পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ২৭ জুন : বঙ্গে যখন গোপাল মুখার্জীর নামে রাস্তা হওয়া নিয়ে চলছে জোর বিতর্ক তখন বিতর্কের অন্য অধ্যায় খুলে গেল দক্ষিণ ভারতের হায়দ্রাবাদে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে রাস্তা (Donald Trump Avenue ), মার্কিন রাষ্ট্রপতির নামে রাস্তার নাম রাখা হয়েছে হায়দ্রাবাদে। মার্কিন রাষ্ট্রপতি তো বেজায় খুশি! তবে রাজনৈতিক চাপানউতোর জারি ভারতে! কঠোর সমালোচনা করেছে বিজেপি এবং বাম দলগুলি । উভয় দল বলছে, এরকম নামকরণ দ্বিচারিতা। সত্যিই কি দ্বিচারিতা, নাকি রয়েছে অন্য কোন কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি?
কারা করেছে এই নামকরণ? ভারতের তেলঙ্গানা রাজ্যের হায়দরাবাদে মার্কিন রাষ্ট্রপতির সম্মানে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প অ্যাভিনিউ’ নামের রাস্তাটি ঘোষণা করেছে ক্ষমতাসীন তেলেঙ্গানা রাষ্ট্রীয় সমিতি (বর্তমানে ভারত রাষ্ট্র সমিতি বা বিআরএস) সরকার এবং বাস্তবায়ন করেছে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস (কংগ্রেস)।তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী এ. রেবন্ত রেড্ডির নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকারের অধীনে, আমেরিকার কনস্যুলেট সংলগ্ন নানকরামগুড়ার রাস্তাটির নামকরণ করা হয়। আমেরিকান স্বাধীনতার ২৫০ বছর উদযাপন (Freedom 250) উপলক্ষে জুনের চতুর্থ সপ্তাহে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর এবং তেলেঙ্গানার উপমুখ্যমন্ত্রী মাল্লু ভাট্টি বিক্রমাকার উপস্থিতিতে এই রাস্তার আনুষ্ঠানিক ফলক উন্মোচন করা হয়। ২৩ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে রাস্তাটির উদ্বোধন ও নামফলক উন্মোচন করা হয় । উল্লেখ্য, এই রাস্তার নাম আগে ছিল ইউএস কনসুলেট রোড।
বিজেপি এই পদক্ষেপটিকে দ্বিমুখী নীতি হিসেবে দেখছে। তাদের প্রশ্ন— রাহুল গান্ধী যেখানে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ট্রাম্পের নীতির বিরোধিতা করেন এবং ট্রাম্প ভারতের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করছেন বলে অভিযোগ করেন, সেখানে কংগ্রেস শাসিত রাজ্য কীভাবে তাকে এমন সম্মান দিতে পারে?
বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সিপিআই(এম) এই নামকরণের তীব্র বিরোধিতা করেছে, তারা বলেছে, সমালোচনার পরবর্তী ধাপে টেকসিটির নামান্তর। (ইন্ডিয়ান টেক সিটি রোড নেমড আফটার ট্রাম্প ড্রোজ ক্রিটিসিজম)। তারা বিষয়টিকে ‘আপত্তিকর’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
এখন প্রশ্ন উঠছেই। প্রশ্নের খন্ডন করতে হায়দ্রাবাদের শাসক দল কী বলছে?কংগ্রেস এই সমালোচনাকে উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছে যে এটি সম্পূর্ণভাবে ভারতের বৈশ্বিক কূটনীতি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি কৌশলগত অঙ্গভঙ্গি মাত্র। খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই নামকরণের জন্য ভারতকে ধন্যবাদ জানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় একে “নজিরবিহীন সম্মান” বলে আখ্যা দিয়েছে। এখন দেখার এর পেছনে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আমেরিকার আগামী দিনে প্রভাব অনুমান করে এই রাস্তার নামকরণ কোন গভীর কূটনৈতিক চাল কিনা!
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নামকরণ করার মূল উদ্দেশ্য সরাসরি কোনো বৈদেশিক সাহায্য (International Aid) পাওয়া নয়, বরং আমেরিকান বাণিজ্যিক বিনিয়োগ ও কৌশলগত সম্পর্ককে সুদৃঢ় করা। এই প্রতীকী পদক্ষেপের মাধ্যমে কংগ্রেস সরকার আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মূলত নিম্নলিখিত সুবিধা বা সহায়তা আশা করছে। এক্ষেত্রে, হায়দরাবাদ ভারতের অন্যতম প্রধান প্রযুক্তি হাব। এই নামকরণের মূল লক্ষ্য হলো মাইক্রোসফট, গুগল এবং অ্যামাজনের মতো বড় মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থা এবং গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টারগুলোকে আকর্ষণ করা এবং রাজ্যে মার্কিন অর্থনৈতিক বিনিয়োগের ধারা বজায় রাখা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর চড়া শুল্ক আরোপের যে নীতি নিয়েছেন, তা শিথিল করার ক্ষেত্রে এই কূটনৈতিক সম্মান ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সরকারে না থেকেও কংগ্রেস কেন ভারতের কূটনৈতিক নীতি নির্ধারণের সুবিধা অসুবিধার ক্ষেত্রে অগ্রসর হবে?
ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প একে নজিরবিহীন সম্মান বলে আখ্যা দিয়েছেন। এও মাথায় রাখতে হবে, রাস্তার প্রস্তর ফলক উন্মোচনে হাজির ছিলেন সস্ত্রীক সার্জিও গোর এবং ফলকে রয়েছে তাঁর নামও। সার্জিও গোর কে তা জানলে বিষয়টি আরেকটু গভীর করে বোঝা যাবে।সার্জিও গোর হলেন একজন আমেরিকান রাজনীতিবিদ যিনি ২০২৬ সাল থেকে ভারতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন । মাত্র ৩৯ বছর বয়সে এই পদে নিযুক্ত হওয়া গোর অতীতে হোয়াইট হাউসের প্রেসিডেন্সিয়াল পার্সোনেল ডিরেক্টর এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। ভারতের আভ্যন্তরীন রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি প্রভাব লক্ষ্য না করা গেলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই মুহূর্তে বিশ্বের বহু দেশের ক্ষেত্রে নীতি নির্ধারণ করছে। আগামীতেও যে করবে এরকমও যথেষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারত কোন দেশ থেকে তেল নেবে তাও নির্ধারণ করে দিচ্ছে আমেরিকা। অর্থাৎ বিষয়টিকে যতটাই প্রযুক্তির নিরিখে মাপা যাক, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক মানচিত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই মুহূর্তে অবস্থান বিচার করলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে রাস্তা সম্পর্কিত আলোচনার গভীরতা অন্য মাত্রা নিতে বাধ্য!
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে রাস্তা #Donald Trump Avenue


More Stories
শোয়েব আখতারের সঙ্গে জঙ্গী যোগ? দাদার শেষকৃত্যে হাজির পহেলগাঁও হামলার মাস্টারমাইন্ড!
মৃত্যু বেড়ে ২৩৫, ভূকম্পে তছনছ ভেনেজুয়েলার ধ্বংসস্তূপে অসহায় জীবকুল
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ গোল্ডেন বুটের দৌড়, মেসির প্রতিদ্বন্দ্বী কে?