পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ৫ ফেব্রুয়ারি : ভারত-চিন সীমান্তে চিনের আগ্রাসন এবং ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্তহীনতার অভিযোগ।মাসের শুরু থেকেই প্রাক্তন সেনাপ্রধানের লেখা একটি বই এবং তার কিছু বিতর্কিত অংশ ঘিরে সংসদ উত্তাল। বিতর্কের সূচনা করেছেন রাহুল গান্ধী। সংসদে লাদাখ সীমান্ত পরিস্থিতি এবং প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ মুকুন্দ নারাভানে-র লেখা অপ্রকাশিত বই ‘ ফোর স্টারস অফ ডেসটিনি ‘ (Four Stars of Destiny) নিয়ে রাহুল গান্ধী সংসদে সরব হন।এই বিতর্কের মূল বিষয় ছিল অধিবেশনে রাহুল গান্ধী প্রথমবার জেনারেল নারাভানের বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে ২০২০ সালে ভারত ও চিনের মধ্যে লাদাখ সংঘাতের সময় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি একটি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ওই বইয়ের কিছু অংশ পড়ে শোনানোর চেষ্টা করলে রাজনাথ সিং ও অমিত শাহ তীব্র বিরোধিতা করেন। সোমবার ও মঙ্গলবার (২ ও ৩ জানুয়ারি )রাহুল গান্ধী সংসদে নারাভানের বই এবং লাদাখ ইস্যু নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেন। রাহুল গান্ধী সংসদে ওই বইটির একটি মুদ্রিত কপি হাতে নিয়ে প্রবেশ করেন এবং দাবি করেন যে সরকার সত্য গোপন করতে বইটি প্রকাশে বাধা দিচ্ছে। তীব্র হট্টগোল শুরু হয়।এখন জানা দরকার এই বিতর্কের সূত্রপাত যে বই ঘিরে তার লেখক এবং বইটির বিষয় নিয়ে :
পর্ব ১: এম এম নরবনে ও ফোর স্টারস অফ ডেস্টিনি’
জেনারেল মনোজ মুকুন্দ নরবনে (M.M. Naravane) ভারতের ২৮তম সেনাপ্রধান ছিলেন (২০১৯-২০২২)। ‘ফোর স্টারস অফ ডেস্টিনি’ (Four Stars of Destiny) তাঁর লেখা একটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ, যা নিয়ে বর্তমানে ভারতের রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা মহলে ব্যাপক বিতর্ক। প্রাক্তন সেনাপ্রধান সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যাক:
মনোজ মুকুন্দ নরবণে (জন্ম : ২২ এপ্রিল ১৯৬০) ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন অবসপ্রাপ্ত জেনারেল। তিনি ভারতের প্রাক্তন সেনাপ্রধান। এর আগে তিনি উপসেনাপ্রধান এবং ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক ছিলেন। তিনি ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ থেকে ৩০ এপ্রিল ২০২২ পর্যন্ত সেনাপ্রধান ছিলেন।
Oplus_131072
৪৪৮ পৃষ্ঠার এই বইটিতে জেনারেল নরবনে তাঁর চার দশকের বেশি সময়ের বর্ণাঢ্য সামরিক কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন—একজন তরুণ অফিসার হিসেবে সিকিমে চীনের সঙ্গে প্রথম মোলাকাত থেকে শুরু করে গালওয়ানে সেনাপ্রধান হিসেবে পরিস্থিতি সামলানো পর্যন্ত বর্ণনা রয়েছে।
বইটিতে ২০২০ সালের পূর্ব লাদাখ ও গালওয়ান সংঘর্ষের সময় ভারত-চীন উত্তেজনার কিছু অপ্রকাশিত এবং সংবেদনশীল তথ্য রয়েছে। এতে তৎকালীন সংকটময় মুহূর্তে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা ও সেনাপ্রধান হিসেবে তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর বিবরণ দেওয়া হয়েছে। বইটিতে বহু তথ্য থাকলেও বিতর্কিত অংশ কি কি ও মূল বিতর্ক কোথায়?
বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘অগ্নিপথ’ বা ‘অগ্নিবীর’ নিয়োগ প্রকল্পটি সেনা কর্মকর্তাদের কাছে একটি “বিনা মেঘে বজ্রপাত” বা আকস্মিক ঘটনার মতো ছিল। সেনাপ্রধান হিসেবে তিনি প্রথমে শুধুমাত্র সীমিত মেয়াদে নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পরে তা পুরো সশস্ত্র বাহিনীর জন্য বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ।আগেই বলা হয়েছে যে, ২০২০ সালে পূর্ব লাদাখে ভারত ও চীনের মধ্যকার উত্তেজনাকর পরিস্থিতি এবং গালওয়ান উপত্যকার সংঘর্ষ সম্পর্কে এতে কিছু স্পর্শকাতর তথ্য রয়েছে । বিশেষ করে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় বা লাইন অফ একচুয়াল কন্ট্রোলে (LAC) চীনা বাহিনীর গতিবিধি এবং ভারতীয় সেনার পাল্টা পদক্ষেপের রণকৌশল নিয়ে আলোচনা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এম এম নরবনে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি প্রতিরক্ষা বাহিনীর পরিচালনা পদ্ধতি, নেতৃত্ব এবং সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের সীমানা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোকপাত করেছেন। বিতর্ক তা নিয়েও।
প্রকাশনা স্থগিত ও সেন্সরশিপ নিয়ে রয়েছে বিতর্ক।বইটির কিছু অংশ প্রকাশ্যে আসার পর প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এটি পর্যালোচনা (Review) করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং এর প্রকাশনা স্থগিত করে দেওয়া হয় । বিরোধী দলগুলি, বিশেষ করে রাহুল গান্ধী সংসদে এই বইটির উদ্ধৃতি দিয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন, যা রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়।
অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে অপসারণ নিয়েও বিতর্ক। বইটির বিতর্কিত অংশগুলি নিয়ে হইচই শুরু হওয়ার পর আমাজন এবং ফ্লিপকার্টের মতো ই-কমার্স সাইটগুলি থেকে বইটির লিস্টিং সরিয়ে ফেলা হয়, যা নিয়ে বাকস্বাধীনতা ও সেন্সরশিপের প্রশ্ন উঠেছে।
বইটি মূলত ২০২৪ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সংবেদনশীল সামরিক তথ্যের কারণে ভারত সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের কাছ থেকে এটি এখনও চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি ।
বিতর্ক কোথায়? রাহুল গান্ধী একটি ম্যাগাজিন নিবন্ধ (দ্য ক্যারাভান) থেকে ফোর স্টারস অফ ডেসটিনি সম্পর্কে তথ্য নিয়ে সংসদে উদ্ধৃত করার চেষ্টা করেছিলেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং বিজেপি নেতারা অভিযোগ করেন যে, অপ্রকাশিত বা সরকার কর্তৃক অনুমোদিত নয় এমন কোনো বইয়ের তথ্য সংসদে উদ্ধৃত করা নিয়মবিরুদ্ধ । রাহুল গান্ধী দাবি করেন যে বইটি বিদেশে প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু ভারত সরকার এখানে এটি নিষিদ্ধ করেছে । তবে সরকারি সূত্র অনুযায়ী, বইটি এখনও প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের পর্যবেক্ষণে (Review) রয়েছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়নি। রাহুল গান্ধী দাবি করেন যে, লাদাখ সংকটের সময় প্রকৃত সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেছিলেন । বিজেপি এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে জানায় যে এটি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে; আসলে সেনাবাহিনীকে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা (Carte Blanche) দেওয়া হয়েছিল ।
তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, রাহুল দাবি করেন জেনারেল নারাভানে বইতে লিখেছেন যে তিনি সংকটের সময় “একা” বা “পরিত্যক্ত” বোধ করেছিলেন। বিজেপি নেতাদের মতে, নারাভানে বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যে সরকারের সাথে সমন্বয়ের কথা বলেছেন, তাই রাহুলের এই দাবি তথ্যের অপলাপ।
রাহুল গান্ধী এই বইটিকে তথ্যের সত্যতা প্রমাণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইলেও, বিজেপি এটিকে অপ্রমাণিত উৎস এবং সংসদীয় নীতি বহির্ভূত বলে অভিহিত করেছে।
রাজনৈতিক সংঘাতের গভীরে নিশ্চিতভাবেই কিছু সত্য রয়েছে এবং তারচেয়েও বহু গুনে তাৎপর্যপূর্ণ দেশের নিরাপত্তা ও অখন্ডতা ফোর স্টারস অফ ডেসটিনি বইটির মাধ্যমে যা রাহুল গান্ধী তাঁর বক্তব্যে প্রকাশ করলেও তিনি বহু তথ্যগত ভুল করেছেন।পাশাপাশি, নিশ্চিতভাবে প্রতিরক্ষা বিষয়ক ক্ষেত্রে লাদাখে চিনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত নিতে গড়িমসি এবং প্রকৃত দিশা দেখানোর অভাবের উল্লেখ ও ইঙ্গিত রয়েছে। রাহুল গান্ধীর তথ্যের ভুল, সরকারের প্রতিরক্ষাগত সিদ্ধান্ত নিয়ে নরবানের সমালোচনা, এবং কীভাবে লাদাখে লাইন অফ একচুয়াল কন্ট্রোলে চিন আগ্রাসন হয়েছিল? তার মোকাবিলা কতটা করা হয়েছিল?ভারত চীন যুদ্ধ পরিস্থিতি কোন স্তরে?ফোর ষ্টারস অফ ডেস্টিনি কী বলছে?বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতি কোন অবস্থায়? তা থাকছে পরবর্তী পর্বে।
More Stories
জার্সিতে যৌন অপরাধে প্রাক্তন শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
হরমুজ প্রণালী, রান্নার গ্যাস ও তেল এবং ভারত -ইরানের সম্পর্ক
বিপত্তারিণী রক্ষাকবচ, অবশেষে হরমুজ প্রণালী ভারতের জন্য খুলে গেল, রান্নার গ্যাস আসছে