Home » জ্যোতিপ্ৰিয় -দেবদাস যুদ্ধে হাবড়ায় জিতবে কে?

জ্যোতিপ্ৰিয় -দেবদাস যুদ্ধে হাবড়ায় জিতবে কে?

Oplus_131072

পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা :সময়টা ভালো যাচ্ছে না জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের। একটা সময় উত্তর ২৪ পরগনার তৃণমূল দলের মুখ ছিলেন জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক যাকে জেলা ছাড়িয়েও রাজ্যবাসী চেনেন বালু নামেই। ২০২১ সাল পর্যন্ত হাবড়া কেন্দ্রে টানা তিনবার জিতলেও এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অন্য। তাঁর বিরুদ্ধে হাবড়া বিধানসভা কেন্দ্রে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির দেবদাস মন্ডল। কি হবে এবারের ভোটে? কে জিততে পারে? হাওয়া কার দিকে? পাল্লা কার ভারী? সময় কলকাতার একটি বিশেষ প্রতিবেদন।

১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়।২০১১ সাল থেকে ২০২১ সালে বঙ্গের রাজনীতিতে ছিল তৃণমূলের প্রকৃত অর্থে সুসময় । ৩৪ বছরের বাম শাসনকে উপড়ে ফেলে ক্রমেই বঙ্গে অপ্রতিহত গতিতে এগোতে থাকে তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম লগ্ন থেকে রাজ্য রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসাবে দেখা দেন জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। ২০২১ সালে রাজ্য জুড়ে বিজেপির হাওয়া বইতে শুরু করে। সেই হাওয়া ভোট বাক্সে এতটা প্রবল ছিল না যা রাজ্যে শাসক দলের পরিবর্তন আনতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বেশি আসন বিশিষ্ট উত্তর চব্বিশ পরগনায় বনগাঁ মহকুমা ছাড়া ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটে বিজেপির সেভাবে প্রভাব ছিল না। তথাপি জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের জয়ের রাস্তা খুব একটা মসৃন হয় নি। হাবরা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী রাহুল সিনহার বিরুদ্ধে জিততে কাল ঘাম ছুটে যায় তাঁর। হ্যাটট্রিক তিনি করেন ঠিকই কিন্ত তার কষ্টার্জিত জয় তখনই অশনি সংকেত বয়ে এনেছিল তৃণমূলের কাছে। বোঝাই গিয়েছিল বিজেপির পায়ের তলায় মাটি আস্তে আস্তে শক্ত হচ্ছে হাবড়া জুড়ে। এবারের বিধানসভা নির্বাচনের আগে পরবর্তী পাঁচ বছর হাবড়া তৃণমূলের কাছে খুব ভালো বার্তা বয়ে আনে নি,জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের কাছেও সময়টা খুব সুখের ছিল না, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এখানে তার প্রভাব পাওয়া যায়। বারাসাত লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার লক্ষাধিক ভোটে জয়ী হলেও হাবড়া কেন্দ্রে মুখ থুবড়ে পড়ে তৃণমূল। কাকলি ঘোষ দস্তিদার হাবড়া বিধানসভা কেন্দ্রে ১৯ হাজার ৯৩৩ ভোটে পিছিয়ে পড়েছিলেন। পাশাপাশি এই কেন্দ্রের তিনবারের বিধায়ক ও একদা খাদ্য মন্ত্রী এবং পরে বনমন্ত্রী হওয়া জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক রেশন দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত হয়ে দীর্ঘ সময় কারাবাসে কাটান। স্বাভাবিক ভাবেই একটা সময় উত্তর ২৪ পরগনা তৃণমূলের শীর্ষ নেতা বলতে বালুদা নামে পরিচিত জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের ইমেজ বা ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একদা তৃণমূল জেলা সভাপতি বালু মল্লিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন। প্রায় ১৪ মাস জেলে থাকার পরে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক জেল থেকে ছাড়া পান ঠিকই, কিন্তু জেলা ও রাজ্য রাজনীতিতে তাঁকে ও স্বমহিমায় এবং তার রাজকীয় মেজাজে বিচরণ করতে দেখা যায়নি। জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক তৃণমূল কংগ্রেসের ইতিহাসে একটি বিরল রেকর্ডের অধিকারী। তিনি টানা পাঁচবারের বিধায়ক। প্রথম দুবার তিনি জয়ী হয়েছিলেন গাইঘাটা বিধানসভা আসনে। উত্তর ২৪ পরগনার মতুয়া বলয়ে বাম প্রভাব কমিয়ে এনে মতুয়া গড়ে তৃণমূলের উত্থানের নেপথ্য নায়ক ছিলেন জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। একটা সময় সিপিএম ও পরবর্তীতে বিজেপিকে ঠোঁট কাটা ভাবে আক্রমণ কর করে চলা জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের দাপট অনেকটাই কমে যায় ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে । জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে না থাকায় উত্তর ২৪ পরগনায় বিজেপির উত্থান ত্বরান্বিত হয়। ২০২৫ সালে জেল মুক্তির পরে যে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে দেখা যায় তিনি পুরনো বালুদার ছায়া মাত্র। দেখতে দেখতে চলে আসে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন। হাবড়া বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের হয়ে প্রার্থী কে দাঁড়াবেন – তা এক বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয়। বড় মাপের নেতাদের কেউই আগ বাড়িয়ে হাবরা বিধানসভায় প্রার্থী হতে রাজি ছিলেন না। শোনা যায় জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক নিজেও হাবড়া বিধানসভা কেন্দ্রের চেয়ে বারাসাত বা দেগঙ্গা বিধানসভা কেন্দ্রের মতো নিরাপদ আসন পেতে আগ্রহী ছিলেন। তবুও পোড় খাওয়া রাজনৈতিক নেতা জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককেই এই আসনে টিকিট দেয় তৃণমূল নেতৃত্ব । এ কথা মাথায় রাখতে হবে, তৃণমূল কংগ্রেসে টানা পাঁচবারের বিধায়ক হাতে গোনা। পারিবারিক সূত্রে বর্ধমানের মন্তেশ্বরের ভূমিপুত্র হলেও জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের রাজনৈতিক কর্মকান্ড প্রায় পুরোটাই কেটেছে উত্তর ২৪ পরগনা জেলায়। উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় তিনি হাতের তালুর মত চেনেন। ধুরন্ধর রাজনৈতিক বুদ্ধি, নেটওয়ার্ক, ভোট মেশিনারী সম্পর্কে তীক্ষ্ণ জ্ঞান এবং ভোট ম্যানেজমেন্ট তাঁর চেয়ে খুব কম লোকই জানেন! এই অবস্থায় হাবড়া বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য তৃণমূল নেতৃত্বের কাছে হাবরার তিনবারের বিধায়ক জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের চেয়ে দক্ষ কেউ ছিলনা। কিন্তু সেই জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকেরও অবস্থা খুব ভালো নয় তা বিজেপির অন্দরমহলে কান পাতলেই শোনা যায়। উত্তর ২৪ পরগনার যে কটি আসনকে তারা নিশ্চিত হিসাবে বিবেচনা করছে তার মধ্যে অন্যতম হাবড়া বিধানসভা কেন্দ্র। তারা হাবড়া বিধানসভা কেন্দ্রে প্রার্থী করে ডাকাবুকো বিজেপি নেতা দেবদাস মন্ডলকে। দেবদাস মন্ডল প্রথম থেকেই হাতিয়ার করেন জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের রেশন বিতর্ককে। শালীনতা বা রুচিকে গুরুত্ব দিতেই নারাজ দেবদাস মন্ডল।

বিষয়টি তৃণমূল নেতৃত্বের অজানা নয়, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের ইডি ও রেশন বিতর্ক ছাপ ফেলতে পারে ভোটে তারা তা জানে । জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক নিজেও বিতর্কিত রেশন বিতর্কর কথা উঠলে ধৈর্য হারাচ্ছেন।

তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব অচিরেই বুঝতে পারে ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে না পারলে এই কেন্দ্র হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে তৃণমূলের। আর সেজন্যই অশোকনগর ও হাবড়া কেন্দ্রের প্রচারে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বক্তব্যের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেন জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে সার্টিফিকেট দিতে। মুখ্যমন্ত্রীকে বলতে শোনা গিয়েছে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক একজন বিধায়ক হিসেবে যা কাজ করেছেন তা সারা রাজ্যে কোন বিধায়কই করেননি। অর্থাৎ সব বিধায়কের চেয়ে যতিপ্রিয় মল্লিকই নাকি হাবরা কেন্দ্রের জন্য সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।।

মুশকিল হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনসভায় এ কথা শোনার জন্য বিশেষ লোক ছিল না। খুব একটা ভীড় হয়নি হাবড়া ও অশোকনগর কেন্দ্রের মুখ্যমন্ত্রীর নির্বাচনী জনসভায়। হতে পারে নির্বাচনী প্রচারের সময় আচমকা এগিয়ে আনা হয়েছিল তবুও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত জনমোহিনী শক্তি ও হাবড়ায় যেন কিছুটা ফিকে।

এদিকে, দেবদাস মন্ডল উঠে পড়ে লেগেছেন। তিনি জানেন ক্ষেত্র সুপ্রস্তুত। এবার নয়তো কোন বারই নয়। এত সুযোগ বিজেপি বা তিনি কোনোবারই পাবেন না বিশেষ করে হাবড়ায় বিজেপির অনুকূলে হাওয়া রয়েছে তা বিগত লোকসভা নির্বাচন দেখলেই বোঝা যায়। এ নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই দেবদাস মন্ডলকে নিয়েও প্রশ্ন আছে।দেবদাস মন্ডল অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন। বনগাঁর বাসিন্দা দেবদাস মন্ডলের বিরুদ্ধেও খুন খারাবির মতো অভিযোগ রয়েছে। তাতে কি, বিজেপির নিচু তলার কর্মীরা মনে করছে যেমন বুনো ওল তেমনি বাঘা তেতুল। আর দেবদাস মন্ডলের প্রচারে উন্নয়নের কথা অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু ঘুরেফিরে চলে আসছে রেশন ও চাল বিতর্ক। আর তাকেই রাজনৈতিকভাবে ভোট বৈতরণী পার হওয়ার জন্য কাজে লাগাতে চাইছেন দেবদাস মণ্ডল। তিনি প্রার্থীপদ পেয়েই জানিয়েছিলেন, দলের কাছে তার অনুরোধ ছিল জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক যেখানেই দাঁড়াবেন তিনি তার বিরুদ্ধে লড়তে চান। পুরনো হিসেব বোঝাপড়া করা বাকি রয়েছে। সুযোগ পেয়েছেন দেবদাস মন্ডল। বিজেপির প্রচারে লোকও হচ্ছে। হাবড়ায় বিজেপির হাওয়া যে সজোরে বইছে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। এসআইআর আবহে সাধারণভাবেই মনে করা হচ্ছে বিজেপি বাড়তি সুবিধা পেলেও পেতে পারে। জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের অসুবিধা আরো রয়েছে, তার সুদিনের অনেক সঙ্গী তার সঙ্গে এই মুহূর্তে নেই। তথাপি বিজেপির প্রতিটি নেতাও কর্মী জানে প্রতিপক্ষের নাম জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। তিনি নীরব থাকুন বা সরব থাকুন, দেবদাস মন্ডলকে হারানোর জন্য রকম ঘুুটি তিনি সাজাচ্ছেন একথা বলাই বাহুল্য। বিজেপির ভয়, দেবদাস মন্ডলকে ধরাশায়ী করার জন্য জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক নিশ্চিতভাবে সুদর্শন চক্রের মত মোক্ষম অস্ত্রের প্রয়োগ করবেন। এখন দেখার দেবদাস মন্ডল তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অস্ত্রকে কিভাবে নির্বিষ করেন। এনিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই যে হাবরা বিধানসভা কেন্দ্রে লড়াই দ্বিপাক্ষিক। এখানে কংগ্রেস, বামফ্রন্ট বা পঞ্চম কোনো শক্তি মাত্র প্রভাব ফেলতে পারবে বলে মনে করছে না রাজনৈতিক মহল। এগিয়ে আছেন বিজেপির দেবদাস মন্ডল, তবে তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছেন বহু যুদ্ধের বিজয়ী জ্যোতিপ্ৰিয় মল্লিক। লড়াই এখানে – বিজেপির দেবদাস মন্ডলের সঙ্গে তৃণমূলের নয়। লড়াই বিজেপি বনাম জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের ।।

জ্যোতিপ্ৰিয় -দেবদাস যুদ্ধ # হাবড়া # ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচন

About Post Author