেশ হলেও কেউ গোলাপ দিয়ে কার্পেট বিছিয়ে রাখবে না তাও অনিবার্য। শান্তি পুরস্কারের উপহারের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সংঘাত ও অশান্তির ইঙ্গিত।
# শান্তির মধ্যে অশান্তির ইঙ্গিত #ডোনাল্ডট্রাম্প #মাচাদো


More Stories
জার্সিতে যৌন অপরাধে প্রাক্তন শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
হরমুজ প্রণালী, রান্নার গ্যাস ও তেল এবং ভারত -ইরানের সম্পর্ক
বিপত্তারিণী রক্ষাকবচ, অবশেষে হরমুজ প্রণালী ভারতের জন্য খুলে গেল, রান্নার গ্যাস আসছে