Home » প্রাকৃতিক বিপর্যয় : লাইফলাইন এনএইচ ৭১৭

প্রাকৃতিক বিপর্যয় : লাইফলাইন এনএইচ ৭১৭

Oplus_131072

সানি রায়, সময় কলকাতা:  এখন  লাইফলাইন এনএইচ ৭১৭ !  ধস-বিপর্যয়ে ফের বিপন্ন পাহাড়ের যোগাযোগ। ভরসা কি তিস্তার ধারে ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের বিকল্প ‘লাইফলাইন’ ৭১৭ নম্বর জাতীয় সড়ক?

উত্তরের জনপদ মানেই চোখজুড়ানো সবুজ, বিস্তীর্ণ চা-বাগান, ঘন জঙ্গল আর পাহাড়ি নদীর কলকল শব্দ। কোথাও শান্ত সমতলের নদী-নালা, আবার কোথাও পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা খরস্রোতা নদীর গর্জন। তার সঙ্গে পর্যটকদের আনাগোনা। সব মিলিয়ে উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স যেন প্রকৃতির নিজস্ব ক্যানভাস। সেই ডুয়ার্সের বুক চিরেই পাহাড়ের দিকে উঠে গিয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ, যার অন্যতম আকর্ষণ ‘লুপ ব্রিজ’।
জলপাইগুড়ি জেলার বাগরাকোট সংলগ্ন এলাকা থেকে পাহাড়ের দিকে এগোতেই বদলে যেতে থাকে ভূপ্রকৃতি। সবুজে মোড়া চা-বাগান ও জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে চকচকে কংক্রিটের রাস্তা ধীরে ধীরে উঠে যায় পাহাড়ের গায়ে। তারপর শুরু হয় একের পর এক আঁকাবাঁকা মোড়। কোথাও রাস্তা পাহাড়ের গা ঘেঁষে এগিয়েছে, কোথাও আবার সুবিশাল উঁচু পিলারের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে সেতু। এই পথের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন নির্মাণই লুপ ব্রিজ। শুধু পর্যটকদের কাছে আকর্ষণ নয়, এই সড়কের গুরুত্ব কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত বেশি। পাহাড়ি এই পথ ধরে কালিম্পং, সিকিম, গ্যাংটক-সহ সীমান্তবর্তী এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হয়। এমনকি ভারত-চিন সীমান্তে মোতায়েন ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে রসদ ও বিভিন্ন সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই যোগাযোগপথের গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে তিস্তার পাশ দিয়ে যাওয়া ন্যাশনাল হাইওয়ে ১০ বারবার প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কবলে পড়ায় বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে ন্যাশনাল হাইওয়ে ৭১৭ এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার-সহ সমতলের বিস্তীর্ণ এলাকার সঙ্গে দার্জিলিং, কালিম্পং, গ্যাংটক ও অন্যান্য পাহাড়ি জনপদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম প্রধান ভরসা। কিন্তু বর্ষা এলেই সেই ভরসার পথ হয়ে ওঠে অনিশ্চিত। তিস্তা নদীর তীরবর্তী পাহাড়ি ভূখণ্ডে অতিবৃষ্টি হলেই শুরু হয় ধস, ভাঙন এবং রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা। কোথাও রাস্তার একাংশ ধসে পড়ে, কোথাও পাহাড়ের মাটি ও পাথর নেমে এসে পথ আটকে দেয়। আবার কোথাও নদীর জল ও স্রোতের চাপে রাস্তার অস্তিত্বই সংকটে পড়ে। ফলে আচমকাই বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে পাহাড়ের সঙ্গে সমতলের যোগাযোগ।

এই পরিস্থিতিতেই বিকল্প পথ হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে ন্যাশনাল হাইওয়ে ৭১৭। শিলিগুড়ি থেকে ওদলাবাড়ি কিংবা জলপাইগুড়ি কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ার জেলা থেকে মালবাজার হয়ে লাভা-লোলেগাঁওয়ের দিক ধরে পাহাড়ে ওঠার এই রুটটি ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি, একাধিক সেতু নির্মাণ এবং দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজের মাধ্যমে এই রুটকে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে প্রকৃতির রুদ্ররূপে সেই বিকল্প পথও এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে। একাধিক জায়গায় ধস নেমে রাস্তার বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে, কোথাও মূল সড়কে তৈরি হয়েছে বড় বড় ফাটল। আবার কোথাও ধসের কারণে রাস্তার প্রায় অধিকাংশ অংশই ভেঙে গিয়েছে। পাহাড়ের গা থেকে উপড়ে পড়া বিশাল গাছও অনেক জায়গায় রাস্তার উপর পড়ে যোগাযোগ ব্যাহত করছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় অবশ্য তৎপর প্রশাসন। কালিম্পং জেলা প্রশাসন, বনদপ্তর, পুলিশ প্রশাসন এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর কর্মীরা একযোগে কাজ করছেন। কোথাও জেসিবি নামিয়ে ধস সরানোর কাজ চলছে, আবার দুর্গম এলাকায় প্রয়োজনে বিশেষ বাহিনী ও সেনার সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই যত দ্রুত সম্ভব রাস্তা পরিষ্কার করে যান চলাচল স্বাভাবিক করা এবং সমতল-পাহাড়ের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে না দেওয়া।প্রশাসনের এই তৎপরতা নিঃসন্দেহে আশার আলো দেখাচ্ছে। কারণ পাহাড়ের এই বিকল্প পথ শুধু পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য নয়, স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবন, পণ্য পরিবহণ, জরুরি পরিষেবা এবং সীমান্তবর্তী এলাকার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে,প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে ন্যাশনাল হাইওয়ে ৭১৭ কতটা স্থায়ী বিকল্প ‘লাইফলাইন’ হয়ে উঠতে পারবে? একদিকে তিস্তার তাণ্ডব, অন্যদিকে পাহাড়ের ধস এই দুইয়ের মাঝেই এই গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পথকে সচল রাখাই এখন প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জ কতটা সফলভাবে মোকাবিলা করা যায়, তার উত্তর দেবে আগামী দিনের বর্ষা ও পাহাড়ের প্রকৃতি।  লাইফলাইন এনএইচ ৭১৭ কে ভরসা করতে ক্ষতি কী!

About Post Author