চুমকী সূত্রধর ও পুরন্দর চক্রবর্তী , সময় কলকাতা ডেস্ক : ফল প্রকাশিত। বঙ্গে অদ্যাবধি মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক, জয়েন্ট এন্ট্রান্স ফল প্রকাশেও রাজ্যব্যাপী এত আগ্রহ দেখা যায় নি যা হয়েছে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির এসআইআর-এর (SIR )চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ ঘিরে। অবশেষে বাংলায় এসআইআর (SIR)-এর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হল। রাজ্যে এসআইআর শুরুর প্রথম দিন থেকেই বাংলার মানুষ এই আল্টিমেটামের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। শেষমেশ তা প্রকাশ্যে এল। তবে এখনই সম্পূর্ণ চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ পেল না। আপাতত বাদ গেল প্রায় ৬৩ লাখ ভোটারের নাম । বলা বাহুল্য, প্রাথমিক তালিকায় ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছিল, অর্থাৎ সেদিক থেকে ধরলে আরও যে সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ল তা প্রায় ৪ লক্ষ বলা যেতেই পারে । ৭ কোটি ৪ লক্ষ ভোটার থাকলেও বিচারাধীন রয়েছে ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ভোটারের নাম। সুতরাং সেদিক থেকে বাতিল ও বিচারাধীন থাকা মোট ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৩ লক্ষ। উল্লেখ্য প্রাথমিক তালিকায় বাদ পড়েছিল মৃত ভোটার, ভুয়ো ভোটার, স্থানান্তরিত এবং ডবল ও ট্রিপল এন্ট্রি ভোটারের নাম। তবে নির্বাচন কমিশন আগেই স্পষ্ট করেছে যে শনিবার যে তালিকা প্রকাশ পাচ্ছে , সেটি কার্যত স্টেটাস-ভিত্তিক একটি চূড়ান্ত খসড়া — এখনও সব দিক থেকে সম্পূর্ণ ফাইনাল নয়। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) যে তালিকা প্রকাশ পেয়েছে যেখানে ভোটারদের ‘অনুমোদিত’, ‘বাতিল’ বা ‘বিচারাধীন’—এই তিনটি ভাগে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নির্যাস : বঙ্গের ভোটারদের নাম তিন ভাবে বিভক্ত করে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত
অনুমোদিত ভোটার : ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (Special Intensive Revision – SIR) পর ভোটার তালিকায় অনুমোদিত ভোটারের মোট সংখ্যা হলো ৭.০৪ কোটি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে তালিকার বর্তমানে সংশয়ের ঊর্ধ্বে থাকা অনুমোদিত মোট ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৭.০৪ কোটি।
বিচারাধীন (Under Adjudication) ভোটার: প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটার বর্তমানে ‘বিচারাধীন’ বিভাগে রয়েছেন, অর্থাৎ তাঁদের ভোটাধিকার নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে ধাপে ধাপে প্রকাশিত সম্পূরক তালিকার মাধ্যমে জানানো হবে।
বাতিল ভোটার: সংশোধন প্রক্রিয়ায় প্রায় ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
নতুন সংযোজন: সংশোধনীর মাধ্যমে ১.৮২ লক্ষেরও বেশি নতুন ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
কমিশন জানিয়েছে যে ‘বিচারাধীন’ হিসেবে চিহ্নিত ভোটাররা তাঁদের মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা ভোট দিতে পারবেন না।
বিস্তারিত : কেউ বলেছিলেন, এক কোটি। কেউ বলেছিলেন, ৮০ লক্ষের বেশি। এসআইআর-র চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় কতজনের নাম বাদ যাবে, তা নিয়ে বিজেপি নেতারা নানা মন্তব্য প্রথম থেকেই করছিলেন। বছরের শুরুতেই এসআইআর নিয়ে বড় ভবিষ্যদ্বাণী করে বসেছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। সাফ বলেছিলেন, ব্রেকফাস্ট হয়ে গিয়েছে, ১৪ ফেব্রুয়ারি লাঞ্চ হবে।
এদিকে, বাংলার শাসকদল তৃণমূল আবার অভিযোগ করেছে, কমিশনের অফিসে বসে জোর করে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। গত বুধবারই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, সব মিলিয়ে দেখে মনে হচ্ছে ১ কোটি ২০ লক্ষ নাম বাদ দিয়ে দিতে পারে।
রাজনৈতিক এই চাপানউতোরের মধ্যেই ২৮ ফেব্রুয়ারি, শনিবার বাংলায় এসআইআর-র চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করল জাতীয় নির্বাচন কমিশন। আর সেই তালিকায় দেখা গেল, ৬৩ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছে। তবে এখনও ৬০ লক্ষ নাম অমীমাংসিত রয়েছে। সেখান থেকে কত নাম বাদ যেতে পারে, তা নিয়ে জল্পনা জারি রইল। তবে নির্বাচন কমিশন আগেই স্পষ্ট করেছে যে শনিবার যে তালিকা প্রকাশ পাবে, সেটি কার্যত স্টেটাস-ভিত্তিক একটি চূড়ান্ত খসড়া। এখনও সব দিক থেকে সম্পূর্ণ ফাইনাল নয়।
গত বছরের অক্টোবরের শেষে রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা করে কমিশন। তারপর গত ৪ নভেম্বর থেকে এনুমারেশন ফর্ম বিলি শুরু করেন বিএলও-রা। গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়। সেখানে ৫৮ লক্ষের বেশি নাম বাদ পড়ে। এর মধ্যে মৃত ভোটার, স্থানান্তরিত ভোটার এবং একাধিক জায়গায় নাম থাকা ভোটার ছিল। শনিবার চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর দেখা গেল, আরও ৭ লক্ষের বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। অর্থাৎ সবমিলিয়ে ৬৫ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর কেন্দ্র ভবানীপুরে নাম বাদ ৪৭ হাজার ১০০-র বেশি। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কেন্দ্র নন্দীগ্রামে নাম বাদ ১০ হাজার ৯০০ জনের বেশি। উত্তর কলকাতায় ৪ লক্ষ ৭ হাজার নাম বাদ। দক্ষিণ কলকাতায় ২ লক্ষ ১৯ হাজার ২০৭ নাম বাদ। বাঁকুড়ায় ১ লক্ষ ৩৫ হাজার ৩০০ নাম বাদ। নদিয়ায় ২ লক্ষ ৭৬ হাজার নাম বাদ।
সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ যতটা এগোবে, তার ভিত্তিতেই তালিকা প্রকাশ করে দিতে হবে। একেই চূড়ান্ত হিসাবে ধরা যাবে না। পরে ধাপে ধাপে আরও তালিকা প্রকাশ করা হবে। সেই মতো কমিশন আগেই স্পষ্ট করেছে যে শনিবার যে তালিকা প্রকাশ পাবে, সেটি কার্যত স্টেটাস-ভিত্তিক একটি চূড়ান্ত খসড়া, এখনও সব দিক থেকে সম্পূর্ণ ফাইনাল নয়। আরও ৬০ লক্ষের নাম অমীমাংসিত অবস্থায় রয়েছে। তাঁদের নথি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সব নথি খতিয়ে দেখার পর আরও কত নাম বাদ পড়তে পারে, তা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে।
SIR তালিকায় নাম থাকলেও ভোট দিতে পারবেন না
শনিবার প্রকাশিত তালিকায় আপাতত সকলের নামই তালিকায় রাখা হচ্ছে। প্রত্যেকের নামের পাশে একটি করে স্টেটাস উল্লেখ থাকছে, যা দেখে বোঝা যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বৈধ ভোটার, না কি তাঁর তথ্য এখনও যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। এই তালিকায় যেমন বৈধ বা যোগ্য ভোটারদের নাম থাকবে, তেমনই থাকবেন সেই সব ব্যক্তি, যাঁদের শুনানিতে ডাকা হয়েছিল এবং যাঁদের জমা দেওয়া নথি এখনও বিচারাধীন। এদের নামের পাশে লেখা থাকছে ‘অমীমাংসিত’ বা ‘অ্যাডজুডিকেশন’। এই অংশটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, চূড়ান্ত তালিকায় নাম থাকলেও ‘অমীমাংসিত’ স্টেটাস মানেই ভোটাধিকার নিশ্চিত নয়। এই সমস্ত ক্ষেত্রে নথিপত্র আরও এক দফা খতিয়ে দেখা হবে। তার পর নির্বাচন কমিশন একটি সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করবে। সেই পরবর্তী তালিকায় নাম থাকলে তবেই ভোটাধিকার নিশ্চিত হবে। আর যদি সেই তালিকা থেকে নাম বাদ যায়, তাহলে ভোট দেওয়া যাবে না। শনিবারের চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের নামও সম্পূর্ণভাবে উধাও হবে না। তালিকায় তাঁদের নামের পাশেই স্পষ্ট করে ‘ডিলিটেড’ স্টেটাস লেখা থাকবে। অর্থাৎ বাদ পড়া ভোটারদের তথ্যও তালিকায় চিহ্নিত থাকবে।
৬২ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ায় কোন রাজনৈতিক দল লাভবান হতে পারে, তা নিয়েও জল্পনা বাড়ছে। তার সঙ্গে জল্পনা বাড়ছে বিচারাধীন ভোটারদের ভবিষ্যৎ নিয়েও।এসআইআরের খসড়া তালিকায় প্রায় ৫৮ লক্ষের নাম বাদ গিয়েছিল। এরপর প্রশ্ন উঠেছিল যে এসআইআরের চূড়ান্ত তালিকায় কত নাম বাদ যেতে পারে? আর এই নিয়ে শুরু হয়েছিল রাজনৈতিক চাপানউতোর। সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন বারংবার বলেছিল যে তাদের নির্ধারণ করা নথির তালিকা মেনে যারা নথি দেখাতে পারেনি বা সেই নথিতে কোনও ত্রুটি মিলেছে, সেক্ষেত্রে তাদের নাম থাকবে না। নাম বাদ চলে যাবে। তা মেনেই এবার ভোটারদের নাম বাদের খবর প্রকাশ্যে আসছে। দেখা যাচ্ছে ভোটারদের মধ্যে বাতিল ৬২ লক্ষ ছাড়াও ৬০ লক্ষের ভাগ্য বিচারাধীন। অর্থাৎ সংখ্যাটা ১ কোটি ২৩ লক্ষ। ফলশ্রুতি, রয়েছে ধোঁয়াশা যা কাটতে না কাটতেই ভোট না চলে আসে!


More Stories
ভোটের আগে এসআইআর নিয়ে ঐতিহাসিক সুপ্রিম রায়
ডিটেনশন ক্যাম্পে না যেতে চেয়ে ৬ জনের স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন
মোথাবাড়ি কাণ্ডের অশান্তির নেপথ্য “খলনায়ক” মোফাক্কেরুল ইসলাম গ্রেফতার কিসের ইঙ্গিত?